নারীরা কেন ইসলামের দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী হচ্ছে?

4.9
(8)
Bookmark

No account yet? Register

পশ্চিমা মিডিয়ার ঐতিহাসিক ইসলামবিরোধী ভূমিকাকে হিসেবের বাইরে রাখলেও, নাইন ইলেভেন পরবর্তী বিশ্বে পশ্চিমা মিডিয়ায় ইসলাম পরিচিত হয়েছে প্রধানত সন্ত্রাসী, আগ্রাসী একটি ধর্ম হিসেবে। মূলত যুদ্ধ, সহিংসতা, নারী অধিকার ইত্যাদি প্রসঙ্গ ছিল সমালোচনার মূল বিষয়বস্তু। যেখানে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হতো যে, ইসলাম নারীকে তাঁর প্রাপ্য স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে পুরুষের অধীন করে রেখেছে, ইসলাম একটি পুরুষবাদী ধর্ম। এইসব নেতিবাচক প্রচারণা সত্ত্বেও পশ্চিমা নারীদের মাঝে ইসলাম নিয়ে আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে৷ কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির দেয়া তথ্যমতে, এই শতকের প্রথম দশকে ব্রিটেনের নতুন ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে (যার অনুমিত সংখ্যা একলক্ষ) এক তৃতীয়াংশই হচ্ছেন নারী। ডিসকভার ইসলাম ইন্টারন্যাশনালের প্রদত্ত তথ্যও এই হিসেবের কাছাকাছি। আর এই বাস্তবতা কেবল ব্রিটেন আমেরিকা নয়, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম, সুইডেন সহ এশিয়ার হংক-শ্রীলংকাতেও৷  

অসামান্যতে লিখুন

মিডিয়ায় ইসলামকে পুরুষতান্ত্রিক অত্যাচারী ধর্ম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার এই মহড়ার মাঝেও নারীদের এই বিপুল আগ্রহ সত্যিই লক্ষ্যণীয়। এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাতারি সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও ব্রিজস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে একটি ডকুমেন্টারি প্রচারিত হয় ইসলাম ইন উইমেন শিরোনামে। যা উপস্থাপনা করেন মিশরিয় স্কলার ফাদেল সোলাইমান। আমাদের আজকের নিবন্ধ সেই ডকুমেন্টারি অবলম্বনে রচিত৷  

ফাদেল সোলাইমান
ফাদেল সোলাইমান, মিশর। ছবি ফেসবুক

ইসলামের প্রতি আগ্রহী হওয়ার কারণ

যে কোন একটি ঘটনা সংঘটনের পেছনে বাহ্যিক নানান কারণ, তথ্য উপাত্তের যোগ থাকলেও মূল যে কারণটিকে আমরা নির্দেশ করতে চাই, সেটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক ইশারা। একটি বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রায় সকল মানুষ যে ধরনের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠছে তার মধ্য থেকে গুটিকয়েক সেই ধারা থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভিন্ন রকম চিন্তা করা, আজীবন লালিত বিশ্বাস ছেড়ে আসা, এটি কোন সাধারণ ঘটনা নয়। একটি বিশেষ ঘটনা, একটি আন্তরিক চাহিদা মানুষকে সেই জটিল ও কঠিন পথটি পাড়ি দিতে উৎসাহিত করে। যে কজন নওমুসলিমের কথা এখানে উঠে এসেছে, তাদের প্রায় সকলেই এই বিশেষ হৃদয়বৃত্তির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আমেরিকান স্কুল-শিক্ষক অ্যাম্বার অ্যাকুস্তার মতে, ইসলাম কেউ গ্রহণ করতে পারে না। এটি তার ভেতরেই থাকে, কেবল আবিষ্কার করতে হয়।

বেলজিয়ান কনভার্টেড মুসলিম আজিজা তার জীবনের গল্পটি শুরু করেন তাঁর ক্যাথলিক চার্চের প্রতি জন্ম নেয়া অবিশ্বাস থেকে। খৃষ্টধর্মের মৌলিক বিশ্বাস গুলো সম্পর্কে যখন ফাদারদের কাছে আরো বিস্তারিত জানতে চাইতেন, তাদের বক্তব্য ছিল কেবল, বিশ্বাস করে যাও, বিশ্বাস করে যাও। তাঁর ভাষায়,

আমি আল্লাহকে অনুসন্ধান করা শুরু করেছিলাম ক্যাথলিক চার্চের বিষয়গুলোতে অনাস্থা চলে আসার পর। যেমন তারা ত্রিত্ববাদ বা এই ধরনের বিষয়ে বলত। তারপর আমি সব ধরনের বইপত্র পড়া শুরু করলাম, এরমধ্যে কোরআনও ছিল। তবে কোরআন পড়া আসলেই কঠিন। এর কিছু কিছু শব্দ গভীর হলেও কোন কোন শব্দ একেবারেই অন্যরকম…কীভাবে বলি…সেই শব্দ গুলো যেন আমাকে আলোকিত করল।

আজিজা

তিনি আরও বলেন, যেমন সূরা রাহমান, কোরআনের এই সূরাটি আমি বহুবার পড়েছি, কিন্তু তার সাথে যোগসূত্র তৈরী করা সম্ভব হয় নি। তবে এটা অনুভব করলাম যে আমাকে কোন একটা পথ অনুসরণ করতে হবে৷ সতেরো বছর বয়সে কোরআন পড়া ছেড়ে আমি ব্রাসেলসে গেলাম, নানা ধরনের কমিউনিটির সাথে মিলিত হলাম, যেমন ইহুদি-খৃষ্টান। এসবই ছিল আমার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। এছাড়া মরোক্কান, বুরুন্ডি, চাইনিজ মুসলিম বন্ধুদের সাথে পরিচিত হলাম৷ যা হোক, আল্লাহ আমাকে দ্বিতীয়বারের মতো কোরআন পড়ার সুযোগ করে দিলেন৷ এবারে আমি আরো বেশি আলোকিত অনুভব করলাম৷ মনে হলো আমি পথ পেয়ে গেছি৷

এই আধ্যত্মিক আহ্বানটি মূল কারণ হলেও এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণ আছে৷ যা একজন ইউরোপীয় নারীকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে। যেমন, নারীত্বের জাগরণ। জার্মান মডেলকন্যা এলিজাবেথ জ্যাকস্টেড তার মডেলিং ক্যারিয়ার শুরু করেন মাত্র পনেরো বছর বয়সে। সৌন্দর্য-পসারিনি এই নারীর জীবনে প্রথম আঘাতটিও এল এই মডেলিং জগত থেকে। তাঁর ভাষায়,

আমি সেদিনটির কথা কখনোই ভুলব না, যেদিন আমাকে বলা হয়েছিল, তারা আমাকে আর মডেলিংয়ে অংশ নিতে দেবে না, কারণ আমার ওজন কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল। আমি অত্যন্ত লজ্জা পেলাম। তাদেরকে আমার শরীর নিয়ে এভাবে কথা বলার অধিকার কে দিয়েছে? আমি তো কোন পণ্য নই, একজন মানুষ। এই বিষয়টি আমি সব বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেই অনুভব করলাম যে তারা নারীত্বকে তাদের পণ্য প্রচারের একটি উপায় হিসেবে গন্য করেছে। আমি তো সেটা হতে চাই না।

এলিজাবেথ জ্যাকস্টেড

এলিজাবেথের এই উপলব্ধির গুরুত্ব আমরা বুঝতে পারব যখন জানব, একজন মানুষ দিনে টেলিভিশন, পত্রিকা বিলবোর্ড মিলিয়ে প্রায় দু হাজার বিজ্ঞাপন দেখে থাকেন। আর এই সব বিজ্ঞাপন কেবল তাদের পণ্যই বিক্রি করে না, সেই সাথে নারীর সাফল্য, নারীত্ব, এই সকল কিছুকেই পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা ঠিক করে দেয় তাদের বিজ্ঞাপনে প্রদর্শিত নারীরা দেখতে কেমন হবে, যদিও সমাজের সকল নারী সেই ধরণের দৈহিক গড়নের নয়। কিন্তু বারবার প্রচারের ফলে মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যের এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে পড়ে। ফলে যে নারী দেখতে যতটা টিভি তারকাদের মত, তিনি সমাজে তত বেশি সম্মান লাভ করেন৷ 

সেই আঘাতটিই এলিজাবেথের জীবনের একটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য কী, গন্তব্য কোথায়! যা একসময় তাঁকে পৌঁছে দেয় ইসলামের সুশীতল বিশ্বাসের ছায়ায়। 

ইসলামের আরেকটি যে বৈশিষ্ট্য ইউরোপীয় নারীদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছে, সেটি হচ্ছে স্বাধীনতা। হল্যান্ডিয়ান ডাক্তার পলিনের ভাষ্যমতে, ইসলাম তাকে আগের জীবনের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। একজন আধুনিক মানুষের যে সব অনৈতিক সামাজিক দায় থাকে সেসব থেকে মুক্ত করে তার নিজের কাজে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে৷ তিনি বলেন, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে এটি সম্পর্কে আমার অনেক ভুল ধারণা ছিল, বিশেষ করে নারী বিষয়ক ধারণাগুলো। আমি ভাবতাম ইসলাম নারীকে নির্দিষ্ট একটি পোষাক পরতে বাধ্য করে, তাকে বাড়ির বাইরে বেরোতে দেয় না, শিক্ষার্জন করতে দেয় না, কাজ করতে দেয় না, তাকে একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না৷ কিন্তু আমি নিজে মুসলিম হওয়ার পর দেখলাম এই বিষয়গুলোর কোনটিই সত্য নয়। বরং ইসলাম আমাকে আরো অনেক স্বাধীনতা দিয়েছে। শুধু  স্বাধীনতাই নয়, মুসলিম নারীরা কাজ করতে পারে, কোম্পানির মালিক হতে পারে, সুখী না হলে স্বামীর কাছ থেকে তালাকও নিতে পারে। বরং বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামত নেয়াকে আবশ্যক করা হয়েছে। আগে যে সমস্ত জিনিস আমাকে বিব্রত করছিল সেগুলোর কোনটিই দেখলাম সত্য নয়। 

পলিন আরও বলেন, মুসলিম নারী হিসেবে আমি যা হতে চাই সেটাই হতে পারি। আমি যা চাই পরতে পারি, কোন হালফ্যাশন দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আমার দেহ বাকি মানুষের চোখের আড়ালে কেবল আমার সম্পত্তি হিসেবে রাখতে পারি। স্লিম থাকা, ফ্যাটি না হওয়া, হাই হিল পরা, নামকরা ব্র্যান্ডের দামী দামী পোষাক পরা, কোন অনুষ্ঠানে অন্যের চেয়ে আলাদা হওয়া ইত্যকার সামাজিক চাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি। অন্যরা আমার সম্পর্কে কী ভাবছে সেটা নিয়ে ভাবার বদলে আমি আমার বাস্তব জীবনে মনোযোগী হতে পারি। আমার পরিবার, কাজ, নিজের প্রতি, আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হতে পারি। আমি মনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ যার ফলে নারীরা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে।

তৃতীয় যে কারণটি নিয়ে ডকুমেন্টারিতে আলোচনা হয়েছে, সেটা হচ্ছে পর্দা। মজার ব্যপার যে পর্দার বিধান নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিষোদগার করা হয়েছে, এমনকি ইসলামের পশ্চাৎপদতার একটি প্রতীক হিসেবে একে উপস্থাপন করা হয়েছে সেই পর্দাই নারীদেরকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করেছে। ব্রিটেনের সিস্টার্স পত্রিকার সম্পাদক ও বহু পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখক নাইমা রবার্ট বলেন, আমি একসময় নারী সমঅধিকারে বিশ্বাসী ছিলাম। সে সময় একবার যখন মিসরে গেলাম, দেখলাম বহু নারী নিজেদের হিজাবে ঢেকে রাখছে৷ এই ব্যাপারটি আমাকে আহত করল। তারপর এক অনুষ্ঠানে আমি একজন নারীকে জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর এই হিজাব পরার কারণ কী? তিনি বললেন, “কেননা আমি চাই লোকেরা আমার কথা, কাজ দ্বারা আমাকে বিচার করুক, আমি দেখতে কেমন সেটি দিয়ে নয়।” আমি জীবনে কখনো এই ধরণের কথা শুনিনি। তার এই কথা আমার জীবনদর্শন, লাইফস্টাইলই পাল্টে দিল। আমি মনে করতাম এইসব নারীরা দুর্বল। কিন্তু তাঁর এই কথায় আমার বুঝে আসল, তিনি সত্যিই পুরুষদের মনোযোগ, তাদের গ্রহণ-বর্জনের পরোয়া করেন না। আমার মনে হলো, আমি দুর্বল, সেই হিজাব আবৃতা নারীই আসলে শক্তিশালী।

ব্রিটেনের সিস্টার্স পত্রিকার সম্পাদক ও বহু পুরষ্কারপ্রাপ্ত নারী লেখক নাইমা রবার্ট
আমি চাই যে কে আমার চেহারা দেখবে আর কে দেখবে না সেই সিদ্ধান্তটি আমার কাছেই থাকুক।’ নাইমা রবার্ট, ইংল্যান্ড। ছবি গুডরিডস

পশ্চিমে নারীবিষয়ক ইসলামের যত সমালোচনা 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলাম সারাবিশ্বে খারাপ মিডিয়ার আক্রমণের শিকার হচ্ছে। মুসলিম বিষয়ক সমস্ত সাহিত্য, সিনেমা তাদের একটি বাজে রূপ মানুষের সামনে তুলে ধরতে সচেষ্ট। আর তা এইজন্য যে, মুসলিম বিষয়ক এই সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মিডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। যখনই কোন নতুন ইস্যু তৈরী হয়, কোন একটা কিছু লড়াই শুরু হয়, নতুন কোন বিপ্লব শুরু হয়, তখনই মিডিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে চাপ তৈরী করে। আর এই দৃশ্য আমরা দেখে আসছি সেই ষোড়শ শতকের প্রাচ্যবিদদের সময় থেকে, যখন ক্রুসেড যুদ্ধে মুসলিম ও খৃষ্টানদের মোকাবিলা হয়েছিল। তারা দর্শকদের মগজে এই চিত্রটিই ঢুকিয়ে দিতে চায়, এবং ইসলামের একটি বাজে রূপ দাঁড় করায়।

এই প্রক্রিয়ায় ‘নারী’ বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ইসলামের নারী বিষয়ক বিধানগুলো, যেমন পর্দা, সম্পত্তির বন্টন, পুরুষের তত্ত্বাবধানে থাকা ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলো সেখানে অত্যন্ত ফলাও করে প্রচার করা হয়। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ডিভাইনিটি স্কুলের প্রফেসর লাইলা আহমাদ বলেন, ইসলাম নারীদের দমন-পীড়ন করে এই ধারণাটি বদ্ধমূল হয়ে গেছে, যদিও এর পেছনে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। এটি কেবলই একটি ধারণা যা মিডিয়ায় বারবার উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক মুসলিম নারী এতে আহত বোধ করেন। তারা যাদের সাথে মিলিত হন, কথা বলেন, তাদের প্রত্যেককেই জানিয়ে দিতে চান যে, তারা মুসলিম। ইসলামধর্ম চর্চা করেন কিন্তু মিডিয়ার এই বদ্ধমূল ধারণাকে গ্রহণ করেন না।

ইসলাম নারী দের দমন-পীড়ন করে এই ধারণাটি বদ্ধমূল হয়ে গেছে, যদিও এর পেছনে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।’ প্রফেসর লাইলা আহমেদ
ইসলাম নারীদের দমন-পীড়ন করে এই ধারণাটি বদ্ধমূল হয়ে গেছে, যদিও এর পেছনে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।’ প্রফেসর লাইলা আহমেদ, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি। মিশর-আমেরিকা। ছবি: রেডক্লিফ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি

তিনি বলেন, যখন নাইন-ইলেভেনের হামলা সংঘটিত হলো তখন টেলিভিশন খোলাই রীতিমতো অসম্ভব ছিল। নাইন ইলেভেনের পরপরই যখন আফগান যুদ্ধ শুরু হলো, সেখানে অসংখ্য বোরকাবৃতা নারীদের দেখা যেত। প্রচার করা হতো যে, এই নারীদের উদ্ধার ও সহায়তা করার জন্য হলেও আমাদের আফগানিস্তানের যাওয়া উচিত৷ বোরকাকে রীতিমতো ইসলামের নারী নির্যাতনের প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। এই তালিকায় অন্যান্য ইসলামী পোষাকও যুক্ত হয়ে পড়ছিল। যদিও আফগান যুদ্ধ একটি রাজনৈতিক ইস্যু, কিন্তু একে বানিয়ে ফেলা হলো ইসলামী দমন-পীড়নের বিপরীত একটি লড়াই। আমি নিশ্চিত যে, মিডিয়ার এই উপস্থাপনা আমেরিকান মুসলিম নারীদের জীবনে আঘাত করেছে৷

পশ্চিমের এই সমালোচনার ভিত্তি হচ্ছে তাদের নিজস্ব জীবনদর্শন। যা কিছু তাদের জীবনদর্শনের সঙ্গে খাপ খায় না সেগুলোকেই মূলত সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করা হয়। যে পর্দার বিধানকে পশ্চিমা সমাজে পশ্চাদপদতা বলে আখ্যায়িত করা হয়, সেটাকেই বহু মুসলিম নারী স্বাধীনতা বলে মনে করেন। হংকংয়ের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরিরত চ্যাং উইং জে তাঁর মুসলিম জীবনে পর্দার ভূমিকা সম্পর্কে বলেন, পর্দা আমাকে এই স্বাধীনতা দিয়েছে যে, আমি নিজেকে একজন নারী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারি। আমি পুরুষদের জন্য পোষাক পরিধান করি না, আমি পোষাক পরি আমার নিজের জন্য, আমার স্বামীর জন্য৷ ইসলাম আমাকে সেই অধিকার দিয়েছে।

আর পর্দাকে পশ্চিমা সংস্কৃতির বিরোধী মনে করার বিষয়টিও একটি বিভ্রান্তিকর প্রসঙ্গ। কেননা যেখানে খৃষ্টান নানদের মাথার স্কার্ফ খোদ পশ্চিমা সমাজে অনুমোদিত, সেখানে হুবহু একই পোষাক কোন মুসলিম নারী নিজ পছন্দের কারণে পরতে না পারা, জরিমানার শিকার হওয়া একটি রাষ্ট্রীয় অন্যায়। 

আরও পড়ুন: মহানবি (ﷺ) এর জীবনের শেষ দিনগুলোর ধারাবাহিক ঘটনাপঞ্জি

যখন থেকে এই প্রবণতা শুরু হলো

ইসলাম ধর্মের নারীদর্শনকে সমলোচনার লক্ষ্যবস্তু বানানোর এই প্রক্রিয়া শুরু হয় গত উনিশ শতকের শেষদিক থেকে, যা ভারতে ও মিসরে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্যবাদীরা কেবল ইসলামকে নারীর জন্য হুমকি মনে করত না, বরং যা কিছু সাদা ও বৃটিশ নয় তাকেই নারী নির্যাতক মনে করত। কলোনিগুলোতে তাদের শাসন থাকার পক্ষে জাস্টিফিকেশান হিসেবে তারা এই ধারণাকে ব্যবহার করত যে বৃটিশ জীবন যাপনের পদ্ধতি ইসলামী জীবন যাপনের পদ্ধতি থেকে উন্নত। 

উনিশ শতকের শেষদিক থেকে তারা এই ধারণাটি প্রচার করা শুরু করল যে, পর্দা হচ্ছে ইসলামের পশ্চাদপদতার প্রমাণ, যদিও কায়রোর ইহুদি, খৃষ্টান, মুসলিম সকল ধর্মের নারীরাই হিজাব ব্যবহার করত। ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত কাসেম আমিন ১৮৯৯ সালে একটি বই প্রকাশ করেন। যিনি প্যারিসে পড়াশোনার সময় ফ্রেঞ্চদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এবং মিসরের বৃটিশ শাসকদের সাথেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। কাসেম আমিন তার বইয়ে হিজাব বাতিল করার দাবী জানান, কেননা এর ফলে তার ধারণা ছিল কেবল নারীর উন্নতি নয় দেশেরও অগ্রগতি হবে। এই ধারণাটি মিসরের শাসকশ্রেণীর মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে পড়ল। এটিই সেই ঐতিহাসিক কারণ, যার ফলে আমাদের গত শতকের আধুনিক শিক্ষিত মায়েরা হিজাব পরতেন না। কেননা তারা তৈরী হয়েছিলেন বৃটিশ সাম্রাজ্যেবাদের কোলে। তারা বিশ্বাস করতেন হিজাব হচ্ছে নারীদের অবদমনের প্রতীক, তাই এটি পরা তাদের জন্য জরুরী নয়। 

আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশা আদ দসুকি বলেন, নারীকে দেখার দুটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে। যার একটিকে বলা হয় সেক্যুলার ফেমিনিজম। এটা মূলত ধর্মহীন লিঙ্গবাদী নারীবাদ। আর অন্য আরেকটি হচ্ছে ইক্যুইটি ফেমিনিজম। প্রথমটি নারীকে একটি পৃথক অস্তিত্ব হিসেবে দেখে। তারা হচ্ছে হীনবীর্য, লিঙ্গের কারণে লজ্জিত। আর তারা চায় যে তারা যে কোন কিছুই করতে পারবে, চাই সেটা নারী প্রকৃতির বিরোধী হোক।

আর ইক্যুয়িটি ফেমিনিজম অনেকটা ইসলামের নারী চিন্তার নিকটবর্তী। তাদের দাবীগুলোর অনেকগুলো ইসলাম ১৫০০ বছর আগেই নারীকে দিয়ে রেখেছে। আমরা নারীকে পরিবারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। যখন আল্লাহ আদম (আ.) সৃষ্টি করেছেন, তখন হাওয়াকেও সৃষ্টি করেছেন। তাদের থেকে নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি হয়েছে৷ তাই শুরু থেকেই নারী পরিবারের একটি অংশ। নারী কোন ভিন্ন একটি অস্তিত্ব নয়।

রাশা আদ দসুকি
শুরু থেকেই নারী পরিবারের একটি অংশ। নারী কোন ভিন্ন একটি অস্তিত্ব নয়। - ড. রাশা আদ দসুকী।
‘শুরু থেকেই নারী পরিবারের একটি অংশ। নারী কোন ভিন্ন একটি অস্তিত্ব নয়।’ ড. রাশা আদ দসুকী। জামেয়া আল আজহার। মিশর। ছবি: রিসার্চ সেন্টার ফর ইসলামিক লেজিসলেশন এন্ড ইথিকস

মুসলিম নারীদের দৃষ্টিতে পর্দা 

পশ্চিমা দর্শনের বিপরীতে সেখানের মুসলিম নারীরা পর্দার নিজস্ব ব্যাখ্যা ও দর্শন তৈরী করে নিয়েছেন, যা হিজাবকে একই সঙ্গে তাদের পরিচয় ও আত্মবিশ্বাস উভয়ের কারণ হয়েছে। সিস্টার্স পত্রিকার সম্পাদক নাইমা রবার্ট বলেন, সত্যি বলতে এটি আমাকে মুগ্ধ করেছে, প্রাইভেসির এই ধারণাটি আমার পছন্দ হয়েছে যে, আমার চেহারা যে কারো দেখার জন্য খোলা রইল না। আমি চাই যে কে আমার চেহারা দেখবে আর কে দেখবে না সেই সিদ্ধান্তটি আমার কাছেই থাকুক।

পশ্চিমা সমাজ-বাস্তবতায় পর্দার ধারণাটি ঠিক পরিষ্কার নয়। সেখানে পর্দা বিষয়ে নানান ধারণা প্রচলিত আছে। তারা বুঝতে পারে না, এটি কেবল মাথায় এক টুকরা কাপড় দেওয়া নয়, এটি একটি সম্মানের প্রতীক। কেননা মুসলিমরা মনে করে নারীরা হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তারা কোন দৈহিক বা যৌন বস্তু নয়। এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের একটি প্রতীক। একজন নারীর ভেতর থেকে পর্দার তাগিদ কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার ধারণা থেকেই সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো নারীর ধারণা তো এই যে, তারা হিজাব পরার পর অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস অনুভব করেন। এর কারণ হচ্ছে, একজন হিজাবী নারীকে পুরুষরা দৈহিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে না। তার কথা বলা, অনুধাবনশক্তি, ব্যবহার, চিন্তাধারা তখন গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। 

কেবল ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত কারণেই নয়, সামাজিক নানা বাস্তবতায় নারীদের মধ্যে হিজাব ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। আর এটি যে কেবল অমুসলিম দেশগুলোতে তেমনটা নয়, খোদ মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিজাব আবৃত নারীদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আরববসন্তের সময়ে মিডিয়ায় যে নারীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে তাদের একটি বিপুল অংশ ছিলেন সচেতন, শিক্ষিত এবং পর্দাশীল। এই প্রসঙ্গে প্রফেসর লাইলা আহমাদ বলেন, আমি নব্বই দশকের মাঝামাঝি এই প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম—তখনও আমেরিকায় হিজাব অত্যন্ত বিরল একটি বস্তু—কেন মুসলিমরা আমেরিকায় হিজাব পরবে, আমি তো সেই ৫০ বছর আগে মিশরেই হিজাব পরিনি৷ এর মানে তো এই নয় যে আমরা ইসলামকে পরিত্যাগ করেছি। তাহলে কেন এখন আবার হিজাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাহলে কি এরা উগ্রবাদী, কট্টরপন্থী? 

আমি আমার এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্য মিশরে গেলাম, কেননা মিশর ছিল হিজাব বিরোধী আন্দোলনের উৎস৷ এই অনুসন্ধানে আমি ধর্মীয় বিষয়টিকে আড়ালে রেখে সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভেবেছি। যাদের সঙ্গে আমি হিজাব বিষয়ে কথা বলেছি তারা বলেছে, সামাজিক অবক্ষয়ের বিপরীতে এটি তাদের জন্য এক ধরনের অহংকার। তারা বঞ্চনার শিকার হয়েছে,  এখন তারা নতুন একটি সমাজ গড়তে চায়, নারীদেরকে তাদের অধিকার পাইয়ে দিতে চায়। তাদের এখন বাইরে গিয়ে কাজ করার অধিকার আছে। আগে নারীরা পুরুষদের সাথে অফিসে কাজ করছে এটি একটি বিরল দৃশ্য ছিল। কিন্তু এখন হিজাব পরার মাধ্যমে তারা বলতে পারছে, আমরা ইসলাম ধর্ম মতে পর্দা করেছি, এখন আর আমাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত করতে পারবে না৷

প্রফেসর লাইলা আহমাদ

মোটকথা পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে হিজাব একজন নারীর জন্য বাড়তি একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়, সেখানে মুসলিম বিশ্বে এটি নারীর পক্ষে আলাদা একটি সুবিধা, একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরী করে। 

শেষকথা 

আধুনিক এই সময়ে এসে মানুষকে কেবল মিডিয়ার বাঁধা ছকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। ইন্টারনেটের সহায়তায় যে কেউই মিডিয়ার বাঁধাধরা বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন। ইসলাম বিরোধিতায় সমগ্র পশ্চিমা মিডিয়ার এই গাঁটছাড়া বাধা সচেতন মানুষকে আরও সচেতন করে তুলছে। যার ফলে তারা বুঝে উঠতে পারছেন অনবরত মিথ্যাচারের আড়ালে একটি বিরাট সত্যকে কীভাবে লুকিয়ে ফেলা হচ্ছে। কী করে স্বাধীনতা পরিণত হচ্ছে জুলুমে, উদারতার বুলিতে ভুলিয়ে দেয়া হচ্ছে শালীনতা, সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে ন্যায়। সেই সঙ্গে হৃদয়ের স্ফুলিঙ্গের সাথে ঐশী বাণীর সংযোগ ঘটছে যাদের, তারাই এসে হাজির হচ্ছেন এই বিশ্বাসের পাটাতনে।

পুরো ডকুমেন্টারি দেখতে ক্লিক করুন এখানে
প্রচ্ছদ সূত্র:
থিংক উইথ গুগল

আশুলিয়া, ঢাকা
০৭.১১.২০২০

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
2 Thoughts on নারীরা কেন ইসলামের দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী হচ্ছে?
    Saad uddin
    14 Nov 2020
    8:36pm

    তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধ। এই লেখাটিও কোন নারীকে অাকৃষ্ট করতে পারে ইসলামের দিকে।

    5
    0
    এন মাহমুদ
    14 Nov 2020
    10:38pm

    অসাধারণ লিখেছেন।

    2
    0

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!