প্রচ্ছদচিত্র

ড্রাকুলা স্যার: রক্তপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক

5
(3)
Bookmark

No account yet? Register

ড্রাকুলা স্যার সিনেমাটির টিজার কিংবা ট্রেলার একঝলক দেখে মনে হতেই পারে যে, এটি ড্রাকুলা কিংবা ভ্যাম্পায়ার নিয়ে সিনেমা। কিন্তু এটি মূলত একসাথে সাইকোলজিক্যাল, হরর এবং থ্রিলার সিনেমা। এই সিনেমাতে যে সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, তার ইঙ্গিত মিলেছিল টিজারের শুরুতেই অনির্বাণের সংলাপে। সিনেমার নামভূমিকায় অর্থাৎ ড্রাকুলা স্যারের চরিত্রে রয়েছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। এ ধরনের চরিত্রে তিনি এই প্রথম অভিনয় করলেন বলা চলে। মনস্তাত্ত্বিক এই গল্পের মুখ্য চরিত্র রক্তিম একটি বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক। তার ক্যানাইন টিথ দুটো অনেকটা ভ্যাম্পায়ার বা ড্রাকুলার মত বড়। যার ফলে বাচ্চারা তাকে ড্রাকুলা স্যার হিসেবে অখ্যায়িত করে থাকে। এরপর সেই থেকে রক্তিমের নাম হয়ে যায় ড্রাকুলা স্যার।

একদিন হঠাৎ বিদ্যালয় থেকে রক্তিম পৌঁছে যায় পুলিশ স্টেশনে। যেখানে পুলিশি জেরার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। কী করে রক্তিম থেকে ড্রাকুলা স্যরে পরিণত হলেন? তার ভালবাসা মঞ্জরীই বা কী করে রক্তিমের মুক্তির লড়াইয়ের সঙ্গে জুড়লেন? এসব অজানা প্রশ্ন সকলের মাথায় নিশ্চই ঘুরপাক খাচ্ছে। সাতের দশক যেহেতু ধরা হয়েছে সেহেতু সিনেমায় নকশাল আন্দোলনের ছোঁয়াও রয়েছে এবং ঝলকটিও মিলল ড্রাকুলা স্যারের প্রথম ঝলকে। ড্রাকুলা স্যার প্রসঙ্গে অনির্বাণের মত, এর আগে দর্শকরা সাধারণত যে ধরনের ড্রাকুলা বা ভ্যাম্পায়ার সিনেমা দেখেছে সেগুলোর মধ্যে ড্রাকুলা স্যার একদমই ভিন্নধর্মী।

ড্রাকুলা স্যারে রক্তিম ; চিত্রসূত্র: Bulletin Hours
ড্রাকুলা স্যারে রক্তিম ; চিত্রসূত্র: Bulletin Hours

অভিনেতার কথায়, ব়্যামসে ব্রাদার্সের সিনেমাগুলোর মধ্যে এ ধরণের একটি স্বাদ ছিল। তবে দেবালয় ভট্টাচার্যের সিনেমায় ঠিক সেই ঘরানায় ফেলার মতোও নয়। কাহিনিতে আবার সাইকোলজিক্যাল বা মানসিক পরতও রয়েছে। মিমিকেও দেখা গিয়েছে অতি সাধারণ চরিত্রে। তবে মিমিকে এরকম চরিত্রে আগেও দেখা গিয়েছে ঋতুপর্ণ ঘোষের ধারাবাহিকে। পরিচালক দেবালয় অবশ্য সেটি মাথায় রেখেই মিমির চরিত্র মঞ্জরীকে সাজিয়েছেন। উপরন্তু মুখ্য চরিত্রে টলিউডের দুই প্রথম সারির তারকা অনির্বাণ ভট্টাচার্য এবং মিমি চক্রবর্তী রয়েছে। অতঃপর ড্রাকুলা স্যার নিয়ে যে বাঙালি দর্শকদের মধ্যে বিশেষ কৌতূহল থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।

পঞ্চাশ পেরিয়েও সাতের দশকের আগুনে ঝরানো সময়ের স্মৃতি বাঙালির মননে উজ্জ্বল। বিশেষ করে আলোকিত সুশীল সমাজের মানুষদের সান্ধ্য আহ্নিকের আসরে। কত প্রতিভা যে অঙ্কুরে বিনষ্ট হল, তা নিয়ে আক্ষেপ অন্তহীন। নকশাল আন্দোলন কেন দিকশূন্যপুরের কাহিনি হয়ে গেল? তা নিয়ে রীতিমতো তর্ক চলে নেশার ঘোর চরমে না পৌঁছানো পর্যন্ত। কিন্তু স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এতদিন পরে হলেও ওই আগুনে সময়টা এবং পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নিয়ে এমন চিন্তা উদ্রেককারী সিনেমা অবশ্য সবারই দেখা হয়নি, যেমনটি দেখাল দেবালয় ভট্টাচার্যের ড্রাকুলা স্যার। নিঃসন্দেহে নকশাল আন্দোলনকে সামনে রেখে সিনেমাটি অনেকটা ইতিহাসের গন্ধ পেয়েছে। আর ঠিক এজন্যই সবার আকর্ষন চলে যায় যে মানসিক ভারসাম্যহীন ড্রাকুলা স্যারের অন্ধকারাচ্ছন্ন রহস্যের সাথে নকশাল আন্দোলনের কী সম্পর্ক? এবং শেষের দিকে পরিনতি যেটি হয় সেদিকে।

ড্রাকুলা স্যারে রক্তিম ; চিত্রসূত্র: YouTube
ড্রাকুলা স্যারে রক্তিম ; চিত্রসূত্র: YouTube

সত্তরের সেই সদ্য তরুণ বিপ্লবীদের কাছে মৃত্যু ছিল এক পাহাড়ের মত। আর সেই অগ্নি আন্দোলনের কমরেড ছিলেন চারু মজুমদার। সিনেমায় প্রোটাগনিস্ট অমল সোম আত্মাহুতি দেওয়া তরুণদের একজন। অমল নেতার সেই বাক্যটি বিশ্বাস শুধু করেনি বরং আত্মস্থ করেছিল। কিন্তু পুলিশের নির্মম অত্যাচারের কাছে সে কি স্থির প্রতিজ্ঞ থাকতে পেরেছিল? না পারলে, বিশ, তিরিশ বছর বাদে রক্তিম নামে এক আপাত শান্ত নির্বিরোধী স্কুল শিক্ষকের মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে নতুন তরুণ ড্রাকুলার মত দাঁত নিয়ে জন্মায় কেন? পুলিশ জেলখানায় অত্যাচারের সময় অমলের দুটি দাঁত উপড়ে নেয়। আমরা দেখি রক্তিমের মুখে সেই দাঁত দুটিই একটু লম্বা আকারের। যে কারণে, স্কুলে তাঁর পরিচয় ড্রাকুলা স্যার। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকের চমকে দেওয়া মুন্সিয়ানা হল এই স্যারের মধ্যে অমল সোমের প্রতিশোধ ভাবনা ঢুকিয়ে দেওয়া।

আরও পড়ুন:গন্তুক: সত্যজিৎ রায়ের অন্তিম স্বাক্ষর, দ্বিতীয় পর্ব

হ্যাঁ, এখানে অনেকটাই তরলীকৃত হয় রাজনৈতিক বক্তব্য। রক্তিম তাঁর ড্রাকুলা দাঁত দিয়ে একের পর এক মানুষের ঘাড়ে কামড় বসিয়ে প্রতিশোধ নিতে থাকে। এসে যায় অমলের প্রেমিকা মঞ্জরী। তাঁর উপস্থিতি সবটাই কাল্পনিক, কিছুটা ভূতুড়ে বৈকি! দেবালয় গল্পের মধ্যে গল্প ঢুকিয়ে, তার শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে আম দর্শককে কিঞ্চিৎ গুলিয়েও দেন। এ জন্ম ও অতীতজন্মের সীমারেখা খুবই সূক্ষ্ম। তাঁর চিত্রনাট্য বেশ সরু সুতোর ওপর দিয়ে সুন্দর ভারসাম্য রেখেই এগিয়েছে। বুদ্ধিমান দর্শক সেটা ধরতে পারলেই সিনেমার মজা, শ্লেষ, ব্যান্টারিংগুলো উপভোগ করতে পারবেন। সাতটি অধ্যায়ে ভাগ করার পরও উপসংহারের প্রয়োজন ছিল কি? যদিও সাধারণ জনতার কথা ভেবেই হয়তো এমন কাঠামো। তবে, সিনেমা আরও আগে শেষ হতেই পারত। অতীত ও বর্তমানের বারবার ওভারল্যাপ করার প্রয়োজন ছিল না। অধ্যায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে ঘটনাগুলো দেখানোর ফলে একধরনের লিনিয়ার স্ট্রাকচার যেমন সিনেমাকে কিঞ্চিৎ সহজ করে, ঠিক তেমনি শিল্পের নান্দনিক গুণপানায় কিছু ঘাটতিও তৈরি করে, বিশেষ করে বৌদ্ধিক দর্শকের অনুভূতিতে।

ড্রাকুলা স্যারে মঞ্জরী ; চিত্রসূত্র: Zee News
ড্রাকুলা স্যারে মঞ্জরী ; চিত্রসূত্র: Zee News

দেবালয়ের সিনেমা শৈলীর ভাবনা এবং তার সঠিক প্রয়োগ সিনেমাকে উতরে দেয় এক সুষম বিন্যাসে। এখানেই এই সিনেমার দেবালয় তাঁর আগের নিজের দুটি সিনেমার দেবালয় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যান এবং সেজন্য তাঁকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতার লাইন তো বটেই, এ সিনেমার গান, সংলাপ নিশ্চিত ভাবেই বাংলা ছবির ঘরানার বাইরে, অনেকটা কাব্যিক, আবার খুবই তীব্র ও তীক্ষ্ণ। অধ্যায়গুলো নামকরণের মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। যেটি সিনেমাকে অনেকটা ফুটিয়ে তুলেছে। পাশাপাশি ড্রাকুলা স্যারে যেসব গান রয়েছে সেগুলো সিনেমার সাথে তো মানানসয়ী বটেই এবং দর্শকপ্রিয় হতে সক্ষম হয়েছে। এদিক দিয়ে বলা চলে গানের দিকেও সিনেমাটি সফল প্রায়।

অনির্বাণ ভট্টাচার্য অর্থাৎ ড্রাকুলা স্যারের জেকিল ও হাইডের মত তাঁর দুটো রূপ রয়েছে সিনেমাটিতে। একজন অতি শান্ত, অন্যজন ক্ষণে ক্ষণে রক্ত পিশাচ। দুটি রূপেই তিনি সমান সাবলীল। বিশেষ করে সাধারণ শান্ত চেহারায়। প্রেমিকা মঞ্জরীর সঙ্গে তাঁর আবেগপূর্ণ দৃশ্যগুলো সুন্দর। অমল ও রক্তিম দুটি চরিত্রের ফারাকটুকুও অনির্বাণ ছোট্ট ছোট্ট কাজে বুঝিয়ে দিয়েছেন। মঞ্জরীর চরিত্রে মিমি চক্রবর্তী শুধু সঙ্গ দিয়েছেন, তাঁর করার মত কোনও দৃশ্য ছিল না। অল্প সুযোগে বিদিপ্ত চক্রবর্তী, রুদ্রনীল ঘোষ, সুপ্রিয় দত্ত তাঁদের সুনাম অনুযায়ী অভিনয় করেছেন। আর দেখার মত রয়েছে ইন্দ্রনাথ মারিকের ক্যামেরার কাজ। সব ছাপিয়ে যায় ছবির অন্তর্নিহিত বক্তব্য। যা আজকের বাংলা সিনেমায় প্রায় দেখাই যাইনা। তবুও বলি, এই সিনেমা পূজোর সিনেমা নয় মোটেই, এই সিনেমা অন্য সময়ের, অন্য অনুভূতির।

ড্রাকুলা স্যারে রক্তিম ; চিত্রসূত্র: Anandabazar

এবার পুজোতে এক গুচ্ছ বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছিল বাংলায়। মিমি চক্রবর্তী ও অনির্বান ভট্টাচার্য অভিনীত ড্রাকুলা স্যার তার মধ্যে সব থেকে ভালো ব্যবসা করেছে এখনও অবধি। শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজিত এই সিনেমাকেই আবার হিন্দি ভাষায় নিয়ে এসেছেন সহ প্রযোজক মহেন্দ্র সোনি। দিওয়ালিকেই মাথায় রেখে হিন্দি ভাষীদের জন্য দেশ ব্যাপী এই সিনেমা মুক্তি দিয়েছিল প্রযোজক মহেন্দ্র সোনি। কেননা ‘ড্রাকুলা স্যারের গল্প এবং গোটা ছবি সমাদৃত সর্বত্র। সেক্ষেত্রে যারা বাংলা বোঝেন না তাদের জন্য হিন্দিতে এই সিনেমা এক দারুণ উপহার।

পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্যের এই সিনেমা একেবারে অন্য ধারার বলা যেতে পারে। ছবির খানিকটা ১৯৭০ এর দশক আবার খানিকটা বর্তমানে ভাগ করা। সত্যি যদি কারো ড্রাকুলার মতন দাঁত থাকে কোন কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় সেই ব্যক্তিকে বা শেষে কি পরিণতি হতে পারে, তারই এক অসাধারন গল্পের রোমাঞ্চকর  অভিজ্ঞতা রয়েছে ড্রাকুলা স্যারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টি হচ্ছে যে, ড্রাকুলা স্যার সিনেমাটি বিশ্বের আইএমডিবি তালিকায় একুশতম স্থান দখল করে নিয়েছে সাত দশমিক নয় রেটিং অর্জন করার মাধ্যমে। যেটি বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে একটি গৌরবময় সাফল্য।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: Indulge

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on ড্রাকুলা স্যার: রক্তপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!