নিকোলা টেসলা

নিকোলা টেসলা: পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কিন্তু অবহেলিত এক প্রকৌশলী

ইয়াসরিফ হাসান ইমন
5
(6)
Bookmark

No account yet? Register

আপনি যা কল্পনা করবেন তাকে কি বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন? এমন কি সবক্ষেত্রে সম্ভব? সাধারণ মানুষের কাছে এটা সম্ভব না হলেও নিকোলা টেসলা সেটা করে দেখিয়েছিলেন। তিনিই একমাত্র বিজ্ঞানী ছিলেন যিনি কল্পনাকে বাস্তবে রুপ দিতে পেরেছিলেন। এজন্যই তাকে ইতিহাসের সেরা প্রকৌশলী বলা হয়।

অসামান্যতে লিখুন

কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে সেরকম মনে রাখেনি বিশ্ববাসী। ছােট থেকেই আমরা যেভাবে আইনস্টাইন বা নিউটনের ব্যাপারে জানি, তাঁকে বলতে গেলে আমরা সেভাবে চিনিই না। তাই আজ সেই মহান বিজ্ঞানীকে শ্রদ্ধা জানানাের জন্য এই নিবন্ধ। 

পৃথিবীতে পরিবর্তনের জোয়ার আনতে পেরেছিলেন এমন মানুষ খুব কমই আছে। মানুষের মনে তাঁরা আজীবন স্মরণীয় থাকবেন। কিন্তু সবার ভাগ্য এত ভাল হয় না। এসি কারেন্ট আবিষ্কার করে দুনিয়া বদলানাে নিকোলা টেসলা এই লিস্টে প্রথমের দিকেই থাকবেন। অত্যন্ত মেধাবী এই বিজ্ঞানী আধুনিক দুনিয়া গড়ার অন্যতম কারিগর হলেও তিনি অনেকটা যেন অন্তরালেই রয়ে গেছেন। দুনিয়া আলোকিত করা এই মহৎ বিজ্ঞানী রয়ে গেছেন অনেকটাই অবহেলিত। আসুন জেনে নিই তার জীবন কাহিনী ।

নিকোলা টেসলা
নিকোলা টেসলা । চিত্রসূত্র : Pixabay

জন্ম 

নিকোলা টেসলার জন্মের কাহিনীটা বেশ অদ্ভুত । ১৮৫৬ সালের প্রচন্ড এক ঝড় বাদলের রাতে হাঙ্গেরিয়া-অস্ট্রিয়া সীমান্তবর্তী সিমিলজান নামক ক্রোয়েশিয়ার (বর্তমানে সার্বিয়া) এক গ্রামে  তিনি এক যাজক পরিবারে জন্ম নেন। সময়টা ছিল ঠিক রাত ১২ টায় অর্থাৎ ৯ ও ১০ জুলাইয়ের মাঝে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এই জন্য তার জন্মের তারিখ ২ টা বলা হয় ।

এমন প্রতিকূল আবহাওয়ায় জন্ম নেন বলে ধাত্রী তাকে বলেন চাইল্ড অফ ডার্কনেস । কিন্তু তার মা অপমানিত বোধ করেন । তিনি তখন বলেন  যে, দেখবে আমার ছেলেই একদিন দুনিয়া আলোকিত করবে । তাই তিনি টেসলার নাম দেন চাইল্ড অফ লাইট । পরবর্তীতে তিনি এসি কারেন্ট আবিস্কার করে দুনিয়া আলোকিত করে মায়ের কথার সত্য প্রমাণ করেছিলেন।

পড়াশোনা

টেসলার বাবা ও নানা ছিলেন ধর্মযাজক । তারা চেয়েছিলেন টেসলাও সেই পথেই আসুক । কিন্তু তিনি এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনাগ্রহী ছিলেন।

১৮৬১ সালে প্রাইমারীতে ভর্তি হয়ে শেখেন জার্মান ভাষা, ধর্মতত্ত্ব ও গণিত । ১৮৭০ সালে স্কুলে পড়া অবস্থায়ই তার অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। 

সেদিন ক্লাসে শিক্ষক ইন্ট্রিগেশন করাচ্ছিলেন। দেখলেন তিনি যা করাচ্ছেন একজন তা খাতায় না করেই মুখে মুখে উত্তর বলে দিচ্ছে,ভাবলেন উত্তর মুখস্ত করেছে । তাই পরীক্ষা করার জন্য শিক্ষক   আরও কিছু জটিল সমস্যা দিলেন । এবারও মুখে মুখেই সব উত্তর তিনি বলে দিলেন । ১৪ বছরের সেই বিস্ময়কর বালকটিই ছিল নিকোলা টেসলা । এভাবেই তার অসামান্য মেধার প্রকাশ  ঘটে। 

৪ বছরের পড়া ৩ বছরেই শেষ করে ১৮৭৩ সালে গ্রাজুয়েট শেষ করেন তিনি । পড়া শেষে বাড়ি ফিরে কলেরার প্রকোপে পড়ে বেশ কয়েকবার মৃত্যু সজ্জায় পৌঁছে গেছিলেন । তখন বাবার কাছে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য কথা আদায় করে নেন । পরের বছর অর্থাৎ ১৮৭৪ সালে আর্মিতে ভর্তি হওয়া থেকে বাঁচতে তিনি পালিয়ে পাহাড় পর্বতে ঘুরে বেড়ান আর তখনই বিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের লেখার ভক্ত হয়ে যান, মজার বিষয় তারা পরবর্তীতে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিলেন।

তিনি তার স্বপ্নের অস্ট্রিয়ান পলিটেকনিকে ভর্তি হন ১৮৭৫ সালে। পড়াশোনায় তিনি এত বেশি মনোযোগী ছিলেন যে প্রথম বর্ষে তিনি কোনো ক্লাস মিস দেন নি। আর এজন্য তিনি ডিনের কাছে লেটারও পান। কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষে ক্লাসে “কম্যুটেটর দরকার কিনা ”এ বিষয়ে শিক্ষকের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।তার পরের বছর তিনি জুয়া খেলায় আসক্ত হয়ে যান। ফলশ্রুতিতে তিনি আর ডিগ্রি নিতে  পারেন নি, হয়ে যান ড্রপআউট। ড্রপ আউটের লজ্জা থেকে বাচতে তিনি স্লোভেনিয়াতে পালিয়ে যান আর ৬০ ফ্লোরিনের পরিবর্তে ড্রাফটসম্যানের কাজ শুরু করেন। তারপরেও জুয়ার নেশা থেকে বাঁচতে পারেননি। অবশেষে ১৮৭৯ সালে তার বাবা তাকে খুজে পান ও অনেক জোর করে তাকে বাড়ি নিয়ে যান। কিন্তু  দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার বাবা সেই বছরেই মারা যান। আর তাই তিনি সংসার চালানোর জন্য তার পুরোনো স্কুলে পড়ানো শুরু করেন।

১৮৮০ সালে আবার পড়াশোনা করতে চাচাদের টাকায় তিনি  প্রাগে চলে যান,কিন্তু রেজিস্ট্রেশন করার সময় শেষ হওয়ায় আর ভর্তি হতে পারেননি। ফলে তিনি পড়াশোনার পাট চুকান;শুরু হয় তার কর্মজীবন।

কর্মজীবন

১৮৮১ সালে বুদাপোস্টে টেলিফোন একচেঞ্জে কাজ নেন তিনি। সেখানে তিনি তার মেধার সাহায্যে কোম্পানির আমুল পরিবর্তন আনেন। তখনি তার পরিচয় হয় তিভাদার পুস্কাসের সাথে যার সহায়তায় ১৮৮২ সালে প্যারিসে পাড়ি জমান আরেক বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তির কোম্পানিতে কাজ করার জন্য। ধারণা করতে পারছেন তিনি কে?

হ্যাঁ, তিনি তখনকার বিশ্বের সেরা ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা টমাস আলভা এডিসনের প্যারিস শাখার অফিসে আসেন কাজ করতে। কাজ দিয়ে নিজের জাত চেনানোর পর  এডিসন নিজেই তাকে নিয়োগ করেন আর তিনি পাড়ি জমান ১৮৮৪ সালে নিউইয়র্কে মূল কোম্পানির উদ্দেশ্যে।

প্রথম প্রথম তিনি সিম্পল ইলেকট্রিক্যাল সার্কিট নিয়ে কাজ করলেও আস্তে আস্তে জটিল হতে থাকল তার কাজ। পরে ১৮৮৫ সালে বিদ্যুৎ পরিবহণের জন্য কিছুদুর পরপর স্টেশন বানানোর দরকার পড়লে এডিসন কাজটার দায়িত্ব দেন টেসলাকে অর্থাৎ ডিসি ইঞ্জিনের উন্নত মডেল তৈরি করাতে বলেন। এডিসন বলেন তিনি কাজ করতে পারলে তাকে ৫০,০০০ ডলার দেবেন। টেসলা তখন সারা দিন রাত কাজ করে ৬ মাসের মাথায় কাঙ্ক্ষিত সেই যন্ত্র আবিষ্কার করেন যা কার্যত এসি কারেন্টের সুচনা ছিল। কাজ শেষে  তিনি তার পারিশ্রমিক দাবি করলে এডিসন বলেন “You don’t know the American humor.’ তখন তিনি তার বেতন সপ্তাহে ১০ ডলার থেকে ১৮ ডলার করতে রাজি হন অর্থাৎ মাত্র ৮ ডলার বাড়াতে চান। রাগে দুঃখে তিনি কাজ ছেড়ে দেন।

তখন জেদের বসেই তিনি “টেসলা ইলেকট্রিক লাইট এন্ড ম্যানুফ্যাকচারিং” কোম্পানি খোলেন। কিন্তু উদ্যোক্তার অভাবে তিনি সর্বহারা হলেন। তীব্র অর্থাভাবে পড়ে মাত্র ২ ডলারে তখন তিনি রিপেয়ারম্যানের কাজ করেন। পরবর্তীতে ১৮৮৬ সালে আলফ্রেড এস ব্রাউনের সহায়তায় ওয়েস্ট্রান ইউনিয়ন কোম্পানির সাহায্যে নতুন করে কাজ শুরু করেন আর ম্যানহাটনে নিজের ল্যাবরেটরি তৈরি করেন। 

১৮৮৭ সালে এই ল্যাব থেকেই দুনিয়া বদলানোর নতুন ইতিহাস তৈরি  হয়। তাঁর নিজের ডিজাইন করা ইন্ডাকশন মোটর এসি কারেন্টের উদ্ভাবন ঘটায়,যা ইউরোপে নতুন করে বিপ্লবের শুরু করে। বর্তমান বিশ্ব এই এসি কারেন্টের উপরেই ভিত্তি করে অগ্রসর হচ্ছে। এই ইন্ডাকশন মোটর থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ১৮৮৯ সালে তিনি আরেক যুগান্তকারী জিনিস “টেসলা কয়েল” আবিস্কার করেন।

১৮৯৫ সালে ডিন এডমিন্সের সহায়তায় তিনি আবার তার কোম্পানি চালু করেন। তার অবদানের জন্য এডিসনের একচেটিয়া ব্যবসায় ক্ষতি হতে শুরু করে আর তার ফলশ্রুতিতে তাকে তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি IEEE (তখনকার AIEEE) এর প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদ হারাতে হয়। তার বদলে টেসলা ১৮৯২-১৮৯৪ পর্যন্ত AIEEE এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। AIEEE এর পূর্ণরুপ হচ্ছে – আমেরিকান ইন্সটিটিউট অফ ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার্স।

একটি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা
একটি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা । চিত্রসূত্র : Wikimedia Commons

টেসলার বিখ্যাত কিছু আবিষ্কার

টেসলা অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন। তাঁর সবগুলোর পেটেন্ট তিনি পান নি বা নেন নি। কিছু আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা না করলেই নয়। 

১. এসি কারেন্ট

বর্তমান বিশ্বের চালিকা শক্তি, যা আবিষ্কার না হলে দুনিয়া আলোকিত হত না,হত না এত উন্নত। এসি কারেন্ট আবিষ্কার করার জন্য তিনি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

২. ইন্ডাকশন মোটর

নিকোলা টেসলা ইন্ডাকশন মোটর
ইন্ডাকশন মোটর । চিত্রসূত্র : Wikimedia Commons

আমরা সবাই জানি ইন্ডাকশন মোটর ছাড়া বর্তমানে শিল্প কারখানা এক পাও চলতে পারে না। তাই ইন্ডাকশন মোটরের ভূমিকা পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন।

৩. রেডিও

আমরা সবাই জানি মার্কনী রেডিও আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু সত্য গল্পটা আসলে ভিন্ন। টেসলা তাঁর অনেক আগেই রেডিও আবিস্কার করেছিলেন এবং তাঁর গবেষণায় ব্যবহারও করেছিলেন। আমেরিকান কোর্ট ১৯৪৩ সালে সত্যটা জানার পর মার্কনীর পেটেন্ট বাতিল করলেও তিনি প্রভাবশালীদের সহায়তায় আবার রেডিওর পেটেন্ট নিজের নামে করে নেন। 

৪. রিমোট, রোবট, গাইডেড মিসাইল সিস্টেম 

১৮৯৮ সালে টেসলা নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে জনসম্মুখে পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বপ্রথম রিমোট চালিত নৌকা প্রদর্শন করেন। ভিত্তি হিসেবে তিনি রেডিও তরঙ্গকে ব্যবহার করেন আর এটাই ছিল রেডিও ওয়েভকে ব্যবহার করা প্রথম যন্ত্র। সেই হিসেবে তিনি রেডিও ওয়েভের আবিষ্কারকও বটে। নিউইয়র্কের টেসলা মেমরিয়াল সোসাইটির প্রসিডেন্ট Dr. Ljubo Vujovic বলেছিলেন “এটি হলো রোবটের জন্মস্থান”

৫. মডার্ন লাউডস্পিকার

প্যারিসে চাকরি করার সময় তিনি কম্পিউটার রিপিটার সিস্টেমের উন্নয়ন সাধন করেন যা আধুনিক লাউডস্পিকার এর সূচনা ঘটায়। 

৬. টেসলা কয়েল

টেসলা কয়েল
টেসলা কয়েল । চিত্রসূত্র : Pixabay

তাঁর আবিষ্কৃত টেসলা কয়েল ছিল অনেক উচ্চ ক্ষমতার ভোল্টেজ উৎপাদনকারী। এখানে তিনি ৩টি সার্কিট ব্যবহার করেছেন। প্রথমটিতে এসি শক্তি, দ্বিয়িতটিতে আরোহী ট্রান্সফরমার এবং তৃতীয়টিতে ক্যাপাসিটর ছিল সম্মিলিতভাবে যা বিশাল ভোল্টেজ উৎপাদন করতে সক্ষম, প্রায় ৩,০০,০০০ ভোল্টের সমান ।

৭. হাইড্রোইলেক্ট্রিসিটির ধারণা

টেসলা টার্বাইন। চিত্রসূত্র : Wikimedia Commons

জলের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় এ ব্যাপারে তিনিই সবার আগে ধারণা দেন। তিনি নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে পতনশীল পানিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেছিলেন। তাঁর কোম্পানি কাজও শুরু করেছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় ফান্ডের অভাবে তিনি প্রজেক্টটা সফল্ভাবে শেষ করতে পারেন নি। 

৮. ওয়াইফাই ইলেক্ট্রেসিটি

টেসলা টাওয়ার
টেসলা টাওয়ার । চিত্রসূত্র : Wikimedia Commons

ওয়াইফাই ছাড়া কি আর এখন কারও চলে? সেই ওয়াইফাইয়ের ধারণা কে দেন জানেন? নিকোলা  টেসলা! তিনি নিউইয়র্কে ১৮৭ ফুট লম্বা টেসলা টাওয়ার বানান। এখানে তিনি এমন যন্ত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছিলেন যাতে করে সারা পৃথিবীতে ফ্রিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যেত। এটাই প্রথম ব্যবহৃত ওয়াইফাই টেকনোলোজি। কিন্তু এতে করে বিদ্যুৎ কোম্পানির ক্ষতি হবে বলে ফান্ডদাতারা ফান্ড বন্ধ করে দেন। নইলে হয়ত আজ আমরা ফ্রিতে বিদ্যুৎ পেতাম।

আসলে টেসলার আবিষ্কার অনেক, প্রায় ৩০০ এর উপরে। মানবজাতি তাঁর উপর কৃতজ্ঞ। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি এমন কিছু যন্ত্রও আবিস্কার করেন বা চিন্তা করেন যা মানবজাতিকে বিপদে ফেলতে সক্ষম ছিল। এমন কিছু আবিস্কারের কথা না বললে লেখাটিতে অপূর্ণতা থেকে যাবে। এমন আবিষ্কার গুলোর মাঝে নিচের গুলো উল্লেখযোগ্য :

১. ভূকম্পন যন্ত্র ও মার্ক টোয়েনকে বিপদে ফেলা

নিকোলা টেসলার ল্যাবে লেখক মার্ক টোয়েন
নিকোলা টেসলার ল্যাবে লেখক মার্ক টোয়েন । চিত্রসূত্র : Wikimedia Commons

১৮৯৩ সালে টেসলা এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, যা চালু করলে তাঁর ম্যানহাটনের বাড়ি ও আশেপাশের বাড়িগুলো কেঁপে উঠত। সম্ভবত তিনি ভূকম্পন যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। এই যন্ত্র আবিষ্কার করার পর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনকে যন্ত্রের উপর দাড় করিয়ে পরীক্ষা করেন। ১ মিনিটের  মাথায় টোয়েন বেশ কাহিল হয়ে পড়েন। বিশাল পরিসরে এটি বানালে সারা দুনিয়ায়  তাণ্ডব লীলা হতে পারত বলে তিনি এটি ধ্বংস করেন। 

২. কৃত্রিম সুনামি

তিনি যুদ্ধে সুবিধার জন্য সমুদ্রে কৃত্রিম সুনামি বানিয়েছিলেন যা বিশাল আকারের ঢেউ বানাতে পারত।  ফলে সহজেই শত্রু পক্ষের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া যেত ।

৩. থট ক্যামেরা

তিনি এমন এক যন্ত্রের কথা ভেবেছিলেন যা মানুষের চিন্তাকে ডাটাতে পরিবর্তন করে প্রজেক্টরে দেখাত। এমন হলে তো মানুষের গোপনীতা বলতে আর কিছু  থাকত না! ভাগ্যিস অর্থাভাবে তিনি এটি বানাতে পারেন নি।

৪. সুপারসনিক প্লেন

তিনি যুদ্ধের সময় এমন এক সুপারসনিক প্লেনের কথা বলেন যা মাত্র ৩ ঘন্টায় নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন যেতে পারত তৎকালীন সময়ে যা অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল যে তাঁর মৃত্যুর পর মডেলটি পুরোপুরি হারিয়ে যায় ।

৫. প্রজেক্ট রেইনবো

আমেরিকার নৌবাহিনীকে শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় টেসলাকে এই প্রজেক্টটি দেওয়া হয়। প্রজেক্টটি ছিল নৌকাকে অদৃশ্য করা যাতে শত্রুপক্ষ ধরতে না পারে । মজার বিষয় হল আলবার্ট আইনস্টাইনও তাঁর দলের সদস্য ছিলেন । আর তিনি আসলেই একটি ছোট নৌকাকে অদৃশ্য করতে সক্ষম  হয়েছিলেন।

৬. ডেথ রে

১৯৩৪ সালে, তাঁর ৭৮তম জন্মদিনে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকার এ তিনি টেলিপ্যাথি নামের এমন এক যন্ত্রের কথা বলেন যা ডেথ রে ব্যবহার করে লাখ লাখ মানুষকে মেরে ফেলতে পারত। ভাগ্যিস এমন জিনিস তিনি আবিস্কার করেন নাই। 

তিনি আসলে এমন অনেক কিছুই আবিস্কার করেছেন কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই তা ক্রেডিট না দিয়েই নিজে অকপটভাবে ব্যবহার করেছেন। তবে তিনি যা দিয়েছেন তার অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

তিনি তাঁর কাজের জন্য অনেক সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছেন। কথিত আছে যে টেসলা আর এডিসনকে ১৯১৫ সালে নোবেল দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু এডিসন থাকায় তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু বিষয়টির সত্যতা যাচাই হয়নি আজও।

নিকোলা টেসলা স্মৃতি সেন্টার
নিকোলা টেসলা স্মৃতি সেন্টার । চিত্রসূত্র : Pixabay

তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর মধ্যে একটি হল চৌম্বক ঘনত্বের একক হিসেবে ‘টেসলা’ ব্যবহার করা হয়। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি যেসব পুরস্কার পান তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হল:

১. চৌম্বক ঘনত্বের একক টেসলা

২. অর্ডার অফ সেন্ট সাভা,প্রথম শ্রেণি,সার্বিয়া সরকার, ১৮৯২

৩. ইলিয়ট ক্রেসন পদক, ১৮৯৪

৪. অর্ডার অফ রাজপুত্র প্রথম দানিলো, ১৮৯৫

৫. এডিসন পদক, ১৯১৬

৬. অর্ডার অফ সেন্ট সাভা, প্রথম শ্রেণি, যুগোস্লাভিয়া, ১৯২৬

৭. জন স্কট পদক, ১৯৩৪ 

৮. অর্ডার অফ হোয়াইট ঈগল, প্রথম শ্রেণি, যুগোস্লাভিয়া, ১৯৩৬

৯. অর্ডার অফ হোয়াইট লায়ন, প্রথম শ্রেণি, চেকোস্লোভাকিয়া, ১৯৩৭

১০. প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় পদক, ১৯৩৭

১১. বুলগেরিয়ার সেন্ট ক্লিমেন্ট অফ অকরিডা পদক, ১৯৩৯

তিনি আসলে কাজ পাগল ছিলেন। তিনি তার কাজকে এতটাই ভালবাসতেন যে তিনি দাবি করতেন যে তিনি মাত্র ২ ঘন্টা ঘুমাতেন! মাঝে মাঝে অবশ্য ঝিমাতেন, বলতেন যে এটা তাঁর কাছে ব্যাটারির রিচার্জের মত। আর তাঁর এমন কাজ কর্মের জন্যই তিনি ‘ম্যাড সায়েন্টিস’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাকে বিজ্ঞানীরা ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ক্ষ্যাপাটে বা পাগলা বিজ্ঞানী’ বলে আখ্যায়িত করেন।

শেষ বয়সে এসে তিনি অদ্ভুত এক শখের পাল্লায় পড়েন। তিনি কবুতরের প্রতি আসক্ত হন। একবার তো এক কবুতরকে সুস্থ করতে তিনি ২০০০ ডলার পর্যন্ত ব্যয় করেন! 

আমরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছি যে নিকোলা টেসলা কতকিছু করেছেন আমাদের জন্য। কিন্তু আমরা তাঁকে যথাযথভাবে শ্রদ্ধাও করতে পারি নি। যদিও তার জন্য ১০ই জুলাই আন্তর্জাতিক টেসলা দিবস পালিত হয় তবুও তাঁর অবদান অনুযায়ী অনেক কম পেয়েছেন তিনি। সারা জীবন তো তিনি দরিদ্রতার মাঝেই কাটিয়েছেন। শেষের দিনগুলি তাই খরচ কমাতে সস্তা হোটেলে থেকেছেন। এমন একটি হোটেলের ৩৩৭৭ নম্বার রুমে ১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর সমস্ত সম্পত্তি আমেরিকান সরকার জব্দ করেছিল এই আশংকায় যদি তিনি বিপদজনক কিছু নিয়ে কাজ করেন। তবে বিপদজনক কিছু পাওয়া যায় নি। 

টেসলাকে নিয়ে অনেক বই রচিত হয়েছে। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হল:

Nina of Arabia by Marina Bulatovic

Tesla by Milovan Matic

Tesla the Wizard of Electricity by David Kent

Wizard – The Life and Times of Nikola Tesla,Biography of a Genius by Mark Seifer

আরও পড়ুন: মেরি কুরি – তেজস্ক্রিয়তায় প্রাণ গেলো যার

ফিচার চিত্রসূত্র: Pixabay

তথ্যসূত্র: 

১. Teslasociety 
২. History
৩. Biography 
৪. Britannica 
৫. Teslasciencefoundation 
৬. Encyclopedia
৭। Forbes 
8. Teslauniverse 

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on নিকোলা টেসলা: পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কিন্তু অবহেলিত এক প্রকৌশলী

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!