বখতিয়ার ঘিলজি

বখতিয়ার খলজির বাংলা জয়: ইতিহাসের এক‌ নতুন অধ্যায়

4.4
(18)
Bookmark

No account yet? Register

যাঁর মাধ্যমে বাংলায় সর্বপ্রথম মুসলিম শাসনের সূচনা হয়, তিনি হলেন বখতিয়ার খলজি। পুরো নাম ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি। তিনি গরমসির অধিবাসী এবং তুর্কি খলজি গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসে বখতিয়ার খলজি ব্যাপকভাবে জায়গা করে নিতে না পারলেও মধ্যযুগে বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরাতে তাঁর অবদান কম নয়। অনেকের কাছে তিনি বীর যোদ্ধা, আবার অনেকের কাছে খলনায়ক—অবশ্যই তা একেক ঐতিহাসিকের ইস্তফসারের ওপর নির্ভর করে।

অসামান্যতে লিখুন
ইখতিয়ারউদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি প্রচ্ছদ
সম্প্রতি দিব্যপ্রকাশ হতে প্রকাশিত খলজির জীবনীগ্রন্থ। সূত্র: প্রকাশনালয়ের ফেসবুক পৃষ্ঠা

বখতিয়ার খলজি ছিলেন একজন ভাগ্যন্বেষী। ভাগ্য বদলের আশায় মুহাম্মদ ঘোরির সেনাদলে চাকরির চেষ্টা করেন। তাঁর দেহকাঠামো ছিল খাটো আকৃতির এবং হাত দুটি ছিল অস্বাভাবিক দীর্ঘ। যার কারণে গজনীতে সেনাদলে চাকরি লাভে ব্যর্থ হন তিনি। গজনী ছেড়ে দিল্লিতে যান কুতুব উদ-দীন আইবেকের দরবারে। কুতুব উদ-দীন আইবেক ছিলেন মুহাম্মদ ঘোরির নিযুক্ত করা দিল্লির প্রশাসক সেখানেও সেনাদলে চাকরিপ্রত্যাশী হয়ে চাকরি পান না।

হাল ছাড়ার মতো লোক ছিলেন না তিনি। এভাবে একের পর এক চেষ্টা চালাতে চালাতে একসময় অযোধ্যায় গিয়ে পৌঁছান। অযোধ্যার শাসক মালিক হুসাম উদ-দীন বখতিয়ার খলজির প্রতিভা অনুধাবন করতে পারেন। ভাগ্য খুলে গেল, অযোধ্যার শাসক তাঁকে বিউলি এবং ভগত নামক দুইটি পরগনার জায়গীর প্রদান করেন। পরগনা দুটি ছিল তৎকালীন মুসলিম রাজ্যের শেষ পূর্ব সীমানা।

পরগনা দুটির পাশে ছিল হিন্দুশাসিত ছোট ছোট অনেকগুলো রাজ্য। তাদের মধ্যে ছিল অনৈক্য, তাছাড়া তৎকালে তুর্কি সেনাদের নিয়ে আতঙ্ক বিরাজমান ছিল প্রায় সবার মাঝে। সে সুযোগকে কাজে লাগান‌ বখতিয়ার খলজি। কিছু সৈন্য জোগাড় করে একেরপর এক পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট রাজ্যগুলো জয় করতে থাকেন এবং পরাজিতদের সম্পদ হস্তগত করতে থাকেন। পরাজিতদের থেকে হস্তগত সম্পদ সেনা উন্নয়নের কাজে লাগান। তাঁর বীরত্বের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তাঁর স্বগোত্রীয় খলজিরা তাঁর সেনাদলে যোগ দিতে থাকে। ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী তৈরি করেন তিনি।

ওদন্তপুরী বিহার, দুর্গ ভেবে ভুলবশত আক্রমণ করেছিলেন বখতিয়ার খলজি
ওদন্তপুরী বিহার, দুর্গ ভেবে ভুলবশত আক্রমণ করেছিলেন বখতিয়ার খলজি; সূত্র: ইন্ডিকটেলস

এভাবে জয়ের নেশায় একদিন তাঁর সৈন্যদলসহ প্রাচীরবেষ্টিত একটি জায়গায় এসে পড়েন। প্রতিপক্ষের দুর্গ ভেবে আক্রমণ চালান কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করে দেখতে পান আসলে এটি দুর্গ নয়। অনেক গ্রন্থের সন্নিবেশ, এবং মুণ্ডিত মাথার কিছু মানুষ জ্ঞান সাধনায় ব্যস্ত। পরে জানতে পারেন এটি একটি বৌদ্ধ বিহার, যেটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দুর্গ ভেবে ভুল করে আসলে তাঁরা ওদন্তপুরী বিহারে আক্রমণ চালায়। এরপর থেকে এ এলাকাটির নাম দেয়া হয় বিহার বা বিহার শরীফ। ক্রমান্বয়ে তিনি গোটা এলাকাটি নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসেন।

বখতিয়ারপুর জংশন, বিহার; যার নামকরণ করা হয়েছে বখতিয়ার খলজি এর নামে
বখতিয়ার খলজির নামে বখতিয়ারপুর জংশন, বিহার; সূত্র: উইকিপিডিয়া কমন্স 

বখতিয়ার খলজি যখন বিহার এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা অধিকারে নেন, তখন বাংলার সিংহাসনে ছিল সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেন। সেনরা মূলত কর্ণাটক থেকে বাংলায় আসেন, এবং বাংলার চারশো বছরের পাল সম্রাজ্যের সোনালি শাসনের ইতি ঘটান।

বখতিয়ার খলজি যখন বিহারে, সেই খবর লক্ষ্মণ সেন অব্দি পৌঁছে গিয়েছিল। লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী ছিল বিক্রমপুরে। কিন্তু তখন তিনি নদীয়াতে অবস্থান করছিলেন। লক্ষ্মণ সেন যে ভয় পেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন এমনটাও নয়‌। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি হয়তো তাঁর সেনাদলকে বাংলায় প্রবেশের সব পথগুলোতে মোতায়েন করেছিলেন যাতে তুর্কিরা রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত না পৌঁছাতে পারে।

বাংলায় প্রবেশের যে কয়েকটি পথ ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল তেলিয়াগড় দুর্গ, তুর্কিদের আক্রমণের আশঙ্কা করে দুর্গটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা অভিজ্ঞ রাজা লক্ষ্মণ সেনের জন্য কৌশলী এবং স্বাভাবিক বিষয় ছিল। শত্রু মোকাবেলার জন্য লক্ষ্মণ সেন তাঁর সেনাদল দ্বারা শত্রু প্রবেশের সম্ভাব্য জায়গাগুলো ঘেরাও করে ফেলেছেন, তাই হয়তো প্রাসাদে কোনো সেনা ছিল না। নয়তো হাতে গোনা কিছু সৈন্য নিয়ে নদীয়ার দখল সুদক্ষ যোদ্ধা রাজা লক্ষ্মণ সেন থেকে নিতে পারতো না খলজিরা। 

বাংলায় প্রবেশের অন্যতম পথ, তেলিয়াগড় দুর্গ
বাংলায় প্রবেশের অন্যতম পথ, তেলিয়াগড় দুর্গ; সূত্র: ব্রিটিশ লাইব্রেরি

বখতিয়ার খলজি কেবল একজন সুদক্ষ বীর যোদ্ধাই ছিলেন না, তীক্ষ্ণ রণকৌশলও আয়ত্তাধীন ছিল তাঁর। তিনি নদীপথ এবং বাংলায় প্রবেশের সম্ভাব্য পথগুলো না ব্যবহার করে ঝাড়খণ্ডের বিস্তৃর্ণ, দুর্ভেদ্য জঙ্গলাবৃত এলাকা দিয়ে নদীয়ায়  প্রবেশ করেন, যেটা লক্ষ্মণ সেনের প্রস্তুতির জন্য ছিল অচিন্ত্য। দুর্ভেদ্য জঙ্গল দিয়ে বিশাল সেনাবাহিনীর সামনে অগ্রসর হওয়া মোটেও সহজ ছিল না, তাই তিনি তাঁর সেনাদলকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নেন।

তিনি ঘোড়া নিয়ে ঝাড় জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এতোটাই ক্ষিপ্র গতিতে এগোলেন যে, তাঁর সাথে মাত্র ১৮জন অশ্বারোহী সৈন্য আসতে পেরেছিল, বাকি সেনারা পিছনে পড়ে গিয়েছিল। তিনি যখন প্রাসাদদ্বারে পৌঁছান তখন অন্য দু’একটি দল তখন মাত্র শহরে প্রবেশ করে। তখন কেউ বুঝতেই পারেনি যে বখতিয়ার খলজি ও তাঁর সেনারা নদীয়ায় প্রবেশ করলো। সকলে ভেবেছিলো ঘোড়া ব্যবসায়ীরা এসেছে রাজা লক্ষ্মণ সেনের কাছে ঘোড়া বিক্রি করতে।

প্রাসাদে ঢুকতে কোনো প্রকার বাধার সম্মুখীন হননি তিনি। রাজা লক্ষ্মণ সেন তখন মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত ছিলেন, খলজি বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে, উপায় না দেখে প্রাসাদের পশ্চাদ্দ্বার দিয়ে পলায়ন করেন রাজা লক্ষ্মণ সেন। উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও রাজ সভাসদরা তুর্কিদের আক্রমণে বিপদ আঁচ করতে পেরে আগেই রাজাকে স্ব-দলবলে নদীয়া ত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করেন। রাজা তাঁদের কথায় কর্ণপাত করেননি। তাই তাঁরা রাজার অনুমতি না নিয়েই রাজাকে রেখে খলজির আক্রমণের আগেই নাগালের বাইরে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

এক প্রকার কোনো যুদ্ধ ছাড়াই বখতিয়ার খলজি নদীয়া জয় করে নেন। তিনি যখন নদীয়া বা নবদ্বীপ জয় করেন, তখন সময়টা ছিল ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ। তাঁর জয় করা নদীয়ার অবস্থান ছিল ভাগীরথী নদীর তীরে, বর্তমানে যার অস্তিত্ব নদীগর্ভে বিলীন। 

লক্ষ্মণ সেন পালিয়ে গেলে, নদীয়ায় তাঁর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। বখতিয়ার খলজি সেখানকার ধন সম্পদ নিজের হস্তগত করে নিয়েছিলেন। নদীয়াতে তিনি মাত্র তিনদিন অবস্থান করেছিলেন এবং সেখান থেকে উত্তরবঙ্গে এসে গৌড় দখল করেন এবং সেখানে স্বীয় রাজধানী স্থাপন করেন। তখন এলাকাটি নাম ছিল ‘লক্ষ্মণাবতী’ (লক্ষ্মণ সেনের নাম অনুসারে), যেটা পরবর্তীতে উচ্চারণের বিবর্তনে লখনৌতি নামে পরিচিতি পায়। 

উল্লেখ্য, বখতিয়ার খলজি গোটা বাংলাকে জয় করেননি, যে প্রমাদটা অনেক আধা বা উপক্ষীণ-ইতিহাস-পাঠ-করা মানুষ করে থাকে। নদীয়া বা নবদ্বীপ এবং লখনৌতি জয় করলেও পূর্ববঙ্গে আরো কিছুকাল সেন বংশেরই শাসন চলে। ১২০৬ সালেও পূর্ববঙ্গে লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বের প্রমাণ মেলে। এরপর দেববংশও কিছুকাল শাসন করেছিল পূর্ববঙ্গকে। ১২৬০ সালে মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর তবকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থটি সম্পন্ন করেছিলেন। গ্রন্থটিতে তিনি লিখেছেন, তখনও পর্যন্ত পূর্ববঙ্গে লক্ষ্মণ সেনের বংশধররা শাসন করছে।

তবকাত ই নাসিরী প্রচ্ছদ
তবকাত-ই-নাসিরীর বঙ্গানুবাদ এক বাংলাদেশি ফারসি পণ্ডিতের হাতে। ছবি: দিব্য প্রকাশের ফেসবুক পৃষ্ঠা থেকে

নদীয়া ও লখনৌতি জয়ের পর প্রায় দুই বছর বখতিয়ার আর কোনো অভিযানে বের হননি। অধিকৃত অঞ্চলকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে তাঁর সেনানায়কদের বিভিন্ন এলাকার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। রাজ্যের ভিত্তি গড়ার জন্য তিনি বেশকিছু মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা নির্মাণ করেন।

আরও পড়ুন: বদর যুদ্ধ: ইসলামের ইতিহাসে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিজয়

বাংলার কিয়দংশ জয় করার প্রায় দুই বছর পর তিনি তিব্বত জয়ের জন্য অভিযান চালান। দশ হাজার সৈন্য নিয়ে তিব্বত অভিমুখে যাত্রা করেন। লখনৌতি ও হিমালয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বাস করা একটি জাতি ছিল মেচ। মেচ জাতিরই এক সর্দার পথ দেখিয়ে নিয়ে যান তাদেরকে। কামরূপ রাজ্যের অভ্যন্তর দিয়ে বেগমতী নদীর তীরে বর্ধন নামক নগরী হয়ে তিব্বতের পথ দেখান ঐ মেচ। বেগমতি নদীর তীর ঘেঁষে দশ দিনের পথ অতিক্রম করে ১২টি খিলানযুক্ত একটি পাথরের সেতু দেখতে পান তাঁরা। দুইজনকে সেতুটির পাহারায় রেখে বখতিয়ার বাকি সৈন্যদের নিয়ে সেতু পার হয়ে সামনে অগ্রসর হয়েছিলেন।

তাঁর তিব্বত অভিযানের কথা গোপন থাকলো না, পৌঁছে গেল কামরূপের রাজার কাছেও। কামরূপের রাজা দূত মাধ্যম বখতিয়ার খলজিকে জানালো যে, এসময়ে তিব্বত আক্রমণ করা ঠিক হবে না; পরের বছর তিব্বত অভিযান করতে, তাহলে কামরূপের রাজাও নিজ সৈন্যদল নিয়ে তিব্বত জয়ে খলজির সেনাদলের সাথে যোগ দিবে। কিন্তু তিনি কামরূপ-রাজের কথায় কর্ণপাত না করে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন।

পার্বত্য পথ দিয়ে ১৫ দিন এগোলেন। ষোলতম দিনে একটি উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছান তাঁরা, সেখানে একটি দুর্গ ছিল; দুর্গের সৈন্যদের আক্রমণে যুদ্ধ বেঁধে যায় দু’পক্ষের মধ্যে। যুদ্ধের পরিণতিতে দুর্গের বেশকিছু সৈন্যকে বন্দী করে বখতিয়ার খলজি।

বন্দি সৈন্যদের থেকে জানা যায় ৫০ মাইল দূরে করমপত্তন/করমবাত্তন নামক জায়গায় ৫০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য রয়েছে। এমতাবস্থায় যুদ্ধ ক্লান্ত, আহত সৈন্যদের নিয়ে সামনে এগোনোর সাহস করলেন না বখতিয়ার।

গোত্র প্রধান
১৮৭৯ সালে রবার্ট বার্কের ক্যামেরায় খলজি বা ঘিলজি গোত্র প্রধানেরা। সূত্র: ব্রিটিশ লাইব্রেরি

তাদের পক্ষে ফিরে যাওয়াটাও মোটেও সহজ ছিল না। শত্রুপক্ষ ওই এলাকার সমস্ত খাদ্যশস্য নষ্ট করে দিয়েছিল, খলজি বাহিনীকে বিপদে ফেলার লক্ষ্যে। ফলে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। অনেক কষ্টে তাঁরা বেগমতী নদীর তীরে সেতুর কাছে এসে পৌঁছায়। এসে দেখতে পায়, পাহারায় রেখে যাওয়া দুইজন লোক উধাও এবং সেতুটিও ভেঙে ফেলে দিয়েছে কামরূপের লোকেরা।

কামরূপের সেনারা মিত্রতা ভুলে তাদের ওপর চড়াও হয়ে ওঠে। উপায়ন্তর না দেখে, নদীটি পার হতে গিয়ে নদীর গভীর জায়গায় পানিতে ডুবে অনেক সৈন্য মারা যায়। তিব্বত অভিযানে গিয়ে বখতিয়ার এবং তার অল্প কিছু সৈন্য বাদে বিশাল সেনাবাহিনীর সিংহভাগ সৈন্যই ফিরে আসতে পারেনি যুদ্ধে, খাদ্য কষ্টে এবং নদীতে ডুবে নিহত হয়ে।

অতি কষ্টে নিজ রাজধানী লখনৌতে ফিরে আসেন বখতিয়ার খলজি। ব্যর্থ অভিযানে সৈন্য হারানোর শোক যন্ত্রণায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ইহ জগতের প্রাচুর্যের মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন এই ভাগ্যান্বেষী খলজি গোত্রভুক্ত তুর্কি যোদ্ধা।

বখতিয়ার খলজি বাংলায় প্রথম মুসলিম শাসনের সূচনা করলেও অনেক ইতিহাসবশারদ তাঁকে বঙ্গবিজেতা বলতে গররাজি। কারণ তিনি সমুদয় বাংলা জয় করতে পারেননি। ইতিহাসবিদ ড. রমেশ চন্দ্র  মজুমদার তাঁর বাংলাদেশের ইতিহাস (২য় খণ্ড) বইতে উল্লেখ করেন:

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দশকের আগে মুসলমানরা পূর্ববঙ্গের কোন অঞ্চল জয় করিতে পারেন নাই। দক্ষিণবঙ্গের কোন অঞ্চলও মুসলমানদের দ্বারা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিজিত হয় নাই। সুতরাং বখতিয়ারকে “বঙ্গবিজেতা” বলা সঙ্গত হয়না। তিনি পশ্চিমবঙ্গে ও উত্তরবঙ্গের কতকাংশ জয় করিয়া বাংলাদেশ প্রথম মুসলিম শাসনের সূচনা করেছিলেন, ইহাই তাঁহার কীর্তি। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুসলিম ঐতিহাসিকরাও বখতিয়ারকে “বঙ্গবিজেতা” বলেন নাই; তাঁহারা বখতিয়ার ও তাঁহার উত্তরাধিকারীদের অধিকৃত অঞ্চলকে “লখনৌতি রাজ্য” বলিয়াছেন, “বাংলা রাজ্য” বলেন নাই।

বাংলাদেশের ইতিহাস দ্বিতীয় খণ্ড প্রচ্ছদ
দিব্যপ্রকাশেরই আরেকটি পুনঃপ্রকাশ। সূত্র: প্রকাশনালয়টির ফেসবুক পৃষ্ঠা

ইতিহাসের এক এক শাসকের হাতে এক এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিলো। পাল বংশের সুদীর্ঘ চারশত বছর রাজত্বের পর বাংলার শাসনভার চলে যায় কর্ণাটক থেকে আসা সেন বংশের রাজাদের হাতে।‌ সেনদের হটিয়ে প্রথম বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন বখতিয়ার খলজি। এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে গোটা বাংলা মুসলিম শাসনের আওতায় চলে আসে, যেটা অক্ষুণ্ণ ছিল পলাশীর প্রান্তরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাতানো ম্যাচ পর্যন্ত।

পাল বংশের শাসন আমলে বাংলায় সোনালি দিন ছিল। এরপর মধ্যযুগ হয় বাংলা সোনালি অতীত। সোনালি অতীতের সোনালি অধ্যায়টি সূচিত হয়েছে বখতিয়ার খলজির বাংলার একটি অংশের জয়ের মাধ্যমেই! যদিও কিছু ইতিহাসবিদের দাবি ইতিহাসের আরেকটি অংশের ধ্বংস হয়েছিলো তাঁরই হাতে।

প্রচ্ছদ অলঙ্করণ: আহমেদ আতিফ আবরার

গ্রন্থসূত্র:

  1. করিম, আ. ১৯৯৯, আগস্ট. বাংলার ইতিহাস- মুসলিম বিজয় থেকে সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত. বড়াল প্রকাশনী. পৃষ্ঠা ১৭-২১.
  2. মজুমদার, র. ২০১৭, সেপ্টেম্বর. বাংলাদেশের ইতিহাস: ২য় খণ্ড (মধ্যযুগ). ISBN: 978 984 8830 68 0‌. দিব্যপ্রকাশ প্রথম সংস্করণ. পৃ. ১-৪
  3. রায়, নী. অষ্টম সংস্করণ বৈশাখ ১৪২০. বাঙালির ইতিহাস- আদি পর্ব. ISBN-81-7079-270-3. দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা. পৃষ্ঠা ৪১০-৪১৬.

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
2 Thoughts on বখতিয়ার খলজির বাংলা জয়: ইতিহাসের এক‌ নতুন অধ্যায়
    Forhad Uddin
    21 Oct 2020
    8:33pm

    লেখাটি খুব সুন্দর ছিল।

    4
    0
    সাকিব রায়হান
    21 Oct 2020
    9:16pm

    ধন্যবাদ 😍

    0
    0

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!