প্রজেক্ট ম্যানহাটন: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শক্তির বিধ্বংসী ব্যবহার (পর্ব ১)

4
(3)
Bookmark

No account yet? Register

প্রজেক্ট ম্যানহাটন: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শক্তির বিধ্বংসী ব্যবহার” ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে আজ প্রজেক্ট ম্যানহাটন তৈরির পিছনে বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক কৌশল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পরবর্তী পর্বসমূহে এই প্রজেক্টের কলাকৌশল, সামরিক নীতি, হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে বোমা নিক্ষেপ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে এই প্রজেক্টের সমাপ্তিসহ আরো নানাদিক উপস্থাপন করা হবে।

মানুষ যেদিন তাঁর গুহাবাসী জীবনে প্রথম আগুনের খোঁজ পেয়েছিল, মানুষের সামনের প্রায় হাজার বছরের গতিপথ বদলে গিয়েছিল। এই আগুনই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে খাদ্য সংরক্ষণ করতে, মানুষ পত্তন করেছে পরিবার। যাযাবর জীবন ত্যাগ করে থিতু হয়েছে কোনো এক নির্দিষ্ট জায়গায়। চাষবাস করে গড়ে তুলেছে সভ্যতা।

আগুনের আবিষ্কার প্রাচীন মানুষের জীবন বদলে দিয়েছিল
চিত্র: আগুনের আবিষ্কার প্রাচীন মানুষের জীবন বদলে দিয়েছিল; চিত্রসূত্র – ThoughtCo

ঠিক তেমনই করে, বিদ্যুতের আবিষ্কার বদলে দিয়েছিল আধুনিক সভ্যতার পটভূমি। নিয়ে এসেছিল শিল্প বিপ্লব। সঠিক হাতে বিপুল শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার সাধন করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বিপরীত ঘটনাও যে ঘটতে পারে, সেটিই বা কে জানতো! তাও আবার এক মরণঘাতী যুদ্ধের মাঝখানে! বলা হচ্ছে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বাধিক প্রাণঘাতী যুদ্ধ তথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের উপরে নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমা তৈরির পিছনের মূল নিয়ামক প্রজেক্ট ম্যানহাটন নিয়ে। প্রজেক্ট ম্যানহাটন নিয়ে আলোচনার আগে এই প্রজেক্ট যে মূলনীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত, তা সম্পর্কে জেনে আসি।  

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ 

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের যাত্রা এতদিনের প্রচলিত চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানকে নানা দিক দিয়ে চ্যালেঞ্জ করে যাচ্ছিল। ১৮৯৫ সালে রন্টজেন যখন প্রথম এক্স-রে আবিষ্কার করেন, তখন দেখা যায় এক্স-রের এরূপ ধর্ম বাহ্যিক কোনো শক্তির প্রভাবে সংঘটিত হয়নি। বরং, সংশ্লিষ্ট পদার্থের অভ্যন্তরীণ ধর্মের কারণে এরূপ হচ্ছে। পরবর্তীতে মেরি কুরি এবং তাঁর স্বামী পিয়েরে কুরি তেজস্ক্রিয় মৌলসমূহ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেন এবং আলফা, বিটা ও গামা রশ্মির ধর্ম সম্পর্কে নানাবিধ তথ্য দেন। 

একদিকে যখন পদার্থবিদেরা পদার্থের এরূপ অস্বাভাবিক আচরণের কারণ খুঁজে যাচ্ছেন, তখন রসায়নবিদেরা খুঁজে যাচ্ছেন সহস্রাব্দ প্রাচীন এক প্রশ্নের উত্তর। জগতের সকল কিছু যে পরমাণু দিয়ে তৈরি, সেই পরমাণু আসলে কী দিয়ে গঠিত? নানা ধরনের পরমাণু মডেলের প্রস্তাবনা করে যাচ্ছেন একের পর এক বিজ্ঞানী। একে অপরের যুক্তিখণ্ডন করে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানকে। 

এই সময় লক্ষ্য করা গেল যে, পরমাণুর অভ্যন্তরে প্রোটন এবং নিউট্রন সংখ্যার অনুপাত একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে পরমাণুটি আর স্থিতিশীল থাকে না। বরং, এটি বিয়োজিত হয়ে নতুন নতুন মৌল তৈরি করে। তবে একটি জিনিস মেলাতে সমস্যা হচ্ছিল। যে বৃহত্তর মৌলের পরমাণু ভেঙে এই দুইটি বা তিনটি ক্ষুদ্রতর মৌলের পরমাণু তৈরি হচ্ছে; তাদের ভর আদি বৃহত্তর মৌলের সমান নয়, বরং কিছুটা কম। এই পর্যন্ত ছিল এতদিনের পর্যবেক্ষণলব্ধ উপাত্ত।

এরপর থেকে শুরু হলো গবেষণার কাজ। ইতোমধ্যে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর ভর-শক্তি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছিলেন যার সারমর্ম ছিল যে, ভর এবং শক্তি পরস্পর রূপান্তরযোগ্য। তাই, প্রারম্ভ এবং সমাপ্তিতে ভরের পার্থক্য প্রকারান্তরে শক্তির পার্থক্যকেই নির্দেশ করছে যা শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতির লঙ্ঘন। তাঁরা ধারণা করছিলেন, অবশ্যই এমন কিছু আছে, যা তাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। কেননা, শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম প্রামাণ্য একটি তত্ত্ব।    

১৯৩৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।

নিউক্লিয়ার ফিশনের অন্যতম প্রবক্তা বিজ্ঞানী অটো হান
চিত্র: বিজ্ঞানী অটো হান; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

জার্মান বিজ্ঞানী অটো হান এবং তাঁর সহকারী ফ্রিৎজ স্ট্র‍্যসম্যান এদিন সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন। তাঁরা প্রস্তাব করেন যে, নিউক্লিয়ার ফিশন নামে এক বিশেষ ধরনের বিক্রিয়ার দ্বারা উচ্চ আণবিক ভরবিশিষ্ট মৌলের নিউক্লিয়াস ভেঙে কম ভরের দুই বা ততোধিক ক্ষুদ্রাকৃতির মৌলে পরিণত হয়।

নিউক্লিয়ার ফিশন ছিল প্রজেক্ট ম্যানহাটন এর মূল চালিকাশক্তি।
চিত্র: নিউক্লিয়ার ফিশন; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

যেই পরিমাণ ভর এক্ষেত্রে হারিয়ে গিয়েছে বলে ধারণা করা হয়, তা প্রকৃতপক্ষে হারিয়ে যাওয়া ভর নয়। বরং, এই প্রক্রিয়া কিছু মুক্ত নিউট্রন এবং শক্তি তৈরি করে যারা অন্য মৌলকে আঘাত করে পুনরায় এই বিক্রিয়া সূচনা করে। এই কারণেই এরূপ সকল বিক্রিয়া চেইন বিক্রিয়া বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া নামে পরিচিত। শৃঙ্খল বিক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সূচনার খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এই বিক্রিয়া লক্ষাধিকবার সম্পাদিত হতে পারে এবং প্রচুর পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হতে পারে। 

১৯৩৯ সালের জানুয়ারি মাসে সর্বপ্রথম জনসমক্ষে লিসে মেইটনার এবং তাঁর ভাগনে অটো রবার্ট ফ্রিশ্চ নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়াকে নিয়ে আসেন।

নিউক্লিয়ার ফিশনের অন্যতম প্রবক্তা লিসে মেইটনার
চিত্র: লিসে মেইটনার; চিত্রসূত্র – উইকিমিডিয়া কমন্স

অটো রবার্ট ফ্রিশ্চ এই বিক্রিয়াকে জীববিজ্ঞানের কোষ বিভাজনের সাথে তুলনা করেন।

নিউক্লিয়ার ফিশনের অন্যতম প্রবক্তা অটো রবার্ট ফ্রিশ্চ
চিত্র: অটো রবার্ট ফ্রিশ্চ; চিত্রসূত্র – National Portrait Gallery

এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন বিপুল পরিমাণের শক্তির ব্যবহারে সামনের দিনে মানবজাতি যে আরো এগিয়ে যাবে, সেই আশায় উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিলেন বিজ্ঞানী সমাজ।

আরো পড়ুন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও নকল প্যারিস

ইতিহাসের খাতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ 

মানব ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলার কর্তৃক পোল্যান্ড দখল অভিযানের মাধ্যমে এই ধ্বংসলীলা শুরু হলেও ধীরে ধীরে বিশ্বের প্রায় সকল পরাশক্তিই কোনো না কোনো পক্ষে জড়িয়ে পড়ে।

হিটলারের নেতৃত্বে জার্মান সেনার পোল্যান্ড দখল প্রজেক্ট ম্যানহাটন প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত করেছিল।
চিত্র: হিটলারের নেতৃত্বে জার্মান সেনার পোল্যান্ড দখল; চিত্রসূত্র – মিলিটারি টাইমস

বিশ্ব বিভক্ত হয়ে যায় দুইটি সামরিক জোটে। অক্ষশক্তি এবং মিত্রশক্তি। হিটলারের নেতৃত্বে জার্মানি, মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালি এবং জাপান ছিল অক্ষশক্তির মূলকেন্দ্র। অন্যদিকে রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন ছিল মিত্রশক্তির মূল। এই যুদ্ধের ফলে সামগ্রিকভাবে প্রায় অর্ধশতকের জন্য পৃথিবীর রাজনৈতিক গতিপথ বদলে যায়। 

রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ 

নিউক্লিয়ার ফিশনের আবিষ্কারক অটো হান ছিলেন জাতিতে জার্মান। অন্যদিকে ফ্রিৎজ স্ট্র‍্যসম্যান ছিলেন জন্মগতভাবে অস্ট্রিয়ার বাসিন্দা যা ছিল তৎকালীন সময়ে জার্মান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া এই প্রকল্পের আরো দুই সহযোগী গবেষক লিসে মেইটনার এবং অটো রবার্ট ফ্রিশ্চ ছিলেন অস্ট্রিয় জাতীয়তার। 

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই মিত্রশক্তির মাথায় একটি দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খেতে শুরু করে। যদি কোনোভাবে মিত্রশক্তি এই নব্য আবিষ্কৃত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বোমা তৈরি করে তাদের উপরেই ব্যবহার করে, তখন আর দুর্গতির সীমা থাকবে না। তাই মিত্রশক্তি চেষ্টা করে যাচ্ছিল, জার্মানদের আগে তারা যেন এই প্রযুক্তি নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারে। কেননা, যুদ্ধকালীন সময়ে এই বিপুল শক্তি উৎস তাদের শত্রুর উপরে তাদের প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখবে।

… … … (চলবে)

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

তথ্যসূত্র

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on প্রজেক্ট ম্যানহাটন: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শক্তির বিধ্বংসী ব্যবহার (পর্ব ১)

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!