নানচিং গণহত্যা

নানচিং গণহত্যা: মানবতার চরম ভুলুণ্ঠন, পর্ব ২ – মূল অপরাধযজ্ঞ

রাহাত হোসেন
4.5
(8)
Bookmark

No account yet? Register

নানচিং গণহত্যার ইতিহাস আলোচনার এই সিরিজের প্রথম পর্বে জাপান এবং চীনের মাঝে ঐতিহাসিক শত্রুতা,  দ্বিতীয় সাইনো – জাপানিজ যুদ্ধের পটভূমি এবং তদসংশ্লিষ্ট নানচিং গণহত্যার সূচনার কথা আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে এখানে এই গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী পর্বে এই গণহত্যার সমাপ্তি এবং পরবর্তী প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। 

অসামান্যতে লিখুন

জাপান এমনিতেই চীনকে দুর্বল ভেবে আসতো সবসময়। তার ওপর জাপানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করা মানে খুবই জঘন্য একটা ব্যাপার, ওরা প্রাণ দিয়ে দিবে তাও আত্মসমর্পণ করবে না (ইউরোপীয় দেশসমূহতে যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে আত্মসমর্পনের হার ১:৩, কিন্তু জাপানে এই হার ১:১২০)। এই যুদ্ধবন্দিদের সবাইকে মেরে ফেলার বর্বর আদেশ দেওয়া হয়!

নানচিং যেন এক নির্মম কসাইখানা 

রণনীতি অনুসারে যুদ্ধবন্দিদের বিনা বিচারে হত্যা করা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ। কিন্তু খাদ্যসংকটের যুক্তি দেখিয়ে ইয়াংজি নদীর কিনারায় সবাইকে হাত বেঁধে নিয়ে আসা হয়, আশ্বাস দেওয়া হয় যে, কিছু করা হবে না। চার কলামে ভাগ করে গুলি করা শুরু করে ইমপেরিয়াল সৈন্য। ধারণা অনুসারে প্রায় ৩৮,০০০ থেকে ৪২,০০০ যুদ্ধবন্দিদের হত্যা করা হয়। ইয়াংজি নদী রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। এমনকি এত মৃতদেহ নিয়েও বিপাকে পরে যায় জাপানি সৈন্যবাহিনী। নাকাজিমা তার ডায়েরিতে অভিযোগ করে লিখেছিলেন,

দেহ দাফনের জন্য এত বড় গর্ত পাওয়াও কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছিলো

ছবি: যুদ্ধবন্দিদের হত্যা করা হচ্ছে, সূত্র – Wikimedia Commons
ছবি: ইয়াংজির তীরে মৃতদেহ; সূত্র – Wikimedia Commons

ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ। প্রতিরক্ষাহীন নানচিং এর সব সরকারি ভবন, ব্যাংক দখল করে ফেলেছে জাপানি ইমপেরিয়াল বাহিনী। স্থানীয়রা ভেবেছিলো, হয়তো একটু মায়া-দয়া দেখাবে জাপানিরা তাদের প্রতি। 

কিন্তু Devil’s Army নামে খ্যাত জাপানিরা নির্বিচারে মানুষ মারা শুরু করে দেয়। শহরের প্রতিটা মোড়ে, রাস্তায় কাউকে দেখলেই মেশিনগান, রিভলবার তাক করে ফেলে; যখন খুশি, যাকে খুশি। রাস্তায় রাস্তায় পরে থাকে গোঙাতে থাকা বৃদ্ধ, মহিলা এমনকি বাচ্চাদের দেহ। 

ইচ্ছামাফিক খুন 

বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করা শুরু করে জাপানিরা। যখন যাকে খুশি মেরে ফেলার মত উন্মত্ত নেশা চড়ে তাদের মাথায়। মদদ দিতে থাকে স্বয়ং তাদের মিলিটারি কমান্ডারেরাই। কোন যুবক দেখলেই তাকে সৈন্য সন্দেহে ধরে নিয়ে যাওয়া হত, মেরে ফেলা হতো নির্দ্বিধায়। কোনো বৃদ্ধা বা শিশুও ছাড় পায়নি এই নৃশংসতা থেকে। এমনকি ডিসেম্বরের শেষের ১০ দিন মোটরসাইকেলে রাইফেল নিয়ে জাপানিরা নানচিং ঘুরে বেড়ায়। লুটতরাজ এবং  হত্যার নেশায় মেতে উঠে। বলা হয়, ইয়াংজি নদীর রং লাল হয়ে গেছিলো, শহরের সব জলাশয় মানুষের কংকালে ভর্তি হয়ে গেছিলো। 

ছবি: ধর্ষণের পর হত্যা করে ফেলে রাখা মৃতদেহ,সূত্র – Wikimedia Commons
ছবি:  সংবাদপত্রের হেডলাইন; ফলাও করে প্রচার করা হয় ১০০ জন চৈনিক হত্যা করার প্রতিযোগিতার কথা। সূত্র – Wikimedia Commons

যেন মৃত্যুক্ষুধা ভর করেছিলো জাপানি সৈন্যদের। ১০-১২ জনের গ্রুপে ঘুরে বেড়াতো শহর। যাকে খুশি তাকে গুলি করতো। 

আরও পড়ুন: জিপসি মেয়ে: তুর্কি মোজাইক শহর জেওগমার মোনালিসা

ট্যাং, বেঁচে যাওয়া অত্যন্ত ভাগ্যবান এক ব্যক্তি তার দুঃসহ এক স্মৃতি বলে গিয়েছিলেন। অনেক স্থানীয় চীনাদের সাথে তাকেও ধরে নিয়ে গেছিলো জাপানিরা। তারপর শুরু হয় এক বিভৎস কাজ। তরবারির কোপে বন্দিদের মাথা বিচ্ছিন্ন করার প্রতিযোগিতা শুরু করে জাপানিরা। বন্দিদের এজন্য গ্রুপে ভাগ করা হয়। একটি গ্রুপকে মেরে ফেলার পর পরের গ্রুপকে বলা হত মৃতদের মাথাগুলো জড়ো করতে। পরে তাদেরও মেরে ফেলা হত, তাদের মাথা জড়ো করতো পরের গ্রুপ। সেদিন ভাগ্য সহায় ছিলো বর্ণনাকারীর ওপর। দুঃসহ এক স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর বিনিময়ে বেঁচে যান তিনি। 

সেদিন ট্যাং যার সাক্ষী হয়েছিলেন তা সেটি আদতে ছিলো আরো বিভৎস এক ঘটনা। দুইজন জাপানি অফিসার Toshiaki Mukai এবং Tsuyoshi Noda নিজেদের মনোরঞ্জনের জন্য একটা প্রতিযোগিতা করে। প্রতিযোগিতাটি ছিলো কে সবার আগে তরবারি দিয়ে ১০০ জনের শিরশ্ছেদ করতে পারে। জাপানি এক পত্রিকা ফলাওভাবে এই প্রতিযোগিতার কথা প্রচার করে। এ যেন কি বীরত্ব! এমনকি ১০০ এর বেশি হত্যার পর যখন তারা ফলাফল বুঝতে পারে না, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় ১৫০টি মাথা ভূপাতিত করার! 

ছবি: মৃতের স্তুপ, সূত্র – Wikimedia Commons
ছবি: জীবন্ত কবর দেওয়া হচ্ছে, সূত্র – Wikimedia Commons

আরও কি কি করেছিলো জাপানিরা? এই প্রশ্ন করলে উত্তরের তালিকাটা বিশাল। 

জাপানিদের অনেকগুলো কাজের মধ্যে একটি ছিল জীবন্ত কবর দেওয়া। ধরে বেঁধে জীবন্ত মানুষগুলোকে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হত। এমনকি তরবারি বা ঘোড়া চালানো হত তাদের ওপর। বেয়নেট, ছুঁড়ি কিংবা তরবারির আঘাতে বিবর্ণ করে দেওয়া হত বন্দিদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। রিপোর্টে অন্তত হাজারজনকে পাওয়া যায় যাদের চোখ ছুঁড়ি দিয়ে তুলে ফেলা হয়েছিলো এবং নাক-কান তুলে ফেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিলো। এদের অনেকগুলো করা হয়েছিল তাও আবার বেয়নেট চালানোর প্রশিক্ষণ হিসেবে। 

Zhuizi নামক সুই ব্যবহার করে চোখ মুখ ফুঁটো করে দেওয়া হত। নিজেদের বিনোদনের জন্য চীনাদের জড়ো করে আগুনে পুড়িয়ে ফেলার মত কাজও করতো জাপানি সৈনিকেরা। মানুষের স্তূপ বানিয়ে তাতে গ্যাসোলিন ঢেলে গুলি করা হতো। চোখের সামনে পুড়তো সেই স্তূপ। কুকুর দিয়ে কামড়িয়েও মানুষকে মারা হয়। 

একজন জাপানিজ রিপোর্টারের ইনভেস্টিগেশনে বেড়িয়ে আসে এক জাপানি সৈনিকের বন্দীদের হার্ট আর লিভার খাওয়ার কথা। শুনলে মনে হয় যেনো এই শহরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন বিধাতা। দুঃস্বপ্নের এই নগরীতে এইসব তাণ্ডব চলতে থাকে ছয় সপ্তাহ ব্যাপী। 

ধর্ষণ 

উন্মত্ত এই নরপশুদের নজর মেয়েদের উপরও পড়েছিলো। নানচিংকে তারা অবাধ ধর্ষণের মহাযজ্ঞে পরিণত করে। জাপানিজ প্রাক্তন সেনাসদস্য তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন,

Woman suffered the most, no matter how young or old, they all could not escape the fate of being raped.

জাপানি সৈন্যরা ধর্ষণ সংক্রান্ত যুদ্ধ আইনের তোয়াক্কাই করেনি। মিলিটারির উচ্চপদস্থরাও এতে আরো উৎসাহ দেন। এমনকি অনেকের দাবি ছিলো কুমারী ধর্ষণ করে যুদ্ধে বল বাড়ে। বহির্বিশ্বে এসব ঘটনাকে কৌশলে পতিতাবৃত্তি কিংবা Comfort Women পেশার নামে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে জাপান। ধর্ষণের পর হত্যা করা হত বেশিরভাগ মেয়েদের। Takokoro Kozo নামের জাপানি এক সৈনিক লিখেছিলেন,

After raping, we used to kill them. Those women would start to free once we let them go. Then we would ‘bang!’ shoot them in the back to finish them up.

এবং তাদের এসব নিয়ে কোন অপরাধবোধও ছিলো না। Kozo আরো লিখেছিলেন

But when we killed her, we just thought of her as something like a pig.

নানচিং এ ধর্ষনের ঘটনা পৃথিবীর সর্ববৃহত ধর্ষণের ঘটনাগুলোর একটা। ‘Against Our Will: Men, Women and Rape’ এর লেখিকা Susan Brownmiller দাবী করেছিলেন, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে পাকিস্তানী বাহিনীদের ধর্ষণের ঘটনার পর নানচিং এর ধর্ষণই সবচেয়ে বৃহৎ আকারের ধর্ষণের ঘটনা। আমেরিকান মিশনারির হিসেবে প্রতিরাতে গড়ে ১০০০ ধর্ষণের ঘটনা ঘটতো। তবে সর্বমোট কতজন ধর্ষণের স্বীকার হয়েছিলেন, তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না। সংখ্যাটা ২০,০০০ থেকে ৮০,০০০ এর মধ্যে। 

এই অনিশ্চয়তার কারণ ধর্ষণের স্বীকার অনেকে এটা প্রকাশ করতে চাননি। ধর্ষণের কারণে জন্মানো অনেক শিশুকে গোপনে মেরেও ফেলা হয়। অনেক নারী আত্মহত্যা করেন। এই বিষয় এতটাই সংবেদনশীল যে ঠিকভাবে গবেষণাও করা হয়নি।

ইমপেরিয়াল সৈন্যরা কোন বয়সী নারীকে বাদ দেয়নি। ছোটো শিশু থেকে বয়ষ্ক মহিলা, বাদ যায় নি কেউ। মেয়ের সন্ধানে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হত। পরিবারের লোকদের সামনেই ধর্ষণ করা হত নারীদের। বিদ্যালয়, বাজার, রাস্তাঘাট সব জায়গায় ধর্ষণের আশায় ওৎ পেতে থাকতো সৈন্যরা। Dagong Daily পত্রিকা লিখেছিলো,

Every day, twenty four hours a day, there was not one hour when an innocent woman was not being dragged off somewhere by a japanese soldier.

বৃদ্ধাদের জোড়পূর্বক সঙ্গমে বাধ্য করা হত। শিশুদের জন্য তা ছিলো আরো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ধর্ষণের পর অনেক শিশু সপ্তাহের জন্য হাঁটতে পারতো না, অনেকে মারা যেত। 

প্রত্যক্ষদর্শী একজন বলেছিলো যে এক দশ বছর বয়সের শিশুকে রাস্তায় ধর্ষণের পরে শিরশ্ছেদ করে চলে যায় জাপানি সৈন্যবাহিনী। অনেক শিশুদের যোনিপথ কেটে বড় করতো অনেক সেনা। গর্ভবতী নারীরাও নিস্তার পায় নি। ধর্ষণের পর অনেক গর্ভবতী নারীর পেটে বেয়নেট চালানো হত, অপরিপক্ব শিশুকে (Fetus) মেরে ফেলে আনন্দ করতো সৈন্যরা।

চলবে … … …

তথ্যসূত্র:

ফিচার ইমেজ: নানকিং ম্যাসাকার মেমরিয়াল হল। সূত্র: Wsimag

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on নানচিং গণহত্যা: মানবতার চরম ভুলুণ্ঠন, পর্ব ২ – মূল অপরাধযজ্ঞ

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!