প্রচ্ছদ চিত্র

শাহ সিকান্দার জুলকারনাইন: একজন দিগ্বিজয়ী বীর (শেষ পর্ব)

করবী কানন শিশির
4.7
(14)
Bookmark

No account yet? Register

শাহ সিকান্দার জুলকারনাইন ছিলেন মাশরিক থেকে মাগরিবের অর্থাৎ পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমের অধিপতি। গতপর্বে আমরা দিগ্বিজয়ী বীর জুলকারনাইনের পরিচয়, তাঁর নামকরণের ইতিহাস, জুলকারনাইন নবি ছিলেন কি না এবং তাঁর সফরসমূহ সংশ্লিষ্ট বিষয় জেনেছি। এ পর্বে আমরা হজরত খিজির (আঃ) ও লোকমান হাকিমের সাথে তাঁর আবে হায়াতের সন্ধান এবং কিছু অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে কিভাবে তিনি সমগ্র দুনিয়ার বাদশাহি ত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করলেন সে সম্পর্কে জানবো। 

অসামান্যতে লিখুন

আবে হায়াতের সন্ধানে জুলকারনাইন

ইয়াজুজ-মাজুজদের পাহাড়ের মাঝে প্রাচীরাবদ্ধ করার পর শাহ সিকান্দারের ইচ্ছা হলো তিনি আবে হায়াতের  সন্ধানে যাবেন। আবে হায়াত এমন একটি ঝর্ণার পানি যা পান করলে কেয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকা যায়। অর্থাৎ অমরত্ব প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু এই ঝর্ণা কোহে কাফ নামক একটি পর্বতের কঠিনতম অন্ধকার গুহায় অবস্থিত যেখানে কোনো ধরণের আলো পরিবহন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

জুলকারনাইন আবে হায়াতের সন্ধানে বেড়িয়েছিলেন।
চিত্র: প্রতীকী ঝর্ণা | চিত্রসূত্র: Pixabay

জুলকারনাইন তাঁর একজন বিশ্বস্ত ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীর হাতে রাজ্যের ভার অর্পণ করলেন এবং প্রধান উজির হজরত খিজির (আঃ) সহ প্রায় এক হাজার সৈন্য ও খাদ্য সরঞ্জাম নিয়ে কোহে কাফ অভিমুখে রওনা হলেন। যেহেতু আলো নিয়ে প্রবেশ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিল, সেহেতু শাহ সিকান্দার তাঁর উজির হজরত খিজির (আঃ) এর নিকট একটি মতি রাখতে দিলেন, যা অন্ধকারেও তীব্র কিরণ দানে সক্ষম।

মহামূল্যবান রত্ন
চিত্র: মতি | চিত্রসূত্র: Pixabay    

প্রায় এক বছর যাত্রার পরে তারা কোহে কাফের সম্মুখে এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু গুহার সূচীভেদ্য গাঢ় অন্ধকারে অনেকেই পথ হারিয়ে ফেললো। কিছু লোক গুহার বাইরে বেরিয়ে এসে পথ খুঁজে রাজ্যে ফিরে যেতে পারলো। কিছু লোক গুহার ভেতরেই পথ হারিয়ে ঘুরতে লাগলো। এমতাবস্থায় খিজির (আ.) ও জুলকারনাইনও পরস্পরের নিকট হতে পৃথক হয়ে পড়েছিলেন। হজরত খিজিরও (আ.) অন্ধকার গুহায় পথ হারিয়েছিলেন। তাঁর সাথে থাকা মতির কথা তিনি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর হঠাৎ তাঁর মতির কথা মনে পড়ে যায়। সাথে সাথে তা বের করে দেখেন তার সামনেই রয়েছে আল্লাহ তায়ালার সেই অপূর্ব নিদর্শন আবে হায়াত ঝর্ণা। তিনি আল্লাহর শোকর আদায় করে প্রাণ ভরে পানি পান করলেন এবং আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত অমরত্ব প্রাপ্ত হলেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোরআন বা হাদিসে স্পষ্ট কোনো বিবরণ নেই যে তিনি আজও জীবিত আছেন কিনা!

হযরত খিজির (আঃ) অদ্যাবধি জীবিত আছেন কিনা এ বিষয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। কোন কোন রেওয়ায়েত অনুযায়ী তাঁর জীবিত থাকার কথা জানা যায় আবার কোন কোন রেওয়ায়েতে বিপরীত মতবাদ জানা যায়। যাদের মতে তিনি জীবিত আছেন, তাদের প্রমাণ হচ্ছে মুস্তাদারক হাকিম কর্তৃক হজরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত একটি রেওয়ায়েত। তাতে বলা হয়েছে, যখন রাসুল (সাঃ) এর ওফাত হয়ে যায়, তখন সাদা-কালো দাড়িওয়ালা জনৈক ব্যক্তি আগমন করেন এবং ভিড় ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে কান্নাকাটি করতে থাকেন।

উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের প্রতি বলতে থাকেন, 

আল্লাহর দরবারেই প্রত্যেক বিপদ থেকে সবর আছে। প্রত্যেক বিলুপ্ত বিষয়ের প্রতিদান আছে বরং তিনি নশ্বর বস্তুর স্থলাভিষিক্ত। তাই তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করো এবং তাঁর কাছেই আগ্রহ প্রকাশ করো। কেননা যে ব্যক্তি বিপদের সময় সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়, সে-ই প্রকৃত বঞ্চিত।

কথা শেষ করে তিনি উক্ত স্থান ত্যাগ করেন। উপস্থিত হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত আলী (রা.) সবার উদ্দেশ্যে বললেন,

ইনিই হজরত খিজির (আঃ)

আবার পবিত্র কোরআনে বর্ণিত একটি আয়াতের কারণে অনেক মুসলিম ইতিহাসবিদ হজরত খিজির (আ.) এর জীবিত থাকার বিষয়টি নাকচ করেছেন। তা হলো,

(হে মুহাম্মাদ!) আপনার পূর্বেও কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে?

-সুরা আম্বিয়া, আয়াত ৩৪
হযরত খিজির (আ.) ছিলেন জুলকারনাইন এর উজির।
চিত্র: জেরুজালেমে অবস্থিত খিজির গম্বুজ | চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons

জুলকারনাইন এবং অলৌকিক ঘটনাসমূহ     

এদিকে শাহ সিকান্দার জুলকারনাইন সকলের নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্ধকারের ভিতর একাই অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর তিনি একটি বিরাট দালান দেখতে পেলেন, যা চতুর্দিকে সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। প্রাচীরের উপরে ছিল অসংখ্য মোরগ এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো একটি মোরগ মানুষের ভাষায় বলে উঠলো,

হে বাদশা সিকান্দার, পৃথিবীতে আপনার এতো বিশাল সাম্রাজ্য ফেলে রেখে কোন উদ্দেশ্যে এই ঘোর অন্ধকার এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন?

জুলকারনাইন বললেন,

আমি আবে হায়াতের সন্ধানে বেড়িয়েছি। 

মোরগটি বলল,

হে বাদশাহ, এখন এমন এক সময় আসবে যখন পুরুষেরা রেশমি বস্ত্র পরিধান করবে। এবং রং- বেরংয়ের দালানকোঠা তৈরি করে আখিরাতকে ভুলে দুনিয়ার পিছনে লেগে থাকবে। পরকালের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে নানারূপ আমোদে মত্ত থাকবে। 

এই পর্যন্ত বলে মোরগ তার মস্তক নাড়া দিল এবং তৎক্ষণাৎ দালানটি মণি-মুক্তার দালান থেকে হীরা জহরতের দালানে পরিবর্তিত হলো। এ দৃশ্য দেখে বাদশাহ অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হলেন। মোরগটি বলল,

হে বাদশাহ, ভীত হবেন না। দুনিয়ার সবই ইবলিশের লীলাখেলা। সামনে অগ্রসর হন এবং দেখুন সেখানে কি আছে।

মোরগের কথামতো তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে দেখলেন এক ব্যক্তি মুখে বিরাট একটি সিংগা নিয়ে একপায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে নীরব নিশ্চল, মুখে কোন কথা নেই। সারা দেহ নিথর হয়ে এক দৃষ্টিতে উর্ধ্বমুখে তাকিয়ে। যিনি শিঙা মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনিই স্বয়ং ইসরাফিল (আ.) ফেরেশতা। তিনি হঠাৎ মুখ খুললেন এবং শাহ সিকান্দারকে লক্ষ্য করে বললেন,

হে বাদশাহ, নিজের এত বিশাল রাজ্য এবং আলোকের দেশ ছেড়ে কেন এই সুদূরবর্তী অন্ধকার রাজ্যে এসেছেন? 

বাদশাহ বললেন,

আমি আবে হায়াতের সন্ধানে বের হয়েছিলাম। যদি পাই, তবে তা পান করে সুদীর্ঘ জীবন লাভ করলে বেশি পরিমাণে আল্লাহর ইবাদত করতে পারবো।

তাঁর কথা শুনে ফেরেশতা ইসরাফিল তাঁকে বিড়ালের মাথার মতো দেখতে একটি পাথর দিলেন এবং বললেন,

হে বাদশাহ, আমি আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি। অধিক লালসা করা নির্বুদ্ধিতা বটে!

ইসরাফিলের কথা শুনে বাদশা প্রত্যাবর্তন করলেন, যেখানে তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। অতঃপর তাঁরা আবে হায়াতের আশা ত্যাগ করে অশ্বারোহণ করে রাজধানীর পথে অগ্রসর হলেন।

অন্ধকার গুহার একটি স্থানে তাদের ঘোড়ার খুরের সাথে কিছু পাথরের ঘর্ষণের ফলে স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছিলো। জুলকারনাইন তাঁর সঙ্গী বিজ্ঞ ব্যক্তি লোকমান হাকিমকে এই পাথরের তাৎপর্য বর্ণনা করতে বললেন। 

মূল্যবান খনিজ পাথর, যা দেখে জুলকারনাইন আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
চিত্র: মূল্যবান খনিজ পাথর | চিত্রসূত্র: Pixabay   

লোকমান হাকিম বলেন,

এই রহস্যময় পাথরগুলো যারা সাথে নেয় তারাও আফসোস করে, যারা সাথে নেয় না তারাও আফসোস করে।

 এই বক্তব্য শুনে জুলকারনাইনের পরামর্শমতো কিছু লোক কিছু পরিমাণ পাথর তাদের সাথে নিলো, আবার কিছু লোক নিলো না। গুহা থেকে বেরিয়ে এলে সবাই যখন দিনের আলোয় তাদের সাথে আনা পাথরগুলো পরীক্ষা করছিলো, তখন দেখতে পেলো, সেগুলো অতি মূল্যবান হীরা, জহরত, মণি-মুক্তা ছাড়া আর কিছুই নয়। তখন বস্তুত প্রত্যেকেই আফসোস করছিলো। যারা এনেছিলো তারা ভাবছিলো কেনো আরও নিলো না। যারা একেবারেই নেয়নি তারা ভাবছিলো, হায়! কি করে এমন মহা মূল্যবান ধন রত্নগুলো অবহেলায় পদদলিত করে এলো!  

একসময় বাদশাহ সিকান্দার লোকমান হাকিমকে জিজ্ঞেস করলেন,

ইসরাফিল ফেরেশতা যে বিড়ালের মাথার মতো পাথরটি দিলেন তার গুণাগুণ ও তাৎপর্য কী? 

তিনি বলেন বললেন,

আপনি সে পাথরখানা এক পাল্লায় রাখুন আর এদের আনা পাথরগুলো আরেক পাল্লায় রাখুন। দেখুন কোনটির ওজন বেশি হয়।

দেখা গেল ইসরাফিল এর প্রদত্ত পাথর খানার ওজনই বেশি। বাদশাহ এই ঘটনার ব্যাখ্যা করতে বললেন। লোকমান হাকিম তাঁর জবাব না দিয়ে বলেন,

এবার এই পাথর সমূহ নামিয়ে রেখে এই পাল্লায় এক মুষ্টি ধুলোবালি রাখুন।

এবারে দেখা গেল ইসরাফিল প্রদত্ত পাথর খানা ও ধুলোবালির ওজন সমান।অতঃপর বাদশাহ লোকমানকে এর রহস্য জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে লোকমান বলেন,

আল্লাহ আপনাকে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ডের বাদশাহী দান করেছেন। তথাপি আপনার আশা-আকাঙ্ক্ষার কোন শেষ নেই। অথচ একদিন আপনার উদর মাত্র এক মুষ্ঠি  এক মুষ্টি কবরের মাটিতে ভরে যাবে। আল্লাহ তায়ালা এই পাথরের সাহায্যে এই শিক্ষা প্রদান করলেন যে, একজন কবরবাসীর কাছে এই মূল্যবান পাথরসমূহ ও এক মুষ্টি ধুলোবালির মূল্য সমান। 

কবরের জীবনে দুনিয়ার ধনরত্নের কোনো মূল্য নেই।
একজন কবরবাসীর কাছে এই মূল্যবান পাথর সমূহ ও এক মুষ্টি ধুলোবালির মূল্য সমান। চিত্রসূত্র: Pixabay

জীবনের শেষ সময় 

লোকমান হাকিমের কথায় শাহ সিকান্দার এর জ্ঞান চক্ষু খুলে গেল। তিনি সেখানে হতেই তাঁর সঙ্গী অশ্বারোহীদের দেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং জানিয়ে দিলেন যে তিনি আর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন না। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানেই থেকে গেলেন এবং পার্থিব সব মোহ মায়া বিসর্জন দিয়ে সেখানেই আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করলেন।

কথিত আছে যে, ইন্তেকালের পূর্বে তিনি মায়ের কাছে পত্র লিখেছিলেন,

হে আমার পরম শ্রদ্ধেয় জননী, দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চিরবিদায় গ্রহণ করছি। আপনি আমার পক্ষ হতে সালাম গ্রহণ করুন এবং আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করুন। আমার জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করুন যেন আমার জান্নাত নসিব হয়। আজ আপনি আমার থেকে অনেক দূরে বলে, দেখতে পারছেন না যে আপনার বিশ্ববিজয়ী পুত্র জুলকারনাইন আজ সম্পূর্ণ রিক্ত হস্তে পরম করুণাময়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করছে। আপনার এই সন্তানটিকে কোন কিছু দেয়ার থাকলে তা অনাথ, অসহায়, এতীম, বিধবা, গরিব দুঃখীদের মাঝে দান করে দিন।

তথ্যসূত্র:

গ্রন্থসূত্র:

  • শাফি (রহ.), মুফতি মুহাম্মদ। তাফসিরে মাআরেফুল কুরআন। অনুবাদক- মুহিউদ্দীন খান, মাওলানা। পৃষ্ঠা – ৮১৬
  • সুরাটী, তাহের (২০১০)। কাসাসুল আম্বিয়া। অনুবাদক- রহমান, মোস্তাফিজুর। মীনা বুক হাউস। পৃষ্ঠা – ১৪১
  • সুরাটী, তাহের (২০১০)। কাসাসুল আম্বিয়া। অনুবাদক- রহমান, মোস্তাফিজুর। মীনা বুক হাউস। পৃষ্ঠা – ১৪২
  • সুরাটী, তাহের (২০১০)। কাসাসুল আম্বিয়া। অনুবাদক- রহমান, মোস্তাফিজুর। মীনা বুক হাউস। পৃষ্ঠা – ১৪৩
  • সুরাটী, তাহের (২০১০)। কাসাসুল আম্বিয়া। অনুবাদক- রহমান, মোস্তাফিজুর। মীনা বুক হাউস। পৃষ্ঠা – ১৪৪

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on শাহ সিকান্দার জুলকারনাইন: একজন দিগ্বিজয়ী বীর (শেষ পর্ব)

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!