পিথাগোরাস বনাম আইন্সটাইন

পিথাগোরাস বনাম আইন্সটাইন: c² তুমি কার?

4.6
(7)
Bookmark

No account yet? Register

ভোর রাত হইতে মগজে লঙ্কাকাণ্ড ঘটাইয়া অর্ক চিন্তিত হইলো, এই ব্রহ্মাণ্ডে যদি ও কেবল যদি একটাই মাত্র থাকিতো এবং তাহা লইয়া যদি ভায়োলিন বাদক আইন্সটাইন আর নাটের গুরু পিথাগোরাস ঝগড়া বাধাইয়া দিতো, তাহা হইলে কে বিজয়ী হইত?

অসামান্যতে লিখুন

c এর মান 299792458 ms-1হইয়া তাহা কি আইন্সটাইনের ঝুলিতে যাইতো! নাকি রাইট ট্রায়াঙ্গেলের হাইপোটেনিয়াস বইলা তাহা পিথাগোরাস লইতো!

কে বিজয়ী হইতো, হুঁ কে বিজয়ী হইতো?

একটা সমকোণী ত্রিভুজ, তার সমকোণ সংলগ্ন দুই বাহুর উপর অঙ্কিত বর্গদ্বয়ের ক্ষেত্রফলের সমষ্টি, সমকোণের বিপরীত বাহুর উপর অঙ্কিত বর্গের ক্ষেত্রফলের সমান।

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

এই বিবৃতিটিকেই সমীকরণ আকারে লিখতে হয়,

(লম্ব)² + (ভুমি)² = (অতিভুজ

নিম্নমাধ্যমিক থেকেই এই বিবৃতি সকলের জানা, প্রমাণ সহ। ‘পিথাগোরাসের উপপাদ্য’,  মতভেদ এখানেই; ইতিহাস তো সব মনে রাখে। পিথাগোরাসের জন্মেরও ১০০০ বছর পূর্বে মেসোপোটেমিয়া অঞ্চলের মানুষরা সমকোণী ত্রিভুজের এই ধারণা জানতো। তারা এভাবে ভেবেছিল, যদি তিন একক দৈর্ঘ্যের দড়ির উপর চার একক দৈর্ঘ্যের অপর একটা দড়ি লম্বালম্বি রাখা হয়, তবে ত্রিভুজ গঠন করতে হলে অপর বাহুর দৈর্ঘ্য যা হবে তা অবশ্যই পাঁচ একক।

পিথাগোরাস প্রাচীন মিশরের অ্যাথেনায় তাঁর শিষ্যদের জ্ঞান বিতরণ করতেন। পিথাগোরাস ও তাঁর শিষ্যদের চিন্তার ধরন কিছুটা এমন হতে পারে, যে এই 3,4,5 এর মধ্যে আসলে সম্পর্ক টা কেমন! যদি যেকোনো তিনটি সংখ্যা নেয়া হয়, যেমন 9,10,11 তাহলেও কি একই ঘটনা ঘটবে? মানে ভূমিতে 9, লম্বে 10 একক রাখলে অতিভুজ কি 11 হয়? না, তা হয়না। তাহলে 3,4,5 সাধারণ কোনো ত্রয়ী না। এদের মধ্যে আরও ভিন্ন রকমের কোনো সম্পর্ক রয়েছে এবং সম্পর্কটি:  3² + 4² = 5²

এই সম্পর্ক পিথাগোরাসের মাথায় এসে যাওয়া স্বাভাবিক, কারণ তিনি সবকিছুই সংখ্যা দিয়ে চিন্তা করতেন। এরপর তিনি খুঁজলেন এমন ত্র‍য়ী কি আরও পাওয়া সম্ভব? দেখা গেলো 5,12,13 ; মানে 5 কে ভুমিতে, 12 কে লম্বে রাখলে অতিভুজ 13 একক হয়।

এবং এখানেও 5² + 12² = 13².

সেই প্রাচীন মিশরে শুরু,

পিথাগোরাস তুমি নাটের গুরু!

আজ অবধি (লম্ব)² + (ভুমি)² = (অতিভুজ)² এই সম্পর্কটির ভিন্ন ভিন্ন প্রমাণ দিয়ে গেছেন অনেকেই অনেকভাবে। তাই পিথাগোরাসের উপপাদ্যটির প্রমাণ নিয়ে কোনোরূপ কথা না বলাই ভালো, না বললে অন্তত সময় বাঁচে। কারণ, আজ অবধি প্রায় সাড়ে তিনশ রকমে এই উপপাদ্যটি প্রমাণ করা হয়েছে! ভাবা যায়! সাড়ে তিনশত প্রকারে।

লেখকের ভালো লাগা প্রমাণগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে রি-অ্যারেঞ্জমেন্ট ব্যবহার করে। যেটা সকলেই জানে, সকল বইতে আছে, সকলেই শুরুতে শিখে। খুব সাধারণ হলেও বেশ ভালো লাগে।

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

প্রথমে (বামপাশে) একটি বর্গক্ষেত্র যার বাহুর দৈর্ঘ্য (a+b). আসলে আমরা 4 টি সমকোনী ত্রিভুজ নিয়েছি যাদের প্রত্যেকের লম্ব a, ভূমি b এবং অতিভুজ c.এমনভাবে 4 টি ত্রিভুজ রেখেছি যেন তাদের লম্ব,ভুমি বড় বর্গটির বাহু বরাবর পতিত হয় আর সবগুলো ত্রিভুজেরই অতিভুজ c মধ্যভাগে পড়ে।

স্পষ্টতই বড় বর্গটির ক্ষেত্রফল (a+b)² এবং মধ্যে সাদা অংশ’র (ছোটো বর্গ) ক্ষেত্রফল .

এবারে ডানপাশের চিত্রে আমরা ত্রিভুজগুলো রিঅ্যারেঞ্জ করলাম। এমনভাবে রিঅ্যারেঞ্জ করলাম যেন, লাল ও সবুজ ত্রিভুজটা উপরে বামপাশে যায় এবং বেগুনী ও বাদামী ত্রিভুজটা নিচে ডানপাশে আসে। তাহলে এই চিত্রে, মোট ক্ষেত্রফল (a+b)² এবং সাদা অংশের ক্ষেত্রফল a² + b².

আমরা মোট ক্ষেত্রফল ঠিক রেখেছি, চারটি ত্রিভুজের ক্ষেত্রফলও কোনোরূপ পরিবর্তন করিনি। তাহলে প্রথম চিত্রের সাদা অংশের ক্ষেত্রফল এবং দ্বিতীয় চিত্রের সাদা অংশের ক্ষেত্রফল সমান হব।

অতএব, ১ম চিত্রের সাদা ক্ষেত্রফল = ২য় চিত্রের সাদা ক্ষেত্রফল 

                             অতএব, c² = a² +b²

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

আর এখন যে প্রমাণের কথা বলবো সেটা আরও সাধারণ; আরও সাদামাটা। আর পৃথিবীর সকল সাদামাটা জিনিসপত্রই সকলের পছন্দের।

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্র ১ । চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

১ম চিত্রে ত্রিভুজ PQR,  অতিভুজ PQ. PQ কে বাহু ধরে ঐ বরাবরএকটা বর্গাকার বাক্স রাখি। একইভাবে RQ কে বাহু ধরে একটি বর্গাকার বাক্স রাখি, PR কে বাহু ধরে আরেকটি বাক্স রাখি।

এবারে সমকোণ সংলগ্ন বাক্সগুলো শ্যাম্পেইন দ্বারা ভর্তি করি (শ্যাম্পেইনই নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই, আপনি চাইলে তিব্বত কদুর তেলও রাখতে পারেন; আমি শ্যাম্পেইন নিয়েছি কারণ শ্রোডিঙ্গার সাহেব নাকি শ্যাম্পেইন খেয়ে ইলেকট্রনের তরঙ্গ ফাংশনের পেপারটা লিখেছিলেন)। 

আচ্ছা এক কাজ করি, বাক্সগুলোর নাম দিই। এখন থেকে PRIJ হলো লাল বাক্স, RQKL হলো সবুজ বাক্স আর PQMN হলো নীল বাক্স। তাহলে লাল আর সবুজ বাক্স শ্যাম্পেইন ভর্তি।

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্র ২ । চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

২য় চিত্রে, আগে থেকেই ত্রিভুজ PQR এর P এবং Q শীর্ষবিন্দুতে দুইটি কপাটিকা সেট করে রাখা ছিলো, এখন কপাটিকা খুলে দিলাম! তা হলে, সেই শ্যাম্পেইন এখন নীল বাক্সে এসে পড়বে।

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্র ৩ । চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

৩য় চিত্রে, যখন নীল বাক্স পুরোপুরি ভরতি হয়, তখন লাল আর সবুজ বাক্স পুরোপুরি খালি হয়। তার মানে নীল ক্ষেত্রটার মোট জায়গা লাল আর সবুজ ক্ষেত্রটার মোট জায়গার সমষ্টির সমান।

লাল ক্ষেত্র + সবুজ ক্ষেত্র = নীল ক্ষেত্র

(লাল বাহু)² + (সবুজ বাহু)² = (নীল বাহু)²

[আমরা নিজেরদের আদলে একটা সমীকরণ লিখে ফেললাম!একেবারে কঠিন অবস্থা!]

এক্সপেরিমেন্টটা কিন্তু উল্টোও করা যেত।মানে প্রথমে নীল বাক্স ভর্তি রেখে লাল আর সবুজ বাক্স খালি রাখা।

এখন আমরা পিথাগোরাস এর উপপাদ্যকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে পাওয়ার চেষ্টা করব। সেটার জন্য একটা বিষয় সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন, ‘সদৃশ্যতা’। আশা করি সদৃশ্যতা শব্দটা একেবারে নতুন নয় সকলের জন্য। যেমন, দুটো ত্রিভুজ কেবল মাত্র তখনই পরস্পরের সদৃশ হবে যখন তাদের অনুরুপ তিনটি কোণই সমান হবে। অন্যভাবে ভাবা যায়, যদি প্রদত্ত ত্রিভুজটিকে সবদিক থেকেই সমান অনুপাতে সংকুচিত করা হয়, তবে নতুন পাওয়া ত্রিভুজটি প্রদত্তটির সদৃশ হবে। আবার সবদিক থেকে সমান অনুপাতে প্রসারণ করলেও সদৃশ হবে। (সর্বসম আর সদৃশ কিন্তু আলাদা বিষয়!)

তো এই সদৃশ্যতা ধারণা থেকে একটা জিনিস সামান্য চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারি। যেকোনো ব্যসার্ধ বিশিষ্ট পৃথিবীর সকল বৃত্তই পরস্পরের সদৃশ, আবার সকল বর্গই পরস্পরের সদৃশ; কিন্তু সকল আয়তক্ষেত্রের ব্যাপারে এই কথা বলা যায় না, তারা সদৃশ হতেও পারে আবার নাও হতে পারে, ত্রিভুজরা পরস্পরের সদৃশ হতেও পারে আবার নাও হতে পারে।

আচ্ছা এবারে এই সদৃশ্যতা সাথে পিথাগোরাসের উপপাদ্যের কি সম্পর্ক! তার আগে একটা ফ্যাবল বা উপকথা বলি।

এক যে ছিল রাজা (সেই রাজার নাম অজাতশত্রু কিনা তা আমার জানা নেই!)।  রাজার ছিল দুই কন্যা; ঝিন্টু আর চিন্টু। রাজা বৃদ্ধ হয়েছেন, তাই তার জমিজমা বণ্টন করে দিতে চান দুই মেয়ের মাঝে। রাজার চার খণ্ড জমি রয়েছে, একখণ্ড  ঠিক একটা সমকোণী ত্রিভুজাকৃতির; এই অংশটাতেই রাজপ্রাসাদ অবস্থিত আর এই জমিটুকু নিজের জন্যই রাখতে চান রাজা। সমকোণী ত্রিভুজের তিনদিকে আরও তিনখণ্ড জমি রয়েছে, যা দুই মেয়ের মাঝে সমান ভাবে ভাগ করে দিতে চান, কিন্তু জমিগুলো কোনো চেনা পরিচিত জ্যামিতিক ক্ষেত্র না, এবড়োথেবড়ো অঞ্চল। কীভাবে সমান দুই ভাগে ভাগ করবে, এই চিন্তায় পড়ে রাজা তার কাউন্সিলরের সাথে যোগাযোগ করলেন। কাউন্সিলরকে রাজা প্রথমে বললেন, সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজ ঘেঁষে আছে একখণ্ড এবরোথেবরো জমি, আর চারপাশ দিয়ে দেখতে একই রকম শুধু ছোটো আকৃতির আরেকখণ্ড জমি রয়েছে ভূমি ঘেঁষে, আর দেখতে এই দুইটি জমির মতনই আরেকখন্ড রয়েছে লম্ব ঘেঁষে। এই তিনখণ্ড জমিকে কিভাবে সমান দুইভাগ করতে পারি?

কাউন্সিলর বেশি সময় নিলেন না, তিনি জানালেন অতিভুজ বরাবর যে জমিটুকু রয়েছে, তার ক্ষেত্রফল হবে অপর দুইটা জমির মোট ক্ষেত্রফলের সমান। তাহলে অতিভুজ বরাবর জমিটুকু এক কন্যাকে আর অপর দুইটা জমি অন্য কন্যাকে দিলেই সমানভাবে ভাগ করা হবে। রাজা কাউন্সিলরকে বললেন, কিন্তু কিভাবে বলে দিলেন, আমিতো ত্রিভুজাকৃতির জমিটুকুর কোনো বাহুর দৈর্ঘ্যই তোমাকে এখনো বলিনি। কাউন্সিলর বললেন, “রাজামশায় দৈর্ঘ্য্ জানার দরকার নেই। আপনি যে বলছেন দেখতে একই রকম, তাতে আমি বুঝে গিয়েছি যে তিনটি জমিই পরস্পরের সদৃশ। আর তিনটি অঞ্চলই যখন সদৃশ হবে তখন বড়টির ক্ষেত্রফল হবে বাকি দুইটির ক্ষেত্রফলের সমষ্টির সমান।” এটাই পাইথাগোরিয়ান ব্লব থিওরি।

আমরা যে শুধুমাত্র বর্গক্ষেত্রের বেলায় পিথাগোরাসের উপপাদ্য জানতাম সেখানেও কিন্তু তিনটি বর্গই পরস্পরের সদৃশ,তাহলে এ কথা বলাই যায় মূলত সেই জানা থিওরীটা ছিলো পাইথাগোরীয়ান ব্লব থিওরিরই একটা স্পেশাল কেস।

রাজার এই ফ্যাবল বা উপকথা অনুযায়ী নিচের প্রথম উদাহরণটা সহ আরও কিছু উদাহরণ দেখি:

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

১। (বেগুনী ক্ষেত্রফল) + (বাদামী ক্ষেত্রফল) = (নীল ক্ষেত্রফল)  /*কারণ তিনটি ক্ষেত্রই পরস্পরের সদৃশ।*/

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

২। (আসমানী ক্ষেত্রফল) + (হলুদ ক্ষেত্রফল) = (লাল ক্ষেত্রফল)  /*কারণ তিনটি ত্রিভুজই পরস্পরের সদৃশ।*/

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

৩। (বেগুনী ক্ষেত্রফল) + (বাদামী ক্ষেত্রফল) ≠ (আসমানী ক্ষেত্রফল)  /*কারণ তিনটি ত্রিভুজ পরস্পরের সদৃশ নয়।*/

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

৪। (কালো ক্ষেত্রফল) + (হলুদ ক্ষেত্রফল) = (নীল ক্ষেত্রফল)  /* কারণ তিনটি পঞ্চভুজই পরস্পরের সদৃশ । */

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

৫। (নীল ক্ষেত্রফল) + (সবুজ ক্ষেত্রফল) ≠ (লাল ক্ষেত্রফল)  /*কারণ তিনটি অঞ্চল পরস্পরের সদৃশ নয়।*/

৩ নং আর ৫ নং উদাহরণে ছোটো দুই অঞ্চলের মোট ক্ষেত্রফল বড়টির সমান হলেও হতে পারে। তবে তা নিতান্তই কাকতালীয়। ক্ষেত্রফল পরিমাপ করতে হলে তখন আমাদের ইন্টিগ্রেশন এর ছায়াতলে যেতে হবে। আর যখন তিনটি ক্ষেত্রই পরস্পরের সদৃশ হবে তখন পাইথাগোরিয়ান ব্লব থিওরি প্রযোজ্য হবে।

চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে,কদম তলায় কে!

হিপ্যাসাসের মৃত্যু হলো ভূমধ্যসাগরে!!

এখন আরেকটি জিনিস দেখি। জিনিসটা যা কাজের তার থেকে বেশি সুন্দর, আর এর সাথে মিশে আছে একটা দুঃখের ঘটনা। [আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি।]

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
রুট স্পাইরাল । চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

এই জিনিসটাকে বলে রুট স্পাইরাল (root spiral)।

প্রথমে আমরা কাজ শুরু করেছি, আইসোসিলিস রাইট ট্রায়াংগেল বা সমদ্বিবাহু সমকোণী ত্রিভুজ নিয়ে, যার একবাহুর দৈর্ঘ্য 1, তাই অপর বাহুও 1 একক।

তাহলে অতিভুজ = √(1+1)=√2

এরপর, √2 এবং 1 একককে লম্ব, ভূমিতে রেখে অতিভুজ=√3, এরপর √31 কে রেখে অতিভুজ = √4 … … … এভাবে পর্যায়ক্রমে 2 থেকে শুরু করে সকল স্বাভাবিক সংখ্যা পাওয়া যায় যাদের উপরে আবার স্কয়্যার রুট! কী সুন্দর!!

সুন্দর তো হল, আর দুঃখ!!

পিথাগোরাস সংখ্যা দিয়ে সবকিছু চিন্তা করতেন। তিনি মনে করতেন, সবকিছুকে পূর্ণ সংখ্যায় লেখা যায়। যেমন, পৌনে চার মানে 3/4, দেড় মানে 3/2 … … … অর্থাৎ পূর্ণসংখ্যা বা পূর্ণসংখ্যার অনুপাতের বাইরে জগতে আর কোনো সংখ্যা নেই বলে মনে করতেন পিথাগোরাস।

এবারে সেই মিশর, সেই অ্যাথেনা, সেই শিষ্যদের মধ্যে একজন ছিলেন হিপ্যাসাস। তিনি একদিন পিথাগোরাসকে দেখালেন,

যদি আপনার উপপাদ্যে লম্ব 1 আর ভুমি 1 একক বসাই তাহা হইলে -অতিভুজ হয় √2 ; এই √2 কে কিভাবে দুইটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাতে লিখিবেন? তাহলে কি গুরু আপনার উপপাদ্য ভুল, নাকি সবকিছুই পূর্ণসংখ্যা এই ধারণা ভুল?

ভুলের কথা শুনিয়া পিথাগোরাস সাহেবের মগজে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়া গেলো, তিনি ক্ষুদ্ধ হইলেন, তাঁর শিষ্যরা পরদিনই হিপ্যাসাসকে জাহাজ থেকে ভূমধ্যসাগরে ফেলিয়া দেয়! দুঃখ, খুউব দুঃখ! [আমার দুঃখ গুলো কাছিমের মতো গুটি গুটি পায়ে এগোতে পারে না আর!]

এখন আমরা জানি, √2 একটা অমূলদ সংখ্যা বা ইর‍্যাশনাল (irrational) নম্বর। এটাকে কোনওদিনই দুটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাতে লেখা যাবে না। হিপ্যাসাসকেই অমূলদ সংখ্যার জনক বলা হয়।

আরও পড়ুন:

পিথাগোরিয় ত্রয়ী

প্রিমিটিভ পাইথাগোরিয়ান ট্রিপলেটস বা মৌলিক পাইথাগোরিয়ান ত্রয়ী! শব্দ হচ্ছে দুইটা, প্রিমিটিভ আর ট্রিপলেট। পাইথাগোরিয়ান ট্রিপলেটস হলো সেই সকল ধনাত্মক পূর্ণ সংখ্যা, যারা একটা সমকোণী ত্রিভুজের লম্ব, ভূমি ও অতিভুজ হয়। যেমন, (3,4,5), (5,12,13), (6,8,10) … … … অগণিত ট্রিপলেট রয়েছে।আচ্ছা ভূমিতে 1, আর লম্বে 2 রাখলে অতিভুজ হয় √5 ; তাহলে (1,2,√5) এটা কি পাইথাগোরিয়ান ট্রিপলেট? না। কারণ √5 পূর্ণ সংখ্যা নয়। ট্রিপলেট হবে তখন, যখন তিনটিই ধনাত্মক পূর্ণ সংখ্যা হবে।

আচ্ছা এবারে প্রিমিটিভ, মানে প্রারম্ভিক বা মৌলিক। ট্রিপলেটের সংখ্যাগুলো যদি পরস্পরের সহমৌলিক হয়, তবেই তারা প্রিমিটিভ। সহমৌলিক কী? – গ.সা.গু হবে 1)

যেমন: (6,8,10) এটা প্রিমিটিভ ট্রিপলেট না কারণ সহমৌলিক না, গ.সা.গু 2।

অন্যদিকে (3,4,5) এটা প্রিমিটিভ পাইথাগোরিয়ান ট্রিপলেট।

আমাদের লেখাপড়ায় আজ পর্যন্ত খুব বেশি পাইথাগোরিয়ান ট্রিপলেটস ব্যবহার করতে হয়নি।

(3,4,5), (5,12,13), (15,8,17), (7,24,25) ঘুরে ফিরে এই কয়টিই তো বা কিছু কম বেশি। কিন্তু এখন নতুন কোনো ট্রিপলেট পেতে কি আমরা তিনটি সংখ্যা র‍্যান্ডম (random) নিয়ে, ছোট দুইটির বর্গের সমষ্টি বড়টির বর্গের সমান কিনা যাচাই করব? অবশ্যই না! কারণ এটা খুব বোকা বোকা কাজ হবে। বোকারা ঐভাবে কাজ করে, আমরা পাইথাগোরিয়ান ট্রিপলেট জেনারেট করব।

পাইথাগোরিয়ান ট্রিপলেট খুঁজে বের করারও অনেক পদ্ধতি রয়েছে। তার মধ্যে লেখকের তিনটি পদ্ধতি জানা আছে, সেগুলোর একটা পদ্ধতি অসম্ভব ভালো!  শুধু সেই ভালো লাগা পদ্ধতিটির পাঠ চুকাই।

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

একটা মিশ্র ভগ্নাংশের সংগ্রহ। এটা মনে রাখা কি খুব কষ্টকর? মোটেই না! মিশ্র ভগ্নাংশের পূর্ণ অংশটা একটা স্বাভাবিক সংখ্যা এবং ভগ্ন অংশের লব বা নিউমারেটারে থাকবে ঐ সংখ্যা। আর হর বা ডিনোমিনেটর থাকবে পর্যায়ক্রমিক বিজোড় সংখ্যা। আমি এই ভাবে লিখলাম, একটা মিশ্র ভগ্নাংশ,

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

এই সংগ্রহের প্রতিটি উপাদানই আমাদেরকে একটা করে প্রিমিটিভ পাইথাগোরিয়ান ট্রিপলেট দান করে। যেমন, 1 সমস্ত 1/3, প্রথমে এই মিশ্রকে অপ্রকৃত বানাবো, তাহলে হয়  4/3.

লব বা হর হবে লম্ব বা ভূমি (4,3) অথবা পরস্পর বিপরীত এবং অতিভুজ হবে (লব+1).মানে (4+1)=5 . তাহলে  1 সমস্ত 1/3 দিয়ে আমরা পেলাম (3,4,5).

আবার, 2 সমস্ত 2/5 = 12/5 অতএব ট্রিপলেট (5,12,13)

লেখকের প্রিয় সংখ্যা 17.

17 দিয়ে করে দেখি !

প্রথমে  17 সমস্ত 17/35= 612/35 (অপ্রকৃত বানিয়েছি)

অতএব ট্রিপলেট (35,612,613)   অর্থাৎ,  [(35)2+(612)2=(613)2]  

কি সুন্দর যেন ঝড়ঝড়ে গদ্য! এই পদ্ধতির কথা প্রথম বলেছেন যিনি, তিনি হলেন মাইকেল স্টিফেল (1544 সালে)।

What is common between Euclid, twelve years old Einstein and American president James Gerffield ?

They all have come up with elegant proofs of the famous Pythagorean Theory.

হ্যাঁ, আমেরিকার ২০ তম প্রধানমন্ত্রী জেমস গারফিল্ডও নিজের মত পিথাগোরাসের উপপাদ্য প্রমাণ করে গেছেন। ভাবা যায়! আমেরিকার মত একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী বিকেল বেলা কফি খেতে খেতে গণিত নিয়ে চিন্তা করতেন!

আর আইনস্টাইন তো ১২ বছর বয়সেই ডাইসেকশন ব্যবহার করে এই উপপাদ্যের প্রমাণ করে গেছেন। ভায়োলিনের সুর অর্ককে খুব টানে। আইন্সটাইন খুব ভালো ভায়োলিন বাজাতেন। কি জানি! তবুও c2 টার্মটাকে তো ছেলেটা আজ হতচ্ছাড়া বুড়ামিয়া পিথাগোরাসকেই দিলো।

কোনদিন এর মান 299792458 ms-1  হয়ে ভর-শক্তি উপপাদ্য বা লরেন্টজ ট্রান্সফরমেশন নিয়ে অর্ক ফিরবে। সেই প্রতীক্ষায় রইলাম।

ফিচার ছবিসূত্র: লেখকের নিজস্ব সৃষ্টিকর্ম

আরও পড়ুন: পাই (π) : এক মহাকাব্যিক অমূলদ সংখ্যার কাহিনি

চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ
চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on পিথাগোরাস বনাম আইন্সটাইন: c² তুমি কার?

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!