final lebanon

দ্য প্রফেট: একজন মহাপুরুষের উপদেশনামা

মো. তায়্যেবুল ইসলাম শোভন
Latest posts by মো. তায়্যেবুল ইসলাম শোভন (see all)
3.8
(13)
Bookmark

No account yet? Register

দ্য প্রফেট বিখ্যাত লেবাননীয় লেখক কাহলিল জিবরান রচিত প্রজল্পিত এক রচনা, আজ থেকে সাতানব্বই বছর পূর্বে যার আবির্ভূতি। ঢাকার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় গেলে এ বইয়ের সুখপাঠ্য ও অপাঠ্য—দুই ধরনেরই ভূরিভূূূরি অনুবাদ মেলে।

অসামান্যতে লিখুন

চরিত্র এবং প্রেক্ষাপট

দ্য প্রফেট গ্রন্থে কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন মহাপুরুষ, যাঁর নাম আল মুস্তফা। তিনি অজানা এক দেশ থেকে এসে দীর্ঘ বারোটি বছর অর্ফালিস নগরীতে অবস্থান করেছেন এবং মিশন শেষে তাঁর ডাক এসেছে মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার। এজন্য তিনি ইনতেজ়ার করছিলেন জাহাজের জন্য। 

এক সময় তিনি দেখলেন অত্যাসন্নতার শেষ ঘটিয়ে কুয়াশার চাদর ভেদ করে তাঁর কাঙ্ক্ষিত জাহাজ ছুটে আসছে বন্দরের পানে। জাহাজ দেখে আল মুস্তফা স্বভাবতই উদ্বেলিত। ভাবাবেগে শুধু তিনিই উদ্বেলিত নন, প্রিয় মানুষটিকে বিদায় জানাতে অর্ফালিসবাসীরও হৃদয় ছিঁড়ে যাচ্ছে। কারণ এই ১২ বছর তাদের সাথে কাটাতে গিয়ে আল মুস্তফা হয়ে উঠেছেন এদের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের অন্যতম, প্রিয়র চেয়েও প্রিয় মানুষ—তাইতো মুস্তফাকে বিদায় জানাতে নগরবাসী জটলা করেছে বন্দরে। বিদায়লগ্নে আল মুস্তফা অর্ফালিস নগরীর লোকেদের উদ্দেশে একটি ভাষণ দেন আর তাঁর এই শেষ হিতকথামালা নিয়েই গড়ে উঠেছে দ্য প্রফেট গ্রন্থের কাব্যভূমি।

দ্য প্রফেট এর একটি বঙ্গানুবাদের প্রচ্ছদ
দ্য প্রফেট-এর একটি বঙ্গানুবাদের প্রচ্ছদ। চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

বিষয়বস্তু

দ্য প্রফেট গ্রন্থটি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মোট ২৮ টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত। যা প্রতিটি অনুচ্ছেদে রয়েছে কাব্যিক ঢঙে জীবনের নানাদিকের দার্শনিক উপস্থাপনা। আল-মিৎরা নামক জনৈক নারীর ভালোবাসা বিষয়ক প্রশ্নের মাধ্যমেই মূলত শুরু দ্য প্রফেটের উপদেশনামা। একে নগরের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষেরা তাদের বিভিন্ন প্রাত্যহিক, জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং আল মুস্তফা সস্নেহে তাদের সবগুলো প্রশ্নের উত্তর এবং উপদেশ প্রদান করেন, যা সকলেরই হৃদয়গ্রাহী হয়।

দ্য প্রফেট বইয়ের অনুচ্ছেদ সমূহ হলো জাহাজের দৃশ্যপট, ভালোবাসা বিষয়ে উত্তর, বিবাহ বিষয়ে অভিজ্ঞান, শিশুদের বিষয়ে, দানের মহিমা বিষয়ে, খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে, কর্তব্য ও কাজের বিষয়ে, আনন্দ-বেদনা বিষয়ে, ঘর-বাড়ি বিষয়ে, বস্ত্র বা পরিচ্ছদ বিষয়ে, ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে, অপরাধ ও শাস্তি সম্পর্কে, আইন বিষয়ে, স্বাধীনতা বা মুক্তি সম্পর্কে, যুক্তি ও আবেগ সম্বন্ধে, দুঃখ-বেদনা সম্পর্কে, আত্মজ্ঞান সম্পর্কে, শিক্ষণ বিষয়ে, বন্ধুত্ব সম্পর্কে, কথা বলা বিষয়ে, কাল বা সময় সম্পর্কে, ভালো ও মন্দ সম্পর্কে, প্রার্থনা সম্পর্কে, আনন্দ-সম্ভোগ সম্পর্কে, সৌন্দর্য সম্পর্কে, ধর্ম বিষয়ে, নিয়তি বা মৃত্যু সম্পর্কে এবং বিদায় বাণী।

দ্য প্রফেট এর লেখক কাহলিল জিবরান
কাহলিল জিবরান। চিত্রসূত্র: উইকিপিডিয়া কমন্স

বিখ্যাত বক্তব্য এবং বাণী

ভালোবাসা নিয়ে আল মুস্তফার বক্তব্য ছিলো

ভালোবাসাকে তুমি পথ দেখাবে এমনটা ভেবো না, বরং ভালোবাসা যদি তোমাকে যথার্থ মনে করে; তবে সে-ই তোমায় পথ দেখাবে।

তিনি আরও বলেন,

ভালোবাসার নিজের বলতে কিছুই নেই এবং সেও কারো নয়। ভালোবাসার জন্য ভালোবাসাই যথেষ্ট।

বিয়ে প্রসঙ্গে তাঁর উপদেশ,

তোমরা একে অপরের সাথে গান গাও, নৃত্য করো এবং আনন্দ করো, তথাপি পরস্পর থাকবে স্বতন্ত্র। বীণার তারাগুলো যেমন প্রতিটি স্বতন্ত্র থেকে একই সুমধুর সুরে শিহরিত হয়।

সন্তান সম্পর্কে তার বক্তব্য,

তাঁদের তুমি ভালোবাসা দিতে পারো, কিন্তু ভাবনাগুলো না। কারণ তাঁদেরও রয়েছে নিজস্ব ভাবনা।

সুখ ও দুঃখ সম্পর্কে বক্তব্য,

তাঁরা অবিচ্ছেদ্য এবং একইসাথে তোমার কাছে আসে। তুমি যখন এদের একজনের সাথে বসে গল্প করছো; অপরজন তখন তোমার বিছানায় শায়িত।

মৃত্যু সম্পর্কে বাণী,

তোমার যদি মৃত্যুর প্রকৃত স্বরূপ দেখতে চাও, তবে জীবনের সামনে উন্মুক্ত করে দাও নিজের হৃদয়। কারণ নদী এবং সমুদ্র যেমন এক, জীবন এবং মৃত্যুও তেমন এক।

কর্ম সম্পর্কে বাণী,

যদি কপালের লিখনকে দুর্ভাগ্য মনে করো, তবে জেনে নাও, ঘাম ছাড়া অন্য কিছু এই দুর্ভাগ্য মুছতে পারবে না।

সৌন্দর্য সম্পর্কে বাণী,

সৌন্দর্য সেইরূপ, যা তুমি চোখ বন্ধ করেও দেখতে পারো। সৌন্দর্য হলো সেই গান, যা তুমি কান বন্ধ করেও শুনতে পারো।

ঈশ্বর সম্পর্কে মর্মকথা,

যদি বিধাতাকে খুঁজতে চাও, তোমার চারপাশেই তাকিয়ে দেখো৷ তিনি তোমার সন্তানদের সাথে খেলায় মগ্ন।

এমনই প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে পরিণতির দিকে ধাবিত হয় ঘটনা। স্বীয় বক্তব্য শেষে প্রস্থানের জন্য পা বাড়ান আল মুস্তফা। অপেক্ষমাণ জাহাজে ওঠেন তিনি। লক্ষ করেন অর্ফালিসবাসীর বিদায়কাতর মানুষের মানসিক অবস্থা। জাহাজ চলে যায়। আগামীর জন্য পড়ে থাকে কিছু অমূল্য উপদেশ। পৃথিবীর কাছে এভাবেই উপস্থাপিত হয় দ্য প্রফেট।

আরও পড়ুন: অ্যানা ফ্রাংকের ডায়রি: দ্য সিক্রেট অ্যানেক্স

লেখকের নিশানদিহি

কাহলিল জিবরানের মূর্তির পাশে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী জাঁ জিবরান
কাহলিল জিবরানের মূর্তির পাশে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী জাঁ জিবরান। চিত্রসূত্র: Aramcoworld

কাহলিল জিবরানের জন্ম ১৮৮৩ সালের ৬ ডিসেম্বর, লেবাননের বাশহররির ম্যারোনাইট (মারুন গোত্রীয়) খ্রিষ্টান পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি তিন ভাষাতে নিপুণ হয়ে ওঠেন জিবরান। ম্যারোনাইট গির্জা পরিচালিত স্কুল আর কলেজে লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবার সাথে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিজের মধ্যপ্রাচ্য; সেই সঙ্গে গ্রিস, ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্স। শৈশবে আঁকাআঁকির হাতেখড়ি; চিত্রকলা আর সাহিত্য একইভাবে চালিয়ে যান তিনি। 

কাহলিল জিবরানের অঙ্কিত চিত্রকর্ম
কাহলিল জিবরানের অঙ্কিত চিত্রকর্ম। চিত্রসূত্র: Transcend

প্রথমে লিখতেন আরবিতে পরে আমেরিকায় থিতু হয়ে লিখতে শুরু করেন ইংরেজিতে। লেখা ও আঁকা দুটোতেই ছিলেন প্রথাবিরোধী। চার্চের পরিবেশে বড় হলেও ধর্মীয় ভণ্ডামি তাঁর অপছন্দ। ইসলামে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ হওয়ায় নবিদের ছবি আঁকা নিষিদ্ধ। তিনি তাঁদের কল্পিত ছবি আঁকলেন এবং প্রদর্শনী করলেন বোস্টনে। দ্য প্রফেট গ্রন্থে এমন অনেক ছবির সমাবেশ ঘটিয়েছেন জিবরান। 

জিবরানের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো: দ্য ওয়ান্ডারার (পরিব্রাজক, ১৯৩২), স্যান্ড অ্যান্ড ফোম (বালি আর ফেনা, ১৯২৬), দ্য ফোররানার (অগ্রপরিকর, ১৯২০), দাম’আহ ওয়া ইবতিসামাহ (এক ফোঁটা অশ্রুজল, এক দমক হাসি, ১৯১৪), সিক্রেটস অফ দ্য হার্ট (পরানের গুহ্যকথা, ১৯৪৭), আল-আজনিহ়াতুল মাকসুরাহ (ভেঙে যাওয়া পক্ষ, ১৯২২) ইত্যাদি। আরবি ও ইংরেজিতে সমান সফল এই সাহিত্যিক চিত্রকর্মেও বিচিত্র প্রতিভা দেখান—ভূমধ্যসাগর পাড়ের আধুনিক রেনেসাঁপুরুষ বলা যায় কি‌? সম্ভবত এজন্যই শেক্সপিয়ার এবং লাউজি-র পরে জিবরানের বই-ই এখন পর্যন্ত সব থেকে বেশি বিক্রীত গ্রন্থ।

জিবরানের নকশাকৃত একটি ব্রোঞ্জের স্মারক যেটিতে জিবরান দ্য প্রফেট এর একটি কপি ধরে রেখেছেন
জিবরানের নকশাকৃত একটি ব্রোঞ্জের স্মারক যেটিতে জিবরান দ্য প্রফেট-এর একটি কপি ধরে রেখেছেন। চিত্রসূত্র: Aramcoworld

জিবরানকে বলা হয় লেবাননের সোক্রাতেস (Socrates)। সোক্রাতেসের মতো তাঁর বিরুদ্ধেও ধর্মদ্বেষের অভিযোগ এসেছে, এসেছে তরুণদের ভুল পথে পরিচালনা করার অভিযোগ। নির্বাসন দেয়া হয় জিবরানকে। নির্বাসন জীবনে জিবরান বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন, শেষ জীবনে স্বদেশ ফিরতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জীবিত অবস্থায় ফিরতে পারেননি, পেরেছিলেন ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে। 

তো আর দেরি কেনো? যারা এখনো কাহলিল জিবরানের লেখার সাথে পরিচিত হন নি, তাঁরা পড়ে ফেলুন ‘দ্য প্রফেট’ গ্রন্থটি; অথবা একে অতিপঠিত মনে করলে অন্যান্য অপ্রসিদ্ধনামা (অন্তত বাংলা মুল্লুকে) বইগুলোও পড়ে দেখতে পারেন—অন্তত পাওলো কোয়েলহোর চেয়ে অরৈখিক হবার কথা। 

ফিচার ছবি লেবানন; চিত্রসূত্র: জর্জ ওয়াকেদ/আনস্প্ল্যাশ

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on দ্য প্রফেট: একজন মহাপুরুষের উপদেশনামা

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!