বাংলা লোকছড়ায় ছেলে ভুলানো ও ঘুম বিষয়ক যত ছড়া

4.1
(9)
Bookmark

No account yet? Register

বড় হয়ে অনেকেরই অবচেতন মন ছেলেবেলায় ফিরতে চায়। অবারিত উন্মুক্ত যে জীবন, সেই জীবনের প্রতি মানুষের হৃদয় আজন্ম মোহিত। “ছেলেবেলা” একটা পরিনত বয়সে এসে সেই সময়টাকে রূপকথার মতই মনে হয়। জীবন পরিচালনার চিন্তা নেই, তথাকথিত ক্যারিয়ারের ভয় নেই, প্রিয় কাউকে হারানোর দুশ্চিন্তা নেই… পাঁচ পয়সার খেলনা নিয়ে যে জীবনে নিশ্চিন্তে দিনমান ছুটে বেড়ানো যায়, সে জীবন অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত জীবন। কিন্তু বড় হয়ে আমরা বুঝতে পারি, 

যে গেছে গত সূর্যের মত চলে, তারে ভুলাইব কোন ছলে?

আমাদের ছেলেবেলা গত হওয়া সূর্যের মতই। জ্বলজ্বলে একটি দিনের মতোই আমাদের ছেলেবেলা, আমাদের শৈশব আজ শুধুই স্মৃতি


মানুষের জীবন ফেলে আসা সময়ের সংকলন। আর মানুষ মাত্রই স্মৃতি রোমন্থন করতে খুব ভালোবাসে। অতীত জীবনের গল্প, কর্ম, প্রিয় মানুষ আর শৈশবের সেই দূরন্ত সময়ের বাস্তব স্বপ্নীল রূপ। চলমান নিবন্ধে শৈশবের স্মৃতির পৃষ্ঠাগুলো একটু উল্টে পাল্টে দেখা যাবে। অতীত জীবনের জমা ধুলির স্তর ঝেড়ে জীবনের শুরুর সময়ের আস্বাদ নিতে ভালো বৈ মন্দ লাগবে না আশা করি।

আসুন, আমরা একটু শৈশবের কথা ভেবে দেখি। ধরুন আপনি খুব জেদি আর একগুঁয়ে ছিলেন, প্রচুর বায়না করতেন। মধ্য রাতে জেগে পাশের বাড়ির বাচ্চার হাতে যেই মাটির ঘোড়াটা দেখেছিলেন, সেটি এখন আপনার লাগবে, মানে লাগবেই। ঘোড়া যখন নিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না, তখন আপনি জুড়ে দিলেন গড়াগড়ি দিয়ে কান্না। তখন আপনার কান্না থামানোর জন্য বাবা-মা, দাদা-দাদি,  নানা-নানি বা অন্যান্য আত্মীয় স্বজনরা যেসব ছড়া, গান, গল্প শুনিয়ে ঘোড়ার কথা ভুলিয়ে দিতো- তাকেই আমরা বলছি, ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’। আর এসব ছেলে ভুলানো ছড়া, গান, গল্পগুলো কালক্রমে আমাদের বাংলা লোকসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। চলুন, আমরা সেই ছেলে ভুলানো মজার মজার ছড়াগুলো এবং এগুলোর গতি-প্রকৃতি ও ধরন সম্পর্কে জেনে নেই।

ছেলে ভুলানো ছড়া

ছেলে ভুলানোর ছড়াগুলি বাংলা লোকসাহিত্যের (ফোকলোর) অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “ছেলে ভুলানো ছড়া” প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, 

আমি ছড়াকে মেঘের সাথে তুলনা করিয়াছি। উভয়ই পরিবর্তনশীল, বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত, বায়ু স্রোতে-যদৃচ্ছ ভাসমান। দেখিয়া মনে হয় নিরর্থক। ছড়াও কাল-বিচার শাস্ত্রের বাহির, মেঘ বিজ্ঞান শাস্ত্র নিয়মের মধ্যে ভালো করিয়া ধরা দেয় নাই, অথচ জড় জগতে এবং মানব জগতে এই দুই অদ্ভুত পদার্থ চিরকাল মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করিয়া আসিতেছে।


প্রাচীন লোকসাহিত্যের অন্তর্গত এইসব ছাড়ার রচয়িতা কে বা কারা তা নির্ণয় করা সহজ নয়। যুগ যুগান্তর ধরে মানুষের মুখে মুখে ধ্বনিত ও কর্ণে কর্ণে শ্রুত হয়ে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। এসব ছড়ার কাল নির্ণয় করাও কঠিন। যা কিংবদন্তি হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে, তা সব সময়ই পরিবর্তনশীল।

ছড়ার কাল নির্ণয়ে পণ্ডিতদের মতামত


লোকবিজ্ঞানী M. Bloomfield বলেন, 

ছড়া হচ্ছে মানুষের আদিমতম কাব্যচেতনার সর্বাধিক স্বাচ্ছন্দ্যময় রূপ, যার সূচনা সম্ভাব্য প্রাগৈতিহাসিককালে।

M. Bloomfield ছড়া ও লোককথার কাল নির্ণয়ে গবেষণা করেন।
চিত্র: M. Bloomfield; চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে,

বাংলা ছেলে ভুলানো ছড়া শিশুর মতো পুরাতন,  তাহারা মানব মনে আপনি জন্মিয়াছে। 

ড. সুকুমার সেনের মতে আনুমানিক খ্রিষ্টীয় ৯৫০ সালের দিকে; দীনেশচন্দ্র সেনের মতে ১০০০ বছরেরও অনেক আগে থেকে এবং সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে প্রায় ১০০০ বছর আগে বাংলা ভাষার উদ্ভব। আর ছড়া যে ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ; সে তো সহজেই অনুমেয়। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেন, 

৬ষ্ঠ শতকের মধ্যভাগ। কতগুলি ছড়া বাঙলার মুসলমানী আমলের পূর্বের।

অনেকের মতে, 

বর্তমানে লিপিবদ্ধ ছড়াগুলোর পাঠ বা ভাষা পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্ববর্তী নয়। তবে এটা তার লিপির বা সে পাঠ অনুসারে লিপিবদ্ধ করার কাল থেকে অনেক প্রাচীন।

ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষার মূল নিয়ে গবেষণা করেন।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় । চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

ছড়ার সংজ্ঞা

এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আদতে ছড়া কাকে বলে? এ বিষয়েও রয়েছে নানা মুনির নানান মত। ছড়ার সংজ্ঞা প্রদানে ড. ওয়াকিল আহমদ যে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, তা যথাযথ। তিনি বলেন,

সমাজের সাধারণ মানুষের আবেগ, কল্পনা, স্বপ্ন-স্মৃতি, অভিজ্ঞতার কথা পদ্যের ভাষায় ছন্দের বন্ধনে ক্ষুদ্র অবয়বে যে বাঙময় রূপ লাভ করে তাই ছড়া।

ছেলে ভুলানোর ছড়াগুলো মূলত রচনা করেছেন মায়েরা এবং ধাত্রীস্থানীয় মহিলারা। ছেলেকে ভুলাতে মাকে নানান কলাকৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। তাই শিশুকে ভুলাতে তাঁরা নানান উপকরণের উল্লেখ করেছেন। ছড়াগুলোতে যে সব উপকরণের উল্লেখ আমরা পাই তা হলো, লালজুতয়া, ঘুঙুর, বাঁশি, ভ্রমণ, দুধকলা ভাত, বিভিন্ন ফল, পাখি, বেড়াল এমনকি নতুন বউ এনে দেবার অঙ্গীকারও করতে দেখা যায়। 

ছড়াগুলো পড়া যাক:

 
খোকন খোকন ডাক পাড়ি
খোকন গেছে কাদের বাড়ি
আয় রে খোকন ঘরে আয়
দুধ মাখা ভাত কাকে খায়।

খোকা যাবে মাছ ধরতে ক্ষীর নদীর কুলে
ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে, মাছ নিয়ে গেল চিলে।।
খোকা বলে পাখিটি কোন বিলে চরে?
খোকা বলে ডাক দিলে উড়ে এসে পড়ে।

খোকা এলো বেড়িয়ে
দুধ দাও গো জুড়িয়ে।
দুধের বাটি তপ্ত,
খোকা হলেন খ্যাপ্ত।
খোকা যাবেন নায়ে
লাল জুতুয়া পায়ে।


আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা
চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।
মাছ কুটলে মুড়ো দেব
ধান ভানলে কুড়ো দেব
কালো গাইয়ের দুধ দেব
দুধ খাবার বাটি দেব
চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।

বাংলার ঘরের শিশু মানেই গোপাল, জননী যশোদার স্নেহের সুধারস মথিত গোপাল। আর বাংলার প্রত্যেক মা-ই যেন জননী যশোদা। ছড়াতেও রয়েছে তার প্রভাব।

অপত্যস্নেহ কেন্দ্রিক অধিকাংশ ছড়া শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর পালক মাতা যশোদাকে নিয়ে রচিত।
চিত্র: কৃষ্ণা এবং যশোদা; চিত্রসূত্র – Pinterest


শিব নাচে ব্রহ্মা নাচে আর নাচে ইন্দ্র
গোকুলে গোয়ালা নাচে পাইয়ে গোবিন্দ।
ক্ষীর খিরাস ক্ষীরের লাড়ু মর্তমানের কলা
নুটিয়ে নুটিয়ে খায় যত গোপের বালা,
নন্দের মন্দিরে গোয়ালা এলো ধেয়ে
তাদের হাতে নড়ি, কাঁধে ভাঁড়, নাচে থেয়ে থেয়ে।


কোনো কোনো ছড়ায় আমরা ইতিহাসের অংশবিশেষ দেখতে পাই, যা ছন্দের স্রোতে ভেসে মনের ঘাটে আসে। বাংলায় বর্গি আক্রমণের চিত্র ফুটে উঠেছে এই কবিতায় –

খোকা ঘুমুলো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে।
ধান খেয়েছে পান খেয়েছে খাজনার উপায় কী,
আর ক’টা দিন সবুর করো রসুন বুনেছি।

মারাঠা বর্গিদের নিয়ে লেখা ছড়া খুবই জনপ্রিয়।
চিত্র: বাংলায় মারাঠা বর্গির আক্রমণ, চিত্রসূত্র – Live History India

আবার শিশুর একটু বড় হয়ে নিজ মনে ছড়া রচনা করে। এমন ছড়ায় বিক্ষিপ্ততা, অসঙ্গতি থাকলেও শুনতে বেশ লাগে। ছোট বাচ্চার আধো-আধো বুলির কবিতাগুলো এমন হয় –


উলু কেতু দুলু কেতু নলের বাঁশি,
নল ভেঙেছে একাদশী।
একা নল পঙ্কদল,
কে যাবি রে কামার সাগর।
কামার মাগী কেরকেরানি
          যেন পাটরাণী।
আক বন ডাব বন,
কুড়ি কিষ্টি বেড়াবন।
কার পেটের দুয়ো,
কার পেটের সুয়ো।
বলে গেছে চড়ুই রাজা,
চোরের পেটে চালকড়াই ভাজা। ক
কাঠবিড়ালি মদ্দা মাগী কাপড় কেচে দে,
হারদোচ খেলাতে ডুলকি কিনে দে।
ডুলকির ভিতর পাকা পান,
ছি হিঁদুর সোয়ামি মোচরমান।
এক পাথর কলাপোড়া এক পাথর ঝোল,
নাচে আমার খুকুমণি বাজা তোরা ঢোল।

ছেলে ভুলানোর ছড়া এতেই শেষ নয়। এর ব্যাপ্তি আমাদের মর্মমূলের গহীনে। এর প্রভাব থাকে জীবন জুড়ে। ছড়ার এমন ছন্দময় দোলা জীবনের বাঁকে বাঁকে প্রকটিত হয়।

জননীর মুখ হতে যে ছড়া শিশু শৈশবে শুনতে পায় তার প্রভাব হতে শিশু কখনোই মুক্ত হতে পারে না। সেজন্য পরবর্তী জীবনে যখন তারা খেলার ছড়া নিজেরাই রচনা করে, তখনও তাদের মধ্যে তাদের শৈশব জীবনে শ্রুত ছড়াগুলোর বিচ্ছিন্ন অংশ এসে যুক্ত হয়ে যায়।

আরো পড়ুন: রাইডার্স ফ্রম দ্য নর্থ : অনুসন্ধিৎসুর চোখে বাবর

ঘুম বিষয়ক ছড়া


ছেলেকে ভুলাতে ছেলে ভুলানো ছড়া আবৃত্তি করেও যখন ছেলেকে ভুলানো যায় না, তখন প্রয়োজন হয় ঘুমের ছড়া, আমন্ত্রণ জানানো হয় ঘুম পাড়ানি মাসি পিসিকে। বাংলার চিরাচরিত এই মাসি আর পিসি মিলে ছড়া কেটে কেটে খোকা আর খুকুমণিদের ঘুম পাড়ায়।  রূপকথার এই মাসি পিসি এসে পিঁড়িতে বসে পান খায়, আর বায়না ধরা খোকা খুকুকে ঘুম দিয়ে খিড়কি দিয়ে পালায়। 


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’ প্রবন্ধে ঘুম পাড়ানি ছড়া নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেন,

ছেলে ভুলানো ছড়া কতকগুলো বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যাইতে পারে, তাহাদের মাঝে ঘুম পাড়ানি ছড়া একটি প্রধান ভাগ।

বাংলা ছড়া নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
চিত্র: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

দুরন্ত শিশুকে ঘুম পাড়ানো মায়ের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। প্রাচীন যুগ থেকেই এদেশীয় মায়েরা কাজে কর্মে দশভুজা। মা সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে নানা কাজে স্থানান্তর গমন করতে হয়। তাই সহজ উপায় হিসেবে সন্তানকে জানুর উপর শুইয়ে মৃদু মৃদু দোল দিয়ে ছড়ার সুরে যে মায়াজাল বুনন করেন, তার প্রভাবে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হাসতে হাসতে সন্তান সুখনিদ্রায় তলিয়ে যায়।

ঘুম বিষয়ক ছড়াগুলো মৌলিক দু’টি বিষয়কে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে।
১. ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি।
২. বর্গী এলো দেশে।

‘ঘুম পাড়ানি ছড়াটি ‘বর্গী এলো দেশে’ ছড়াটির মতোই সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী প্রচার লাভ করেছিলো এবং বাংলাদেশের অধিকাংশ ঘুম পাড়ানি ছড়া কেবলমাত্র এদেরকে অবলম্বন করেই রচিত হয়েছে বলে অনুমান করা যায়।’


এই দুটি বিষয়ের মধ্যে আরও কয়েকটি বিষয় যুক্ত করা যায়। যেমন –

আয় ঘুম ছড়া

ঘুমকে আমন্ত্রণ জানানোর মন্ত্রস্বরূপ এই ছড়াগুলো রচনা হয়েছে। যেমন

আয় ঘুম আয় ঘুম বাগদি পাড়া দিয়ে,
বাগদিদের ছেলে ঘুমায় জাল মুড়ি দিয়ে।

যায় ঘুম ছড়া

যায় ঘুম বিষয়ক ছড়াগুলোর মাঝে ঘুমন্ত খোকা-খুকুর শান্ত সুবোধ রূপের ছন্দময় বর্ণনা করা হয়। এতে শিশুর নিষ্পাপ মুখশ্রী এবং সৌন্দর্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন –


ঘুমতা ঘুমায় ঘুমতা ঘুমায় গাছের বাকলা,
ষষ্ঠী তলায় ঘুম যায় মস্ত হাতী ঘোড়া।
ছাই গাদায় ঘুম যায় খেঁকি কুকুর,
খাট পালঙ্কে ঘুম যায় ষষ্ঠী ঠাকুর।
আমার কোলে ঘুম যায় খোকনমনি।

ঘুমের ছড়া শুনিয়েই শিশুকে ঘুম পাড়ান মা।
চিত্র: ঘুমন্ত শিশু; চিত্রসূত্র: Baby Center


দোলনা বিষয়ক ছড়া

মানুষ দোল খেতে খুব ভালোবাসে। দোলনা দেখলে আমাদের মনের কোনে লুকিয়ে থাকা শৈশব উঁকি দিয়ে যায়। বাংলার ঘরে ঘরে আজও দোলনার প্রচলন আছে। দোলনায় শিশুদের শুইয়ে দিয়ে মা অথবা বড় বোনেরা যে ধরনের ছড়া কাটেন, সেগুলো “দোলনার ছড়া”। যেমন –


” দোল দোল দোলনি
কানে দেব চৌদানি।
কোমড়ে দেব ভেড়ার টোপ,
ফেটে মরবে পাড়ার লোক। “


এবার ঘুম বিষয়ক এবং “ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি” র ছড়াগুলো আমরা পড়ে নেই।


আয়রে পাখি লটকুনা
ভেজে দেব তোরে বর বটনা।
খাবি আর কলকলাবি
খোকাকে নিয়ে ঘুম পাড়াবি।

এবার চলুন, শিশুর ঘুম পাড়ানো নিয়ে সর্বাধিক জনপ্রিয় কবিতাটি শুনে আসি; যেই কবিতা শুনে আপনাকে পর্যন্ত ঘুম পাড়ানো হয়েছে।


ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি আমার বাড়ি এসো
শেজ নেই মাদুর নেই পুঁটুর চোখে বসো।
বাটা ভরা পান দেব গাল ভরে খেয়ো
খিড়কি দুয়ার খুলে দেব ফুড়ুৎ করে যেয়ো।

ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি আমাদের বাড়ি যেয়ো
খাট নেই পালঙ নেই খোকার চোখে বসো।
খোকার মা বাড়ি নেই শুয়ে ঘুম যেয়ো,
মাদার নিচে দুধ আছে টেনে টুনে খেয়ো।
নিশির কাপড় বসিয়ে দেব বাঘের নাচন চেয়ো
বাটা ভরা পান দেব দুয়োরে বসে খেয়ো,
খিড়কি দুয়োর কেটে দেব ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ যেয়ো।

ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি ঘুমের বাড়ি যেয়ো,
বাটা ভরা পান দেব গাল ভরে খেয়ো।
শান-বাঁধানো ঘাট দেব বেসম মেঘে নেয়ো,
শীতলপাটি বিছিয়ে দেব পড়ে ঘুম যেয়ো।
আর কাঁটালের বাগান দেবছায়ায় ছায়ায় যাবে,
চার চার বেয়াড়া দেব কাঁধে করে নেবে
দুই দুই বাঁদি দেব পায়ে তেল দেবে।
উলকি ধানের মুড়কি দেব নারেঙ্গা ধানের খই, গাছপাকা রম্ভা দেব হাঁড়িভরা দই।

এই ছড়াগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করেছেন। মাসি পিসির ছড়াগুলো বাংলার কয়েকটি অঞ্চলে প্রচলিত ছিলো। কোনটি কোন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা উল্লেখ করেননি। এ প্রসঙ্গে কে এম বদিয়ার রহমান বলেন,

এই অঞ্চলের মধ্যে দূরত্বের ব্যবধান খুব বেশি নেই; কারণ, এগুলোর মধ্যে প্রায় বিশেষ অনৈক্য নেই। আরও মনে হতে পারে যে, ছড়াগুলো ভাগীরথী তীরবর্তী অঞ্চলের কথ্য ভাষায় রচিত।

সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের সংস্কৃতি ও রুচিবোধ। যান্ত্রিক জীবনের বেড়াজালে আমাদের বর্তমান কালের শিশু কিশোরদের স্বতঃস্ফূর্ত মানসিক বিকাশ সম্ভব হচ্ছে না।। একটা সময় ছিলো, যখন মায়ের মুখে গল্প না শুনলে ঘুম আসতো না, দাদি নানির মুখের কেচ্ছা ছাড়া আসর জমতো না…সেই সুবর্ণ সময়গুলো আজ আমাদের অতীত জীবনের ধূসর পাণ্ডুলিপিতে আবদ্ধ। 

এখন আমরা ইন্টারনেটের কল্যাণে বিশ্বগ্রামে (Global Village) প্রবেশ করেছি বটে, কিন্তু শিশু-কিশোরদের করেছি খাঁচা বন্দী। শিশু-কিশোরদের স্বতঃস্ফূর্ত মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন আমাদের মৌলিকত্বের দিকে ধাপিত হওয়া। যে শিশুরা ছোট থেকেই ছড়া, কবিতা, আবৃত্তি তথা সৃষ্টিশীল চিন্তা লালনের চেষ্টা করবে, তাদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, ডাহুকের কবি ফররুখেরা।


তথ্যসূত্র:

গ্রন্থসূত্র:

১/ রবীন্দ্র রচনাবলী: ষষ্ঠ খণ্ড,  কলকাতা ১৩৬৫, পৃ. ৬০৮।
২/ সৈয়দ মুহাম্মদ সাহেদ, “ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি”, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃক প্রকাশিত,  ঢাকা, প্রথম প্রকাশ-১৯৮৮, পৃ. ২৫।
৩/ ওয়াকিল আহমদ,  “বাংলা লোকসাহিত্য: ছড়া”, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ-১৯৯৮, পূনর্মুদ্রণ-২০০৪, পৃ. ২ (ভূমিকা)।
৪/ আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা লোকসাহিত্য প্রথম খণ্ড,  ক্যালকাটা বুক হাউস, কলকাতা,  তৃতীয় সংস্করণঃ ২০০৩, পৃ. ২২৩।
৫/ আশুতোষ ভট্টাচার্য, প্রাগুক্ত, পৃ.৭৪।
৬/ কে এম বদিয়ার রহমান, “ফোকলোর তত্ত্ব ও বাংলা লোকসাহিত্য”, এস.আর. প্রকাশন, প্রথম প্রকাশ-২০১৬, পৃ. ৪৪৬।
৭/ কে এম বদিয়ার রহমান,  প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫১।

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on বাংলা লোকছড়ায় ছেলে ভুলানো ও ঘুম বিষয়ক যত ছড়া

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!