ভ্যাক্সিন আবিষ্কার: ড. এডওয়ার্ড জেনার এবং মানবজাতির বসন্তজয়

হারুন অর রশিদ
4.1
(8)
Bookmark

No account yet? Register

ছোট বেলায় যখন আমাদের বয়স দিন হিসেবে গণনা করা শুরু হয়, ঠিক তখনই আমাদের বাবা মারা আমাদের টিকা দেয়ার জন্য টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যায়। তারপর যখন টিকা দেয়ার পরের অনুভূতি আমাদের সাথে ভাগাভাগি করে, আমরা হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি কোথায় সেই ছোটবেলার টিকার দাগ। ভেবে দেখেছি কি কখনো কোথা থেকে এল এই ভ্যাক্সিন বা টিকার আইডিয়া? আজকের এই নিবন্ধ টিকা আবিষ্কারের গল্প নিয়েই।

অসামান্যতে লিখুন

১৭৬৬ সাল।

তখন সােড়বারিতে এক ক্লিনিকে একদিন বিকেল বেলা এক অপূর্ব সুন্দরী গােয়ালিনী হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়ল। তার সুন্দর নরম-পেলব আঙুলটি কেটে গিয়ে দরদর করে রক্ত ঝরছিল। সেখানকার ডাক্তার মেয়েটির হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। তিনি তখনকার বসন্তের সেই প্রথম প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহতা সম্বন্ধে তার অতি প্রিয় ছাত্র তরুণ ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনারের সাথে আলাপ করছিলেন ।

তাদের কথার মাঝে আচমকা সেই গােয়ালিনীটি বলে উঠল,

স্যার, আমি বড় বাঁচা বেঁচে গেছি, আমার আর কখনও জাতবসন্ত (Small pox) হবে না।

তরুণ ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করলো,

কেন?

উত্তর আসলো গোয়ালিনীর থেকে,

আমার ছােটবেলা গুটিবসন্ত (Cow pox) হয়েছিল যে ! এ জন্যই আমার আর কখনোই জাত বসন্ত হবে না,ও মা!আপনি জানেন না বুঝি!স্যার আপনি আপনার এই তরুণ ছাত্রকে এটা বলেন নাই?

বলেই মিট মিট করে হেসে দিল।

এর পর কি আসলেই তাই ঘটেছিল? চলুন সামনে এগিয়ে যাই।

ভ্যাক্সিন আইডিয়ার অঙ্কুরোদগম

ভ্যাক্সিন এর আবিষ্কারক এডওয়ার্ড জেনার
ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার । চিত্রসূত্র:  Macau Lifestyle

প্রথমে তরুণ ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার কথাটাকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে কেন যেন তিনি ভাবলেন আসলেই কি যার একবার গুটি-বসন্ত হয়েছিল তার পরে কি আর জাত-বসন্ত হয় না! ব্যাপারটা জেনারকে ভাবিয়ে তুলুল এবং সিদ্ধান্ত নিলেন খোঁজ নিয়ে দেখবেন ব্যাপারটা আসলেই সত্য কি না?

তিনি যেখানে যেখানে জাত বসন্তের মড়ক লেগেছিল সেখানে গােপনে খোঁজ-খবর নিলেন। আক্রান্ত অনেকের সাথে কথা বললেন। বিষয়টি অনেকের মাঝেই তখন প্ৰচলিত হয়ে গিয়েছে যাদের একবার গুটিবসন্ত হয়েছে, তাদের আর জাতবসন্ত হবে না। এর পর অনেকদিন তিনি এ ব্যাপারে মাথা ঘামান নি।

১৭৮২ সাল। জেনার তখন একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার। হঠাৎ একদিন তার এক বন্ধু তাকে খবর দিল, গ্লসেস্টারের এক গােয়ালিনী আর এক চাষার ছেলে কিছুদিন আগে গুটি-বসন্তে মারা গেছে।এ খবর শুনে জেনার আবার নতুন ভাবনার জালে জড়িয়ে পড়লেন। এরপর পাঁচটা বছর একটানা বিভিন্ন রকমের গো-রােগ ভালাে করে পরীক্ষা করলেন । তিনি একটি সমাপ্তিতে আসলেন এরূপ যে,

বসন্ত ছাড়াও গরুর অন্য আরাে নানা ধরনের রােগ হয় কিন্তু প্রায় সবক্ষেত্রেই প্রায় একই লক্ষণ প্রকাশ পায়। লোকজন না জেনে সবগুলােকেই ‘গুটিবসন্ত’ বলে আখ্যায়িত করে । হয়তাে এর মধ্যে কোনাে একটিই শুধু জাত বসন্ত প্রতিরােধ করতে সক্ষম ।

গুটিবসন্ত এবং জাতবসন্তের মধ্যকার পার্থক্য

জাত-বসন্ত
চিত্র: জাত-বসন্ত । চিত্রসুত্র: NCBI

এক ধরনের গুটিবসন্তের বেলায় তিনি দেখলেন, প্রথমে গরুর গায়ে ব্রণের মতাে ছােট ছােট গুটি বেরােয় (এই অবস্থাকে বলা হয় মেকিউল), তারপর সেই গুটিগুলাে আরাে বড় এবং শক্ত হয়ে যায় (পেপিউল), পরদিন সে গুটিগুলাের ভিতর পানি জমতে শুরু করে (ভেসিকল)। চার-পাঁচ দিনের মধ্যে এগুলােতে পানির স্থানে পুঁজ জমে চারদিকের চামড়া খুব লাল হয়ে যায়। রােগের তখন সর্বোচ্চ অবস্থা (পাস্টিউল)। এরপর সেগুলাে আস্তে আস্তে ফাটতে শুরু করে। আট দিনের দিন শুকোতে শুরু করে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে স্ক্যাব খসে পড়ে। আর সে জায়গায় কতগুলাে বড় বড় গর্ত থেকে যায়। 

এ রােগের নাম তিনি দিলেন, ‘আসল গুটিবসন্ত‘। আর যে একই ধরনের রোগ মানুষের হয়, তার নাম দিলেন জাতবসন্ত।

জাত-বসন্ত মানুষের মধ্যে দেখা যায় এবং এটিই সবচেয়ে মারাত্মক। গুটিবসন্ত সাধারণত মানুষের হয় না । তবে আক্রান্ত গরুর সংস্পর্শে এলে এ রােগ সংক্রমণ মানুষের মধ্যে হতে পারে। তাই এটা শুধু গােয়ালাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি খবর পেলেন,

স্থানীয় এক গাে-শালায় আসল গুটিবসন্তে  আক্রান্ত অনেক গােয়ালাই এখন জাতবসন্তে মারা যাচ্ছে। 

খবরটি শোনা মাত্র বিস্ময়ের ধাক্কায় জেনার একেবারে লাফিয়ে উঠলেন। সাথে সাথেই সংক্রমিত স্থানের দিকে রওনা দিলেন। রােগের লক্ষণ সম্বন্ধে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন গােয়ালাদের। তার বলা আসল গুটিবসন্তের লক্ষণগুলাের সবই দেখা দিয়েছিল তাদের দেহে। তারপরেও তারা জাত বসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। দারুণ হতাশ হয়ে পড়লেন তিনি। কিন্তু তবুও অদম্য পরিশ্রমী ডা. জেনার হাল ছাড়লেন না। ঠিক করলেন, এর শেষ কোথায় দেখেই ছাড়বেন!

কিছুদিনের মধ্যেই কাছাকাছি এক গােয়ালে গুটিবসন্ত হানা দেয়ার খবর এল। তিনি আবার নতুন করে গরুগুলােকে পরীক্ষা করতে আরম্ভ করলেন। একদিন তিনি গােয়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন, তখন একটা গরুর বাটের দিকে নজর গেল। সেখানে কয়েকটা পাস্টিউল (রােগের পরিপক্ক অবস্থা) ফেটে তা থেকে পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে। এরকম আরেকটা গরুর দিকে তাকালেন কিন্তু এর দেহের গুটিগুলাে ভেসিকল (গুটিগুলাের ভিতরে পানি জমা) পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। তিনি এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়েই রইলেন। হঠাৎ এক নতুন ধারণা তার মাথায় এল,

এমনও তাে হতে পারে যে গুটিগুলাের বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক লক্ষণ দেখা যায়। আর রােগের নির্দিষ্ট পর্যায়েই সেই সংক্রামক লক্ষণগুলোর শক্তি থাকে,অন্য পর্যায়ে সে শক্তি আর থাকে না। তাই সে সব পর্যায় চলাকালে গুটিবসন্তে সংক্রমিত হলেও তা জাতবসন্ত প্রতিরােধ করতে পারে না। যদি রােগের নির্দিষ্ট পর্যায়ের সক্রমক অবস্থায় এর উপাদান যদি কোনাে লােকের দেহে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তাে এটি তাকে জাতবসন্ত থেকে রক্ষা করতে পারে।

কিন্তু তিনি বিষয়টা প্রমাণ করার কোন উপায় খুঁজে পেলেন না। মনের ধারণা মনেই রয়ে গেল।

আরো পড়ুন: হৃদপিণ্ড: বিস্ময় ও সমস্যা, পর্ব ১ – সাধারণ পরিচিতি

অবশেষে সাফল্যের দেখা

১৭৯৫ সালের ১৪ মে। সারারাত জাগার পর ভােরবেলা একটু তন্দ্রা এসেছিল এমন সময় হঠাৎ দরজায় মৃদু শব্দ হল ।

পাশের এক গােয়ালিনী তার জন্য দুধ নিয়ে এসেছে । দরজা খুলতেই গােয়ালিনীটা দুধের বােতল তাঁকে এগিয়ে দিল । কিন্তু তার হাতের দিকে নজর পড়তেই সদ্য ঘুমভাঙার আবেশটুকুও ছুটে গেল। হাতটা বড় বড় গুটিতে ভর্তি, সেগুলাে ফেটে বিকট চেহারা ধারণ করেছে আর পুঁজ অবিরল ধারায় গড়িয়ে পড়ছে। এক ঝলক দেখেই তিনি বুঝলেন, একে গুটিবসন্তে ধরেছে আর রােগের এখন চরম অবস্থা। হাতের ইশারায় তাকে একটু অপেক্ষা করতে বললেন। তারপর গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।

প্রথম টিকা দিচ্ছেন এডওয়ার্ড জেনার, যিনি কিনা ভ্যাক্সিন এর আবিষ্কারক
চিত্র : প্রথম টিকা দিচ্ছেন এডওয়ার্ড জেনার । চিত্রসূত্র:  New York Times

ভাবতে ভাবতে তিনি পাশের খােলা জানালার সামনে এসে দাড়ালেন। তার মনে পড়ল তার বাগনের মালির ছেলেটার জাত বসন্তের লক্ষণ স্পষ্ট। আচমকা এক বুদ্ধি খেলে গেল তাঁর মাথায়। মৃদুস্বরে তিনি ছেলেটিকে ডাকলেন। এরপর প্রচুর আত্মবিশ্বাস আর মনােবল নিয়ে তিনি এক অভিনব কাণ্ড করলেন –

গােয়ালিনীর হাতের গুটি থেকে একটু পুঁজ নিয়ে ছেলেটির হাতে একটু জায়গা চিরে ঢুকিয়ে দিলেন। আর এভাবেই পৃথিবীর প্রথম টিকা দেওয়া হলাে।

তারপর সাত দিনের দিন তার শরীরে গুটিবসন্তের গুটি বেরুলাে। তিন সপ্তাহের মধ্যে সেগুলাে শুকিয়ে সম্পূর্ণ ভালাে হয়ে গেল। ডা. জেনার এরপর আরো কিছুদিন অপেক্ষা করলেন।

তারপর ১৭৯৫ সালের ১ জুলাই এবার ছেলেটির দেহে জাতবসন্ত আরো প্রভাব বিস্তার করতে পারে কি না এটা পরীক্ষা করার জন্য একজন জাতবসন্তের রােগীর দেহের গুটি থেকে পুঁজ নিয়ে ঠিক আগের মতাে তার শরীরে ঢুকিয়ে দিলেন । এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ করে মোট তিন সপ্তাহ গেল। ছেলেটির কিছুই হলাে না। দিব্যি হাসছে খেলছে সে। বসন্তের নামগন্ধই নেই। সাফল্যের আনন্দে তিনি আত্মহারা হয়ে পড়লেন। বিশ্বাসের বিদ্যুৎ ঠিকরে পড়ল দুচোখ বেয়ে। বলিষ্ঠ দুটি বাহুর মায়ায় তিনি জড়িয়ে ধরলেন ছেলেটিকে, সে যে তাঁর সাফল্যের প্রথম স্বীকৃতি ।

জেনারের গবেষণা ও প্রকাশিত বই

এই নতুন আবিষ্কারের পর ডা. জেনার ভাবলেন, এর জন্য আরো গবেষণা প্রয়োজন। তিনি ভাবতে লাগলেন, কী করে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভ্যাকসিন জোগাড় করা যায়; কারণ বিপুল সংখ্যক মানুষকে টিকা দিতে হলে প্রচুর পরিমাণ ভ্যাকসিন সঞ্চয় করে রাখা দরকার। সেজন্য বসন্তে আক্রান্ত গরুর শরীর থেকে ভ্যাকসিন জোগাড় করা অনেক সহজ ও যুক্তিযুক্ত মনে করলেন। এর পর বিস্তৃত পরীক্ষা হিসেবে আরো চব্বিশজন জাতবসন্তে আক্রান্ত লোককে টিকা দিলেন। লােকগুলাে আশ্চর্যজনকভাবে বসন্তের হাত থেকে বেঁচে গেল। এই ফলাফলের উপর তিনি একটি গবেষণাগ্রন্থ লিখে ফেললেন।

সবাই অবাক। লােকটা বলে কি? বসন্ত প্রতিরােধ করার টিকা আবিষ্কার করেছে। অনেকে অনেক মন্তব্যই করল। সবচেয়ে রসালাে মন্তব্য হচ্ছে –

এই টিকা নিলে আমাদের ছেলেদের গরুর মতো চেহারা হবে এবং তারা মাঝে – মধ্যে হাম্বা – হাম্বা রবও করতে পারে। তাই অবিলম্বে এটা বন্ধ করা হােক।

সমসাময়িক বড় ডাক্তাররা তার এই নতুন আবিষ্কারকে পাত্তাই দিলেন না। কিন্তু কিছু দিন পরেই এর সত্যতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তাঁর নির্দেশিত উপায়ে অনেকেই টিকা দিলেন । টিকা নেয়ার পর সবাই সুস্থ হওয়া আরম্ভ করলো। এরপর ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানির লোকজন টিকা নেবার জন্য পাগল হয়ে উঠল । 

পরীক্ষামূলকভাবে ব্যাপক টিকা দেওয়ার পর দু’বছর পর্যন্ত সে দেশগুলাে থেকে বসন্তে মৃত্যুর কোনাে খবর পাওয়া গেল না। সবাই তখন এই মহান আবিষ্কারককে ধন্য ধন্য করতে লাগল। প্রশংসার বন্যায় ভেসে গেল দুনিয়া। এই হল ডা.জেনারের বসন্তের টিকা বা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কাহিনি। 

ভ্যাক্সিন নামকরণ

এডওয়ার্ড জেনার ভ্যাক্সিন তৈরি করেছিলেন গরুর ভেসিকলের ভেতরের তরল অংশ দিয়ে। ভ্যাক্সিন শব্দটা এসেছে ভেক্কা (Vacca) থেকে। ভেক্কার অর্থ হচ্ছে গাভী (Cow)। আবার যেহেতু ভ্যাক্সিন দেখতে খুব স্বচ্ছ এবং এর কোনাে রং নেই, তাই এর পুরাে নাম হচ্ছে Vaccine Lymph বা গাে-বীজ লসিকা

ভ্যাক্সিন কীভাবে কাজ করে?

ভ্যাক্সিন
চিত্র: ভ্যাক্সিন । চিত্রসূত্র: FDA

ভ্যাক্সিন প্রয়ােগের মাধ্যমে অণুজীব, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সংক্রমণকে প্রতিরােধ করা হয়। প্রক্রিয়াটি সাধারণভাবে টিকা দেয়া (inoculation) নামে পরিচিত। নির্দিষ্ট রােগের ভ্যাক্সিন নির্দিষ্ট জীবাণু থেকেই সংগ্রহ ও উৎপন্ন করা হলেও প্রক্রিয়াগতকারণে এ পদার্থ মানবদেহে কোনাে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা রােগ সৃষ্টির পরিবর্তে দেহকে রােগমুক্ত রাখতে ও রােগ প্রতিরােধ করতে সাহায্য করে ।

ভ্যাক্সিনের প্রয়ােজনীয়তা

পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই শৈশব ও কৈশােরকালীন সময়ে ভ্যাক্সিন প্রয়ােগ করা হয়। পােলিও, টাইফয়েড, ডিপথেরিয়াসহ অন্যান্য মারাত্মক জীবন ঝুঁকিপূর্ণ ও আজীবন কষ্টকর রােগ-ব্যাধির কবল থেকে নিজের বংশধরকে বাঁচাতে সবাই তৎপর থাকেন। সুস্থ পরিবার ও জাতি গড়তে সুস্থ-সবল বংশধর প্রয়ােজন। ভ্যাক্সিন সুষ্ঠুভাবে কাজ করে, এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সামান্য। পৃথিবীতে প্রতিবছর ৩ মিলিয়ন লােকের জীবন রক্ষা হয় এবং রােগের কষ্ট থেকে ও স্থায়ী বিকলাঙ্গ হওয়া থেকে রক্ষা পায় আরও কয়েক মিলিয়ন মানুষ। ভ্যাক্সিনে প্রতিরােধযােগ্য হাম, হুপিংকাশি, পােলিও, টাইফয়েড প্রভৃতি যে সম্ভাব্য জটিলতা (হাসপাতালে ভর্তি অঙ্গচ্ছেদ, মস্তিষ্কের ক্ষতি, পঙ্গুত্ব, মেনিনজাইটিস, বধিরতা এমনকি মৃত্যু) সৃষ্টি করে তা থেকে মুক্তি পায়। শিশু যদি ভ্যাক্সিন না নিয়ে থাকে তাহলে রােগ ব্যাধি অন্য শিশুতে ছড়াতে পারে। এমন শিশু রােগাক্রান্ত হতে পারে যার দেহে ভ্যাক্সিন প্রয়ােগ সম্ভব নয় (যেমন: লিউকেমিয়া বা অন্য কোনাে ক্যান্সার আক্রান্ত, কিংবা অনাক্রম্যতন্ত্রে সমস্যা আছে এমন)। শিশুকে ভ্যাক্সিন না দিলে রােগ-ব্যাধি প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে আবার সমাজে ফিরে আসবে। ভ্যাক্সিনেশনের ফলে শিশু অসুখে ভুগে মনমরা হয়ে ঘরে বসে না থেকে সুস্থ-সবল, হাসি-খুশি ভাবে বেড়ে উঠে।

এডওয়ার্ড জেনার (Dr. Edward Jenner) ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম গুটিবসন্তের (small pox) ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে যুগান্তকারী ভ্যাক্সিন বিপ্লব ঘটিয়ে মানুষের রােগমুক্ত দীর্ঘ সুন্দর জীবনের যে প্রত্যাশা জাগিয়েছেন, তার ধারাবাহিকতায় আজ দ্বিতীয় জেনারেশন (Second Generation) ভ্যাক্সিন হিসেবে হেপাটাইটিস বি ভ্যাক্সিন উৎপন্ন হয়েছে। পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেয়া কোভিড-১৯ থেকে মুক্তি লাভের জন্য পুরো ৭৫০ কোটি জনতার এখন যে একটাই প্রত্যাশা তা হচ্ছে ভ্যাক্সিন। আশার কথা রাশিয়া ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। এই ভ্যাকসিন হাতে পেলে আমরা কোভিড-১৯ এর মতো রোগকেও বুড়ো আঙুল দেখাতে সক্ষম হব।

putin russia corona vaccine
আলোচনা সমালোচনায় রাশিয়ার ভ্যাক্সিন । চিত্রসূত্র: অসামান্য

১৭৬৬ সালে এডওয়ার্ড জেনারের মাঝে যে চিন্তার অঙ্কুরোদগম হয়েছিল ১৭৯৫ সালে তা চারা গাছ হিসেবে আমরা পেয়েছি। আর এখনও আমরা সেই ভ্যাক্সিন নামক গাছের ফল ভোগ করেই চলেছি। আশা করি অতি শীঘ্রই আমরা করোনা ভাইরাসের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হবো। এডওয়ার্ড জেনারের কর্মকাণ্ড থেকে মনে পড়ছে আলবার্ট আইনস্টাইন এর একটি জনপ্রিয় উক্তি –

আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ বাঁধা, সুদূরের এক অদৃশ্য বংশীবাদকের রহস্যময় সুরে।

সহায়ক গ্রন্থপুঞ্জী:

  • Hume, Ruth Fox. Men Of Medicine. ISBN:9780394905495
  • চৌধুরী, শুভাগত। চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের গল্প। ISBN:9789848857052। প্রকাশক: হেরা প্রিন্টার্স।

তথ্যসূত্র:

ফিচার চিত্রসূত্র – Unsplash

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ভ্যাক্সিন আবিষ্কার: ড. এডওয়ার্ড জেনার এবং মানবজাতির বসন্তজয়

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!