mr bean

ব্রিটিশ কমেডি: সময় ছাপিয়ে এখনো দুর্দান্ত যে ৫টি সিটকম

3.5
(2)
Bookmark

No account yet? Register

বলা হয়, ব্রিটিশ কমেডি নাকি খুব সূক্ষ্ম! বোঝার জন্যে ঘটে খানিক বুদ্ধি থাকা চাই। 

অসামান্যতে লিখুন

এই নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে তুমুল তর্কাতর্কি হতে পারে তবে এই মুহূর্তে শান্তিবাদী পথটি হলো কয়েকটি ব্রিটিশ সিটকম দেখে মুচকি হাসতে হাসতে প্রথম বাক্যটিকে সমর্থন করা।     

আমাদের মা-বাবারা যখন আগের দিনের সাদাকালো বাংলা সিনেমা দেখে শুনিয়ে শুনিয়ে অশ্রু বিসর্জন দেন, ‘আহা! আগের দিনের সব কিছুই কত না ভালো ছিল!’ এই স্বগতোক্তির মাঝে কিন্তু ভুল নেই!

বরং সেই সময়ের মাঝে মানসিকতা আর চিন্তাভাবনার যে নির্জলা শুদ্ধতাটুকু ছিল সেটা এখনকার টিভি সিরিজ বা সিনেমায় প্রায়শ অনুপস্থিত। 

আগের দিনের কম রেজুলেশনের ছবি, ঘড়ঘড় করা অডিও কিংবা ৭০ এর দশকের বড় জুলপি-গোঁফ-বেলবটমের মিশেল অথবা কয়েন ঢুকিয়ে ক্যাডিলাকস অ্যান্ড ডাইনোসরস খেলার দিনগুলো এক ঘোর জাগানো নস্টালজিয়া। খুব অদ্ভুত ধরনের আবেগ।

ষাট-সত্তরের দশকের ব্রিটেনের কথা ভাবুন। রক এন রোলে খ্যাপা ব্রিটিশ ছেলেপেলে আর তাদের ছন্নছাড়া উদ্দাম জীবন, চারদিকে কীসের যেন একটা পরিবর্তনের হাওয়া। 

সেই সময়টাতেই তৈরি হলো সবচেয়ে অসাধারণ সব ব্রিটিশ টিভি সিরিজ, যার কদর বুঝতে চাইলে ফিরে যেতে হবে সেই আগের ব্রিটেনে।

এখন আপনি যদি এই বলে বাগড়া দিতে আসেন যে, ব্রিটিশরা এমনিতেই নাকউঁচু, বিশ্বময় মোড়লিপনার ছড়িখানা হাতছাড়া হলেও এরা এখনো আলগা এলিটিজমে ভোগে, চায়ের কাপে চুক চুক করে চুমুক দেয় আর নকল হাসি হেসে বলে, হা হা, হাউ লাভলি!

তাহলে ব্রিটিশ সিটকমই কেন?

উত্তর, এই লেখার প্রথম বাক্য!

(তবে বেশিরভাগ বাদামি চামড়ার মানুষের মতন আমিও স্বীকার করবো না যে পোস্ট-কলোনিয়াল হ্যাংওভার হয়ত একটা বড় কারণ।)

আসুন দেখে নেয়া যাক লিস্টে কী কী অপেক্ষা করছে:

মন্টি পাইথনস ফ্লাইং সার্কাস (১৯৬৯-১৯৭৪)

পাইথন প্রজাতির সাপের সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্রিটিশ জেনারেল মন্টগোমারির কোনো ধরনের সম্পর্ক না থাকলেও মন্টি পাইথন নিঃসন্দেহে সেরাদের সেরা কমেডি।

ব্রিটিশ কমেডির অন্যতম উদাহরণ হল মন্টি পাইথনস ফ্লাইং সার্কাস
মন্টি পাইথনস ফ্লাইং সার্কাসের পোস্টার । চিত্রসূত্র: Pinterest

ব্রিটিশ কমেডিগুলোর মধ্যে এটি মূলত স্কেচ কমেডি অর্থাৎ ছোট ছোট কিছু ঘটনা মিলে একটি পর্ব যার প্রতিটি ছোট ঘটনাকে বলা হয় একেকটি স্কেচ। 

অ্যানিমেশনেরও বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। বিশেষত প্রায়ই একটি গোবদা ধরনের কার্টুন পায়ের দেখা মেলে যেটি ওপর থেকে ধপ করে নেমে এসে সবকিছু মাড়িয়ে দেয়।

শোটিতে স্যাটায়ার, ডার্ক কমেডির আড়ালে উঠে আসে ব্রিটিশদের আটপৌরে জীবনের অসংগতি, অচতুরতা এবং তখনকার রাজনৈতিক অবস্থা। 

যেমন ধরুন, একটি পর্বে দেখা যায়, একজন লেখক বিশ্বের সবচেয়ে হাসির কৌতুকটি লিখেছে যেটি পড়ে সে নিজেই হাসতে হাসতে মারা যায়; তার স্ত্রী মৃত স্বামীর পাশে পড়ে থাকা কাগজে লেখা কৌতুকটি পড়ে ফেলে আর বেঘোরে মারা পড়ে।

বাড়িতে পুলিশ আসে। হাসতে হাসতে পুলিশও মারা যায়।

অবশেষে এই ভয়ংকর কৌতুকের জার্মান ভার্শন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত হয় জার্মানদের বিরুদ্ধে।

যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দুক কামান চালানোর পরিবর্তে ব্রিটিশ সৈন্যদের এক টুকরো কাগজ বের করে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কৌতুক পড়তে দেখা যায়। ফলাফল? অনেক জার্মানের ঘায়েল হওয়া অথবা ব্রিটিশদের বিজয়।   

ন্টি পাইথন টিমের সদস্যরা
মন্টি পাইথন টিমের সদস্যরা । চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

৪টি মৌসুমে ৪৫টি পর্বে এরকম হাজারো স্পর্শকাতর বিষয়কে খামখেয়ালি কৌতুকে পরিণত করার কাজটিতে পাইথনরা ছিলো অনবদ্য।           

শোটির আইএমডিবি রেটিং ৮.৮/১০।

মাইন্ড ইয়োর ল্যাংগুয়েজ (১৯৭৭-১৯৭৯, ১৯৮৫)

হাস্যরসে ভরপুর মাইন্ড ইয়োর ল্যাংগুয়েজ
হাস্যরসে ভরপুর মাইন্ড ইয়োর ল্যাংগুয়েজ। চিত্রসূত্র: Amazon

বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে ইংল্যান্ডে আসা মানুষগুলো ইংরেজি ভাষাটা শিখে আসে সে কথা কে বলেছে?

আর ঠিক এই কাজটা করতে গিয়েই একের পর এক  হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে এই সিটকমের চরিত্রগুলো।

এক বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রে কিছু বিদেশি শিক্ষার্থী জড়ো হয় ইংরেজি শেখার আশায়।

দেখা মেলে পাকিস্তানের আলী নাদিম, ভারতের রঞ্জিত সিংহ, জামিলা মাসী, জার্মানির আনা শ্মিড, চিনের লি, জাপানের তারো, ইতালির জিওভান্নি, গ্রিসের মাক্সিমিলিয়ান পাপান্দ্রেয়ো (Maximilian Papandrious), স্পেনের হুয়ান, লাস্যময়ী ফরাসি তরুণী দানিয়েল  এবং আরো কয়েকজন শিক্ষার্থীর, যাদের প্রায় সবারই রয়েছে বেশ মজার মজার পিকআপ লাইন।

তাদের শিক্ষক ভালো মানুষ গোছের মিস্টার জেরেমি ব্রাউন (অভিনয়ে ব্যারি ইভানস) নাকাল হলেও হাল ছাড়েন না। 

৪টি সিজনের ৪২ টি পর্বে ব্রাউন সাহেবের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিখতে পেরেছিল কী না সেটা জানা যাবে।

পুরো সিটকমটি জুড়ে অল্পবিস্তর বর্ণবাদ বিরাজ করলেও ‘ইহা-শুধুই-কমেডি’ এই অজুহাতে সেসব গায়ে না মাখাই শ্রেয়।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, অসাধারণ এই ব্রিটিশ কমেডি সিটকমটি বন্ধ হয়ে যাবার পেছনের কারণও ছিলো এই বর্ণবাদের অভিযোগ।  

আইএমডিবি রেটিং ৮.৭/১০।

ফল্টি টাওয়ার্স (১৯৭৫, ১৯৭৯): শ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ কমেডি (?)

সত্তরের দশকের জনপ্রিয় ব্রিটিশ কমেডি সিটকম ফল্টি টাওয়ার্স
সত্তরের দশকের জনপ্রিয় সিটকম ফল্টি টাওয়ার্স। চিত্রসূত্র: The Guardian

সমালোচকদের মতে, ফল্টি টাওয়ার্স হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ কমেডি ধাঁচের টিভি সিরিজ। 

এখানে মোটেও অত্যুক্তি করা হয়নি।

বিবিসি ২ এ প্রথম ব্রডকাস্ট হবার ৪৫ বছর পরেও ব্রিটিশদের কাছে সিরিজটির সমাদর কমেনি বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে এবং প্রায়ই রি-ব্রডকাস্ট করা হয়।

বলা হয়, ত্রিশ বছরের বেশি বয়সের বেশিরভাগ ব্রিটন ব্যাসিল ফল্টির বিখ্যাত “Don’t mention the war” উক্তিটির সাথে পরিচিত।   

ব্রিটেনের পপ কালচারে ফল্টি টাওয়ার্স আজো বেশ শক্তভাবে বিরাজমান।     

কাহিনির মূলে রয়েছেন এক হোটেল মালিক  ব্যাসিল ফল্টি (অভিনয়ে জন ক্লিজ), তার স্ত্রী সিবিল, ইংরেজিতে দুর্বল এক স্প্যানিশ ওয়েটার মানুয়েল। 

ব্যাসিল ফল্টি এক বদমেজাজি মানুষ, মনে মনে আশা রাখেন একদিন ব্রিটেনের অভিজাত শ্রেণির একজন হিসেবে গণ্য হবেন। কাজেই নিজের হোটেলের সাধারণ কাস্টমারদের প্রতি তার সাংঘাতিক অনীহা, কাস্টমার এলে যেন তার বিরক্তি ধরে যায়!   

অন্য দিকে সিবিল তার উল্টো; ভদ্রমহিলা বেশ বন্ধুবৎসল। এই দম্পতির হোটেল ব্যবসা শেষতক কীভাবে এত বড় কমেডি গ্রেট হয়ে উঠলো সেটি জানতে পারবেন মাত্র দুইটি সিজনের ১২ টি পর্বে।

আইএমডিবি রেটিং- ৮.৭/১০    

ব্ল্যাকেডার (১৯৮৩-১৯৮৯): মিস্টার বিনের ব্রিটিশ কমেডি

মিস্টার বিন খ্যাত রোয়ান অ্যাটকিনসন
মিস্টার বিন খ্যাত রোয়ান অ্যাটকিনসন । চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

যদি ব্ল্যাকেডারের সাথে একেবারেই পরিচিত না থেকে থাকেন তবে জোরালো সম্ভাবনা আছে ব্ল্যাকেডার সাহেবকে দেখে আপনি সোল্লাসে বলে উঠবেন, ‘আরে এইটা তো মিস্টার বিন! ও এইখানে কী করে?’

অথচ আশির দশকে রোয়ান অ্যাটকিনসনকে বেশিরভাগ মানুষ চিনতো এই ব্ল্যাকেডার সিরিজের মূল চরিত্র এডমান্ড ব্ল্যাকেডার হিসেবে।

এখনোও এই চরিত্র এবং সিরিজটি ব্রিটেনে তুমুল জনপ্রিয়। ব্রিটেনের সবচেয়ে সেরা সিটকমগুলোর  তালিকায় একেবারে শুরুর দিকে রয়েছে ব্ল্যাকেডারের অবস্থান।

ইতিহাস পরীক্ষায় বানিয়ে লেখার সুযোগ না থাকলেও বানিয়ে বানিয়ে ইতিহাসের গল্প শোনায় ব্ল্যাকেডার, যার হিরো (কিংবা অ্যান্টিহিরো)  ব্ল্যাকেডার নিজেই। 

ঠিক ঠিক এগোনোর প্ল্যান থাকলেও সব কাজে শেষে ভজঘট পাকিয়ে ফেলা চরিত্র ব্ল্যাকেডার। 

প্রতিটি সিরিজের টাইমলাইন ভিন্ন ভিন্ন। একইসাথে প্রতিটি সিরিজের কাহিনিও ভিন্ন ভিন্ন।

যেমন প্রথম সিজনে দেখা যায় ১৪৮৫ সালে ইংল্যান্ডের কল্পিত রাজা চতুর্থ রিচার্ডের আমল। তাঁর পুত্র এডমান্ড (অভিনয়ে রোয়ান অ্যাটকিনসন) নিজে রাজা হতে চাইলেও বাবার সুনজর পান না। সেখান থেকে এডমান্ড ওরফে স্বঘোষিত ‘ব্ল্যাকেডার’ কীভাবে রাজা হয়ে জড়িয়ে পড়েন বিশাল ঝামেলায় তারই ফিরিস্তি দেখা যাবে।

একইভাবে দ্বিতীয় মৌসুমের কালপর্ব রানি প্রথম এলিজাবেথের যুগের, পরেরটি তৃতীয় জর্জের এবং শেষটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন। তন্মধ্যে চতুর্থ মৌসুমটি সর্বাধিক জনপ্রিয়।  

মজার ব্যাপার হলো, প্রতিটি মৌসুমে ব্ল্যাকেডার  কীভাবে কীভাবে যেন তার আগের মৌসুমের ব্ল্যাকেডারের বংশধর—যদিও কোনো পর্বেই ব্ল্যাকেডারকে বিবাহিত হিসেবে দেখা যায় না!    

আ বিট অফ ফ্রাই অ্যান্ড লরি (১৯৮৭ – ১৯৯৫)

ব্রিটেনের অন্যতম সফল একটি টিভি সিরিজের যাত্রা শুরু স্টিফেন ফ্রাই আর হিউ লরির হাত ধরে। মন্টি পাইথন যে ধাঁচের ব্রিটিশ কমেডি, এটিও সেরকম; স্কেচ কমেডি। আধ ঘণ্টার প্রতিটি পর্বে স্কেচগুলোর বিস্তার ৫-৬ মিনিটের মতো।

সিরিজটি তার ৪টি মৌসুমের ২৬টি পর্বে কখনো ব্রিটনদের রোজকার জীবনের হাস্যকর ঘটনা তুলে ধরেছে, কখনো সূক্ষ্মভাবে উপহাস করেছে তখনকার রাজনৈতিক নেতাদের নির্বুদ্ধিতাকে আবার কখনো সমাজের বেনিয়ম-বেকানুনের বিরুদ্ধেও খোঁচা মেরে কথা বলতে দ্বিধা করে নি।   

প্রধান অভিনেতা এই দুজনই–স্টিফেন ফ্রাই এবং হিউ লরি। তবে কয়েকজন কুশীলবকে প্রায়ই কিছু সহযোগী চরিত্রে দেখা যায়।  

আইএমডিবি রেটিং – ৮.৩/১০

বাসায় বসে বোরড হতে না চাইলে এক কাপ চা হাতে নিয়ে এখুনি বসে পড়ুন বিখ্যাত এই ব্রিটিশ কমেডি সিটকমগুলো দেখতে!

তথ্যসূত্র:

ফিচার ছবিসূত্রঃ Pixabay

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের প্রকাশনালয়

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
One Thought on ব্রিটিশ কমেডি: সময় ছাপিয়ে এখনো দুর্দান্ত যে ৫টি সিটকম
    অ্যাভাটার ২: বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেতে চলেছে ২০২২ সালে - অসামান্য
    9 Oct 2020
    8:01pm

    […] […]

    0
    0

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!