ভালোবাসার এই নদী কিন্তু নিঃশব্দে বয়ে চলছে: প্রাঞ্জল

4
(5)
Bookmark

No account yet? Register

[আন্তর্জালেই পরিচয় ভারতের আসামের আলিবাট প্রকাশনের কর্ণধার প্রাঞ্জল কুমার মহন্তর সঙ্গে। অসমীয়া লেখিকা শর্মিষ্ঠা প্রীতমের বই বাংলায় অনুবাদ করার সূত্রে তার সাথে আন্তর্জালে পরিচয় হয়। রকমারিতে কিছুকাল আগেই খোঁজাখুঁজি করেছি মানসম্পন্ন কী‌ কী‌ বঙ্গানুবাদ রয়েছে; আমি সম্প্রতি এই ভাষিক আদানপ্রদানকে গুরুত্ব দিচ্ছি কী না! তাই প্রাঞ্জলের নিকট প্রস্তাব পেশ করেই ফেললাম একটা সাক্ষাৎকার দিতে হবে অসামান্যের জন্য।—আহমেদ আতিফ আবরার।]

আতিফ: প্রথমে আপনার প্রকাশনা সংস্থা সম্পর্কে জানা যাক—আলিবাট প্রকাশন।

প্রাঞ্জল: আমার প্রকাশনা সংস্থা ২০০৭ সালে যাত্রা শুরু করে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০টি বই আমাদের এই প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের প্রকাশনা সংস্থা এখন পর্যন্ত নানান পুরস্কার অর্জন করেছে। বিশেষ করে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার এবং বেশ কিছু রাজ্য পর্যায়ের পুরস্কার। আমরা মূলত সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশ করলেও আমাদের বেশ কিছু বিদ্যায়তনিক এবং অনুবাদ গ্রন্থও আছে।

আলিবাট প্রকাশনীর লোগো; চিত্রসূত্র: Scientia Books

আ: অসমীয়াতে ‘আলিবাট’ শব্দের অর্থ কী?

প্রাঞ্জল: সাধারণত রাস্তা বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমি বুঝিয়েছি ধানখেতের মধ্যকার পথটুকুকে। যখন ধানখেতের মাঝে দিয়ে হাঁটি, আমার মাথায় নানান কিসিমের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এসে জড়ো হয়, মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে—এটি আসলেই অন্য রকম অনুভূতি! এই অনুভূতি আসলে শব্দে অবধারণযোগ্য নয়। শস্য বড় হয়…তখন এই রাস্তা ছাড়া হাঁটার আর কোনো পথ থাকে না! তাই আমি আমার প্রকাশনা সংস্থার জন্য এই নাম বাছাই করেছি। 

ধানখেতের আলপথ ও পানির নালা; চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

আ: বাংলা ভাষায় একে আলপথ বলা হয়। কত মিল!  যাই হোক, আপনি বলছিলেন যে, আপনাদের প্রকাশনা সংস্থা সৃজনশীল এবং বিদ্যায়তনিক উভয় ধরনের গ্রন্থ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশকদের সম্পর্কে আমি যতদূর জানি—প্রকাশনার কথা বলতে তারা মূলত সৃজনশীল গ্রন্থকে নির্দেশ করে। যদিও শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয়ে সুদক্ষতার জন্য সেই বিষয়ে মাতৃভাষায় অনূদিত বইয়ের প্রয়োজন পড়ে। আপনার প্রকাশনালয়ের ক্ষেত্রে আপনি ঠিক কতটুকু সৃজনশীল গ্রন্থের জন্য বরাদ্দ রাখেন আর কতটুকু বিদ্যায়তনিক গ্রন্থের জন্য? 

প্রাঞ্জল: আমি আমার ৭০ শতাংশ বরাদ্দ রাখি সৃজনশীল গ্রন্থের জন্য। আর ৩০ শতাংশ থাকে বিদ্যায়তনিক বইয়ের জন্য। 

আ: কেন ৫০-৫০ নয়?

প্রাঞ্জল: আসলে আমি অসমীয়া পাঠকদের দৃষ্টিকোণ থেকে বললাম। তাদের অধিকাংশ মৃন্ময় রচনা পড়তে পছন্দ করে। আপনি একে তাদের বই সম্পর্কে রুচির সংকট হিসাবে চিহ্নিত করতে পারেন। 

আ: তবে প্রকাশকেরা চাইলে পাঠকদের কান্তিবোধ ও চিত্তবৃত্তি সমৃদ্ধ করতে পারেন। 

আ: আমরা বাংলাদেশিরা যখনই ভারতীয় বইয়ের কথা আলোচনা করি, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং ভাষাগত কারণে আমরা সবসময় পশ্চিমবঙ্গ নিয়েই আলোচনা করি। কিন্তু, ঐতিহাসিকভাবে আসামও বাংলাদেশের সাথে নিকট সম্পর্কীয়। এমনকি, একসময় সিলেট আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং সিলেটের শিক্ষার্থীরা বাংলার পরিবর্তে আসামের ভূগোল সম্পর্কে পড়তো। এই সম্পর্ক ফের তৈয়ার করতে আপনি কী কী পদক্ষেপ নিবেন?

আলিবাট প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশিত বই
চিত্র: আলিবাট প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশিত বই; চিত্রসূত্র – পিন্টারেস্ট

প্রাঞ্জল: আমি মনে করি, দুইটি দেশের মধ্যে বিদ্যমান সাবলীল সম্পর্ক জোরদার করতে সাহিত্য এবং সংস্কৃতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আপনি ঠিকই বলেছেন যে, এককালে আসাম সিলেটের অংশ ছিল এবং এখন পর্যন্ত অসমীয়া জনগণ সিলেটের মানুষদের ‘সিলেটীয়া’ বলে অভিহিত করে থাকে। সংস্কৃতির দিক দিয়ে যেমন আমরা একে অপরের সমীপবর্তী, তেমনই হৃদয়ের দিক দিয়েও। আসামের প্রায় সকল ধরনের উৎসবই তাদের মাঝে জনপ্রিয় এবং সাড়ম্বরে পালিত হয়।

আলিবাট প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশিত বই
চিত্র: আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গ্রন্থটি রচিত; চিত্রসূত্র – গুডরিডস

পাকিস্তানের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য পরিস্থিতি তিক্ত হয়ে উঠলেও সকল দিক দিয়েই বাংলাদেশ ও আসাম পরস্পরের নিকটবর্তী। বাংলাদেশ সরকার ড. ভূপেন হাজারিকাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করে। কিছুদিন আগেই এক লোকোৎসবে যোগ দিতে পাপন সিলেটে গিয়েছিলেন। এটি প্রমাণিত করে যে, ইতোমধ্যেই আমাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। আর আসামের পাঠকেরা পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বাংলাদেশি লেখকদের বেশি পছন্দ করে। হুমায়ূন আহমেদ শর্মিষ্ঠার প্রিয় লেখক, যাকে বলে সে একেবারে হুমায়ূন আহমেদের অন্ধভক্ত। তাই, বলা যায়, ভালোবাসার এই নদী কিন্তু নিঃশব্দে বয়ে চলছে।

আলিবাটের একটি বই
চিত্র: আলিবাট প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশিত বই; চিত্রসূত্র – অ্যামাজন

তবে আপনি এই কথাটি ঠিক বলেছেন যে, অসমীয়া অনুবাদ গ্রন্থের সংখ্যামান খুবই কম বিশেষ করে বাংলা ভাষা থেকে। সামগ্রিকভাবে, আসামে অনুবাদ সাহিত্য চরমভাবে উপেক্ষিত। চন্দ্রপ্রসাদ শইকীয়া সভাপতিত্বকালীন আসাম প্রকাশনা পরিষৎ (বইয়ের প্রকাশনা কাজে নিয়োজিত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা) নিয়মিতভাবে ইংরেজি ভাষা থেকে বিশ্বের বিভিন্ন কালজয়ী গ্রন্থাদি অসমীয়াতে ভাষান্তর করতো। তিনি এরূপ আরো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এ সবই ছিল অসমীয়া সাহিত্যলোককে সমৃদ্ধ করার জন্য। কিন্তু কেউই এই কথা ভাবেননি যে, ভাষাগত মেলবন্ধন গড়ে তোলার জন্য আমাদেরও নিজ ভাষার গ্রন্থ বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনুবাদ করা প্রয়োজন। কেউ কেউ হয়তো ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের ব্যাপারে আগ্রহী। কিন্তু বাংলা বা অন্যান্য প্রতিবেশী ভাষার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ কেউ দেখায় না।

আলিবাটের একটি বই
চিত্র: আলিবাট প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশিত বই; চিত্রসূত্র – Scientia Books

আপনি হয়তো সাহিত্য আকাদেমিতে অল্প কিছু অসমীয়া সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ খুঁজে পাবেন। কিন্ত জনপ্রিয় প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অনুবাদ সাহিত্যের পরিস্থিতি খুবই আক্ষেপকর। বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম নানাবিধ অনুবাদ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করছে। তারা নিজেদের মধ্যে এমন ধরনের কাজের একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। আমাদের প্রকাশনা সংস্থাও লেখক-অনুবাদকদের আঞ্জাম দিচ্ছে। অনুবাদ কী করে কোনো ভাষার সাহিত্যের মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই বিষয়েও আমরা তাদেরকে প্রচোদিত করছি। ইতোমধ্যেই আমরা এই পথে বেশ কিছুদূর এগিয়েছি। 

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: প্রকাশক স্বয়ং

সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন মো. রেদোয়ান হোসেন

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ভালোবাসার এই নদী কিন্তু নিঃশব্দে বয়ে চলছে: প্রাঞ্জল

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!