মুখোমুখি বাপু ও বঙ্গবন্ধু: সমাপ্ত বনাম অসমাপ্ত অধ্যায়

হারুন অর রশিদ
3.8
(5)
Bookmark

No account yet? Register

“সত্যের মুখ লুকিয়ে আছে মায়ার সোনালি পর্দার পেছনে”

– মহাত্মা গান্ধী

ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, একটি অবিভক্ত দেশের দুটি ভিন্ন পরিবারে, একজন আঠারো শতকের ষাটের দশকে অপরজন উনিশ শতকের প্রায় প্রাককালে ভীষণ সুন্দর মিষ্টি মুহূর্তে রত্নগর্ভা মায়ের উদর ত্যাগ করে পৃথিবী নামক গ্রহটিতে জন্ম গ্রহণ করেন। বোঝাই যাচ্ছে একজনের জন্মের প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে অপরজন পৃথিবীর আলো বাতাসকে স্পর্শ করেছেন। হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক, এতক্ষণে হয়তো বুঝেই ফেলেছেন উপমহাদেশ কাঁপানো দুই উজ্জ্বল রাজনীতিবিদ মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কেই বলতে চাচ্ছি। 

১৯৪৭ সালে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে মিলে কাজ করছিলেন হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দী। সাম্প্রদায়িক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মহাত্মা গান্ধী কলকাতা সফর করেন। ঠিক ওই সময়ে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দীর সফর সঙ্গী হওয়ায় মহাত্মা গান্ধীর দর্শন লাভ করেন। তখন হয়তো কেউ কল্পনাই করেনি দুজনই পৃথক দুই দেশের জাতির জনকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। আমার আজকের এই নিবন্ধে এই দুই মহানায়ককে নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করার চেষ্টা করলাম। প্রিয় পাঠক শেষ পর্যন্ত সাথেই থাকুন।

মহাত্মা গান্ধী

গান্ধী
মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী। ছবিসূত্র: Getty Images/News 18

পৃথিবীতে কালান্তরে এমন কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটে যাদের আগমন এবং কর্মকাণ্ডে পুরো মানবজাতির কল্যাণ নিহিত থাকে। অন্ধকারে তাঁরা আসেন আলাের মশাল নিয়ে। তাঁরা নতুন করে ভাবতে শেখান, নির্যাতিত মানুষদের নিজেদের অধিকার আদায় করতে শেখান। তেমনি একজন মহামানব, কিংবদন্তি মহাত্মা গান্ধী। যার হাতে দমিত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খল। সূচিত হয়েছিলো স্বাধীনতার সূর্য। জীবনের সবটুকু দিয়ে রচনা করেছেন মানবকল্যাণের বাণী। তিনি সার্বজনীন, অমলিন, সর্বদলীয় আদর্শ।

(১৮৬৯-১৯৪৮) প্রায় দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনের পথচলায় তিনি রচনা করেছেন একের পর এক অধ্যায়। জন্ম থেকে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামী,অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে লিপ্ত। 

১৮ বছর বয়সে উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশ যাত্রাতে মায়ের আপত্তি সত্বেও বিদেশ গমন, সেখানে মায়ের কাছে করে আসা শপথের মর্যাদা রাখতে গিয়ে একের পর এক অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে এসে ব্যারিস্টারি চর্চায় একের পর এক অপারগতা শেষে সব কিছুর পাঠ চুকিয়ে এক দাদার আশীর্বাদে মামলা লড়তে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমেই বর্ণবাদের শিকার হওয়াসহ একজন প্রবাসী ভারতীয় হিসেবে একের পর এক ঘটনা-রটনা, ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ করতে না পারা, দক্ষিণ আফ্রিকায় নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা,স্বদেশি ভারতীয়দের নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা এবং অবশেষে দীর্ঘ সময় পর স্বদেশের পানে ফিরে আসা! কংগ্রেসে যোগদান, সত্যাগ্রহের বাণী প্রচার, অহিংসনীতি চর্চা করা, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, হিন্দু-মুসলমান অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সকলের মনে জাগ্রত করা, বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা দর্শন এবং পরিশেষে ঘাতকের আঘাতে অন্তিম মহাকাশপানে যাত্রা, এত সবকিছুর মাঝেই লুকিয়ে আছে সংগ্রাম আর সংগ্রাম। এত সব কিছুর মধ্যে অবশ্য ভারতের জাতির জনকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবিসূত্র: নেদারল্যান্ডস্থ বাংলাদেশের দূতাবাস

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ এসেছিল যাঁদের পুরো জীবনটাই ছিল সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এমন অনেক বিপ্লবীই আছে যাদের জীবনে দু-দুটি দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করার দুর্ভাগ্য কিংবা যদি বলি সৌভাগ্য হয়নি। মুজিব এমনই একজন মানুষ, যার জীবনে দু-দুটি দেশের স্বাধীনতাকে প্রত্যক্ষ দেখার করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তিনি প্রত্যেক পূর্ব-বঙ্গের মানুষের মনে স্বাধীনতার যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন, তা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের ধুলােয় মিশিয়ে এই দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল। তাঁর মতাদর্শ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এই একুশ শতকেও আমাদের অনুপ্রাণিত করার জন্য যথেষ্ট এবং তরুণ রাজনীতিবিদদের জন্য উজ্জ্বল আদর্শ।

(১৯২০-১৯৭৫) পরিমিত কিন্তু অল্প ৫৫ বছরের জীবনে নিয়োজিত হয়েছেন একের পর এক নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। কারাবরণ করেছেন পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরের প্রায় ১২ বছর।

চল্লিশের দশক থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় অবস্থান জানান দিচ্ছিল যে রাজনীতিতে বিপ্লব ঘটাতেই তাঁর আগমন। ৪৭ এর দেশভাগের আগে তাঁর মিশন এন্ড ভিশন ছিল অবিভক্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের স্বাধীনতা। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর সব জাতীয় নেতাই যখন নেতৃত্বের ভাগ-বাটোয়ারাতে ব্যস্ত তখন সু-বুদ্ধি সম্পন্ন তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুরের বুঝতে দেরি হয়নি পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে পূর্ব-পাকিস্তান আবার বঞ্চিত হতে যাচ্ছে। মুসলিম লীগের রাজনীতি থেকে পৃথক হয়ে তিনি সমমনা ব্যক্তিদের নিয়ে একে একে গঠন করেন মুসলিম ছাত্রলীগ, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি করে গঠন করেন মুসলিম আওয়ামীলীগ, ভাষা আন্দোলনের সময় জেলে অবস্থান করে পরোক্ষভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে অবদান,পরবর্তীতে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে আওয়ামীলীগের পুনঃনামকরণ, ষাটের দশকে ছয়দফা দাবি পেশ করে পূর্ব বঙ্গের বাঙালীদের একমাত্র প্রতিনিধি বনে যাওয়া, ৬৯ এ রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান মামলা অবশেষে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটানো, ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগের একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন, ৭১ এর ৭ই মার্চে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ম্যাজিকাল ভাষণ এবং সবশেষে ২৬ শে মার্চের মহান স্বাধীনতা ঘোষণা পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে শেখ মুজিব নামটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িত আছে। এত সব অবদানের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীনের পর দেশের জাতির জনকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া অন্য সব খেতাবকে ইতিহাসের পাতায় বরাবরই ম্লান করে দেয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বয়ানে মহাত্মা গান্ধীর দর্শন

বঙ্গবন্ধু, গান্ধী, সোহরাওয়ার্দী
 হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, গান্ধী ও শেখ মুজিব। ছবিসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

“শহীদ সাহেবের সাথে কয়েক জায়গায় আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর সাথে শহীদ সাহেব হিন্দু – মুসলমান শান্তি কায়েম করার জন্য কাজ করছিলেন। তখন মুসলমানদের উপর মাঝে মাঝে আক্রমণ হচ্ছিল। সেদিন রবিবার ছিল। আমি সকালবেলা শহীদ সাহেবের বাসায় যাই। তিনি আমাকে বললেন, “চল,ব্যারাকপুর যাই। সেখানে খুব গােলমাল হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীও যাবেন। আমি বললাম, “যাব স্যার।” তাঁর গাড়িতে উঠলাম, নারকেলডাঙ্গা এলাম। সেখান থেকে মহাত্মাজী, মনু গান্ধী, আভা গান্ধী ও তাঁর সেক্রেটারি এবং কিছু কংগ্রেস নেতাও সাথে চললেন। ব্যারাকপুরের দিকে রওয়ানা করলাম। হাজার হাজার লােক রাস্তার দু’পাশে ভিড় করেছে, তাদের শুধু এক কথা, “বাপুজী কি জয়।” ব্যারাকপুরে পৌঁছে দেখি, এক বিরাট সভার আয়ােজন হয়েছে। মহাত্মাজী রবিবার কারও সাথে কথা বলেন না, বক্তৃতা তাে করলেই না। মনু গান্ধী ও আভা গান্ধী “আলহামদু “সূরা  “কুলহু “ সূরা পড়লেন। তারপরে বাংলা গান গাইলেন। মহাত্মাজী লিখে দিলেন, তাঁর বক্তৃতা সেক্রেটারি পড়ে শােনালেন। সত্যই ভদ্রলােক জাদু জানতেন। লােকে চিৎকার করে উঠল, হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই। সমস্ত আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়ে গেল এক মুহূর্তের মধ্যে।”

এরপর শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর জনৈক বন্ধু স্থির করলেন মহাত্মা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করবেন এবং তাঁকে কিছু উপহার দিবেন। অনেক ভাবনা চিন্তার পর শেষ পর্যন্ত তাঁকে কলকাতা বিহার দাঙ্গায় তােলা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ছবি অ্যালবাম আকারে উপহার প্রদান করেছিলেন ।

মুজিবের বয়ানে গান্ধীকে উপহার প্রদানের ঘটনা

“মহাত্মজীর ভাষণের দু’দিন পরেই বােধহয় ঈদের নামাজ হল। মুসলমানরা ভয় পেয়ে গেছে, ঈদের নামাজ পড়বে কি পড়বে না? মহাত্মাজী ঘোষণা করলেন, যদি দাঙ্গা হয় এবং মুসলমানদের উপর কেউ অত্যাচার করে তবে তিনি অনশন  করবেন। মহল্লায় মহল্লায় বিশেষ করে হিন্দি ভাষাভাষী লােকেরা শােভাযাত্র করে স্লোগান দিতে লাগল, “মুসলমানকো মাত মারাে, বাপুজী অনশন কা, হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই।” ঈদের দিনটা শান্তিতেই কাটল। 

আমি আর ইয়াকুব আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধু পরামর্শ করলাম, আজ মহাত্মাজীকে একটা উপহার দিব। ইয়াকুব বলল, “তােমার মনে আছে আমি আর তুমি বিহার থেকে দাঙ্গার সময় কিছু ছবি তুলেছিলাম?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, মনে আছে।” ইয়াকুব বলল, “সমস্ত কলকাতা ঘুরে আমি ফটো তুলেছি। তুমি জানো না তার কপিও করেছি। সেই ছবিগুলি থেকে কিছু ছবি বেছে একটা প্যাকেট করে মহাত্মাজীকে উপহার দিলে কেমন হয়? ” আমি বললাম, “চমৎকার হবে। চল যাই,প্যাকেট করে ফেলি।” যেমন কথা,তেমন কাজ। দুইজনে বসে পড়লাম। তারপর প্যাকেটটা এমনভাবে বাধা হল যে, কমপক্ষে দশ মিনিট লাগবে খুলতে। আমরা তাঁকে উপহার দিয়েই ভাগব। এই ফটোর মধ্যে ছিল মুসলমান মেয়েদের স্তন কাটা, ছােট শিশুদের মাথা নাই, শুধু শরীরটা আছে, বস্তি, মসজিদে আগুনে জ্বলছে, রাস্তায় লাশ পড়ে আছে, এমনই আরও অনেক কিছু। মহাত্মাজী দেখুক, কিভাবে তার লােকেরা দাঙ্গা-হাঙ্গামা করেছে এবং নিরীহ লােককে হত্যা করেছে। আমরা নারকেলডাঙ্গায় মহাত্মাজীর ওখানে পৌঁছালাম । তাঁর সাথে ঈদের মােলাকাত করব বললাম । আমাদের তখনই তাঁর কামরায় নিয়ে যাওয়া হল। মহাত্মাজী আমাদের কয়েকটা আপেল দিলেন। আমরা মহাত্মাজীকে প্যাকেটটা উপহার দিলাম। তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করলেন। আমরা অপরিচিত সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নাই। তবে বুঝতে পারলাম, তাঁর নাতনী মনু গান্ধী আমার চেহারা দেখেছে ব্যারাকপুর সভায়, কারণ আমি শহীদ সাহেবের কাছে প্লাটফর্মে বসেছিলাম। আমরা উপহার দিয়ে চলে এলাম তাড়াতাড়ি হেঁটে। শহীদ সাহেব তখন ওখানে নাই। বন্ধু ইয়াকুবের এই ফটোগুলি যে মহাত্মা গান্ধীর মনে বিরাট দাগ কেটেছিল তাতে সন্দেহ নাই।”

সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ গঠনে অবদান

ভিন্ন সময়ে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তাঁরা লড়েছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য, লক্ষ্য ছিল জনতার মুক্তি, আর সেই লড়াইয়ে জিতেছেন দুজনই। কিন্তু তাঁরা জাতিকে স্বাধীনতা এনে দেয়ার পর খুব বেশি একটা সময় বেঁচে থাকতে পারেননি। গান্ধী পেয়েছিলেন প্রায় এক বছর এবং শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছিলেন সাড়ে তিন বছরের মতো।

গান্ধী
ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী। ছবিসূত্র: Deccan Chronicle

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মাঝে প্রধানমন্ত্রী কিংবা নেতৃত্বস্থানীয় কোন দায়িত্ব নেয়ার আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় নি। কিন্তু দায়িত্ব নেন নি তো কি হয়েছে, উত্তরে হিমালয়, দক্ষিনে কন্যা কুমারীকা, পশ্চিমে বেলুচিস্থানের মরুভূমি আর খাইবার গিরিপথ থেকে পূর্বে বার্মার আরাকান সীমান্ত অবধি এক বিশাল জনগােষ্ঠির তিনি ছিলেন মুকুটহীন সম্রাট, কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মণি। পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির এই ছােট্ট মানুষটি শুন্য হাতে লড়াই করছিলেন ভারতবর্ষকে প্রায় দু’শ বছর ধরে দখল করে রাখা তখনকার বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শক্তির বিরুদ্ধেI আর ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা।  

ভারতীয় রাজনৈতিক দিগন্তে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর উদ্দীপনা শত শত ভারতীয়কে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করেছিল। সত্যিই আশ্চর্যজনক যে গান্ধীজির ব্যক্তিত্ব তাঁর লক্ষ লক্ষ দেশবাসীর কল্পনায় আঁকড়ে ধরেছিল এবং পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পরেছে পুরো বিশ্বে।  

মহাত্মা গান্ধী সার্বজনীন শুভেচ্ছার মানুষ এবং শান্তির নায়ক হিসেবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হল গান্ধীজী তাঁর জীবনের সময়কালে শান্তির যে মশাল হাতে বেরিয়েছিলেন, আজও বিবাদ মীমাংসায়  তাঁর অহিংস পদ্ধতি মানবজাতিকে অবাক করে চলেছে। অনেকের কাছে, এটি কেবল একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা যে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ একটি জাতি ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে অহিংস নীতির মাধ্যমে কীভাবেই না একটি দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাও আবার গান্ধীজির মতো দুর্বল চেহারার নেতার নেতৃত্বে। এই অহিংস নীতিটি এখনও অবধারিত সাফল্যের ম্যাজিক স্পেল।

শপথ বাক্য পাঠরত শেখ মুজিবুর রহমান
শপথ বাক্য পাঠরত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবিসূত্র: The Financial Express

অপরদিকে, ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দায়িত্ব হাতে নিয়েই সাড়ে নয় মাসের মাথায় বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ছিল একটি অবিস্মরণীয় অর্জন। এ ছাড়াও তাঁর সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে তুলে ধরা, জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ, জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষায় ভাষণদান, ব্রিটিশ কমল ওয়েলথের সদস্যপদ লাভ, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণসহ দেশকে সোনার বাংলায় রুপ দানের জন্য আরও প্রভুত কার্যক্রম তাঁর আমলেই সংঘটিত হয়।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শুধু মাত্র একটি সরকার প্রতিষ্ঠা নয়, এটা একটা বড় ঘটনা এবং এই ঘটনার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র ভবিষ্যতে কীভাবে পূর্নগঠিত হবে তা নির্ধারিত হয়। তাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি। আর এই ঘটনার জন্য আমাদের গর্ব হওয়া উচিত যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এর একজন অবিসংবাদিত নেতা। 

আরও পড়ুন: নেতাজি: এক মহানায়কের জীবনকথা এবং মৃত্যু

ঘাতকের বুলেট জীবনের অন্তিম যাত্রা

মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু দুজনই সমগ্র বিশ্বের জন্য শান্তি ও মানবতার বাতিঘর। শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার শত্রুরা ভারত ও বাংলাদেশের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমানকে বেশি দিন বাঁচতে দেয়নি।

অন্তিম যাত্রায় মহাত্মা
অন্তিম যাত্রায় মহাত্মা গান্ধী। ছবিসূত্র: History.com

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান থেকে রিফিউজি হওয়া হিন্দুরা ক্রমাগত দিল্লির মসজিদ গুলোকে দখল করতে থাকে। অবস্থা এমন হয় যে হিন্দু মুসলমান সংঘাত আসন্ন। গান্ধীজী ঘটনার আকস্মিকতা লক্ষ করে দিল্লির মসজিদগুলোকে খালি করে দেয়ার জন্য অনশনে বসেন। গান্ধীজী তখন বলেছিলেন, ”তোমরা এই মসজিদগুলো খালি করে দাও, নইলে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরও বেড়ে যাবে।” গান্ধীর একক প্রচেষ্টাতেই তখন দিল্লীর মসজিদগুলো এবং মুসলমান সম্প্রদায় রক্ষা পেয়েছিল। এরই প্রতিশোধ নিতে, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি এক রাত্রিকালীন পথসভার শুরুতে, নাথুরাম গডসে নামক এক হিন্দু মৌলবাদী গান্ধীকে বুলেট বিদ্ধ করে হত্যা করেছিল।

ঘাতকের বুলেটে বিদ্ধ বঙ্গবন্ধু
ঘাতকের বুলেটে বিদ্ধ বঙ্গবন্ধু। ছবিসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

ঠিক একই ভাবে, স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের স্বাধীনতা বিরোধী কিছু মুখোশ পরা ব্যক্তির মনঃপুত সিদ্ধান্ত না নেয়া এবং একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার বিরোধীতায় তখন দেশের রাজনীতিতে ঘোলাটে অবস্থা বিরাজ করছিল। এরই সুযোগ নিয়ে একদল মধ্যম সারির মেজর এবং তাদেরই অনুগত কিছু সৈনিক ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এটি শুধু নিছক কোন হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এর পেছনে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। একটি  হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অন্যটি হলো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র যা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ওতপ্রোতভাবে ইন্ধন জুগিয়েছিল। পরিবর্তন একটা হবে সেটা অনেকেই মনে মনে ভাবছিলেন কিন্তু মুজিবকে এভাবে সপরিবারে হত্যা করা হবে তা হয়তো অনেকে চিন্তা পর্যন্ত করেন নাই। 

বিশ্ব আজ বিভিন্ন ধরনের দ্বন্দ্বের মুখোমুখি। আমরা দেখছি যে, সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উপর গান্ধীর দিয়ে যাওয়া নীতি সর্বকালে প্রাসঙ্গিক। কোন সন্দেহ নেই  তাঁর শিক্ষাগুলো বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাবার জন্য দেশপ্রেমের সর্বাধিক সমর্থনযোগ্য নীতি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় আশি বছর। প্রাকৃতিক নিয়মে হয়তো তিনি আর মাত্র কয়েক বছর জীবিত থাকতে পারতেন। তবুও এর মাঝেই তিনি তার দর্শন, মতাদর্শ, শিক্ষা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো সদ্য যৌবন পেরোনো এক অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে জাতির আরো অনেক অনেক পাওয়ার ছিল। আমরা নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই মুজিবকে হারিয়ে ফেলেছি।

ঠিক এখানেই গান্ধী সমাপ্ত এবং বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত।

সহায়ক গ্রন্থপুঞ্জি:

  • গান্ধী, মহাত্মা। আমার আত্মজীবনী। অনুবাদক: আব্দুল ওয়াহাব, প্রকাশনালয়: স্বরবৃত্ত. ISBN:978-9848-939-581
  • রহমান, মুজিবুর। অসমাপ্ত আত্মজীবনী। পৃষ্ঠা: ৮১
  • রহমান, মুজিবুর। অসমাপ্ত আত্মজীবনী। পৃষ্ঠা: ৮২
  • ম্যাসকার্নহাস, এন্থনি। বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অফ ব্লাড। অনুবাদক: মোহাম্মদ শাহজাহান, প্রকাশনালয়: হক্কানী পাবলিশার্স. ISBN:984-433-066-1

তথ্যসূত্র:

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on মুখোমুখি বাপু ও বঙ্গবন্ধু: সমাপ্ত বনাম অসমাপ্ত অধ্যায়

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!