ষাটগম্বুজ মসজিদ

খলিফাতাবাদ ও ষাটগম্বুজ মসজিদ: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য (পর্ব-২)

4.9
(14)
Bookmark

No account yet? Register

ঐতিহ্যবাহী এই খলিফাতাবাদ শহরের অনেক চিত্তাকর্ষক স্থাপনা, সমাধি, রাস্তা-ঘাট, জলাধার থাকলেও মূল আকর্ষণ কিন্তু ষাটগম্বুজ মসজিদ। মসজিদটি খান জাহান আলি (রহ.) এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকীর্তি। ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর মৃত্যুর কিছুকাল আগে অর্থাৎ ১৪৫৯ সালের কাছাকাছি সময়ে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।

অসামান্যতে লিখুন

আপনি যদি খলিফাতাবাদ ও ষাটগম্বুজ মসজিদ: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য- এর প্রথম পর্ব না পড়ে থাকেন, তবে এক্ষুণি পড়ে নিতে পারেন।

ষাটগম্বুজ মসজিদ বর্তমান বাগেরহাট শহর থেকে তিন মাইল পশ্চিমে (প্রাচীন বাগেরহাট অর্থাৎ খলিফাতাবাদ শহরের) ঘোড়াদীঘির পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। ধারণা করা হয়, ঘোড়াদীঘি হচ্ছে হযরত খান জাহান আলি (রহ.) এর খনন করা প্রথম দীঘি। তিনি সুন্দরঘোনায় এসে খলিফাতাবাদ শহর পত্তনের শুরুতে তাঁর সৈন্যদের জন্য একটি ব্যারাক স্থাপন করেন। সে জায়গার নাম হয় ব্যারাকপুর। সেই স্থানে প্রথম দীঘি খনন করা হয়, আর সেটা হচ্ছে ঘোড়াদীঘি।

শহরের প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য এলাকাটিকে উঁচু করা ও ব্যবহার উপযোগী পানির সুব্যবস্থার জন্য বিশালাকার ঘোড়াদীঘি খনন করেন তিনি। ঘোড়াদীঘির নামকরণ নিয়ে কথিত আছে- একটি ঘোড়া এক দোড়ে যতটুকু গিয়েছিল ততটুকু দৈর্ঘ্য নিয়ে এই দীঘিটি খনন করা হয়েছিল। 

অন্য মতানুসারে, প্রকান্ড দীঘিটি খননের পর খান জাহান আলি প্রায় প্রতিদিন ঘোড়ায় চড়ে দীঘির চারপাশ ঘুরতেন, সেই থেকে দীঘিটি ঘোড়াদীঘি নামে পরিচিতি পায়। আরেকটি মতানুযায়ী, দীঘিটির খননের পূর্বে এ স্থানে সেনাদের কুচকাওয়াজ ও ঘোড়দৌড় হতো, সেই কারণে নামকরণ হয়েছিল ঘোড়াদীঘি।

মসজিদের প্রবেশপথ
প্রবেশপথ; চিত্রসূত্র: EkusheyTv

ঘোড়াদীঘির পূর্ব পাড়েই নির্মাণ করা হয় সুবিখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদ। মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য সেই সময়ে দুইটি প্রবেশপথ ছিল। একটি প্রবেশপথ পূর্বদিক থেকে এবং অন্য প্রবেশপথটি উত্তর দিকে ছিল। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি বর্তমানে সংস্কার করা হলেও উত্তর দিকের পথটির কোনো চিহ্ন এখন আর অবশিষ্ট নেই।

পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি মসজিদ থেকে আলাদা একটা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার দাবিদার, যা মসজিদের কেন্দ্রীয় খিলানপথ বরাবর স্থাপিত। খিলান সম্বলিত প্রবেশপথটি ৭.৯২ মিটার দীর্ঘ ও ২.৪৪ মিটার চওড়া। এটি ২.৪৪ মিটার পুরু এবং এর উপরিভাগ সুদৃশ্যভাবে বাঁকানো।

বাইরের দিক থেকে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৬০ ফুট এবং প্রস্থ ১০৮ ফুট। আর ভিতরের দিকে থেকে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৪৩ ফুট এবং প্রস্থ ৯০ ফুট। দেয়ালগুলো প্রায় ৮.৫ ফুট চওড়া। মসজিদের ভিতরের মেঝে হতে ছাদের দূরত্ব প্রায় ২১ ফুট উঁচু। 

মসজিদের প্রাঙ্গণে মানুষের আনাগোনা
মসজিদ প্রাঙ্গণ ও দরজা; সোর্স: EkusheyTv

মসজিদটির পূর্ব পাশে ১১টি বড় আকারের খিলানযুক্ত দ‌রজা আছে। ১০ টি দরজা সমান আকারে‌র হলেও মাঝের দরজাটি অন্য দরজাগুলোর তুলনায় বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ৭টি করে মোট ১৪ টি দরজা আছে। প্রধান মেহরাবের ঠিক পরেই, উত্তর পাশে আছে একটি দরজা, দরজাটি মূলত ইমামের প্রবেশের জন্য। এই দরজাটি নিয়ে মোট দরজা সংখ্যা ২৬টি।

এতগুলো দরজার পাশপাশি এই মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে আছে ১০টি মিহরাব। মিহরাবগুলো টেরাকোটায় শোভিত। মাঝ বরাবর প্রধান মিহরাব অন্যগুলোর চাইতে বড় আকারের ও বেশি কারুকার্যখচিত। এ মিহরাবের দক্ষিণ পাশে ৫টি মিহরাব ও উত্তর পাশে ৪টি।

এতগুলো দরজার সমন্বয়ে দেশের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, দিনের বেলা মসজিদটিতে কৃত্রিম আলো বাতাসের প্রয়োজন হয়না। সুবিশাল মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে তুঘলকি, বাংলাসহ বিভিন্ন স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে এক অনন্য স্থাপত্যশৈলীতে। এই অনন্য স্থাপত্যশৈলীটি খলিফাতাবাদ শহরের অন্যান্য স্থাপত্যকর্মেও দেখা মিলে।

ষাটগম্বুজ মসজিদের নাম শুনলে মনে হতে পারে মসজিদটিতে ষাটটি গম্বুজ রয়েছে, তাই হয়তো এর নাম ষাটগম্বুজ মসজিদ। কিন্তু আদতে তা নয়! সংজ্ঞা অনুসারে মসজিদটিতে প্রকৃত গম্বুজের সংখ্যা সত্তরটি। মধ্যের একটি সারিতে চৌচালা আকৃতির সাতটি গম্বুজ রয়েছে, যদিও এগুলো গম্বুজের সংজ্ঞার সাথে পুরোপুরি যায় না, এগুলোসহ সাতাত্তরটি কম উচ্চতাসম্পন্ন গম্বুজ রয়েছে। এবং চার কোণে চারটি মিনারের উপর  চারটি অণুগম্বুজ, সবমিলিয়ে মোট গম্বুজ সংখ্যা একাশিটি।

গম্বুজ আচ্ছাদিত ছাদ; সোর্স: DepositPhotos

অবাক করার বিষয় হচ্ছে এই মসজিদের উপরিভাগে কোনো ছাদ নেই! ৭৭টি গম্বুজ কে ছাদের মতো করে মসজিদটির উপরে বসানো হয়েছে। অর্থাৎ ছাদ সদৃশ গম্বুজগুলোই মসজিদটির ছাদ।‌ প্রায় ৬০০ বছর ধরে এই ৭৭টি গম্বুজ বিশিষ্ট ছাদের ভার বহন করে চলেছে ৬০টি পাথরের পিলার বা খাম্বা (ফারসি উচ্চারণ ‘খাম্বাজ’)। যেগুলো মূল্যবান কালো পাথরের তৈরি। বর্তমানে উত্তরদিকে একটা পিলার দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রেখে দেশের প্রত্নতাত্তিক বিভাগ কর্তৃক বাকি পিলারগুলো আস্তরণ দিয়ে পাথর আড়াল করে দেওয়া হয়েছে।

মসজিদের স্থাপত্যকীর্তি সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
মসজিদের ভেতরের ছবি; চিত্রসূত্র: CGTN

মসজিদের চার কোণে স্থাপিত গোলাকার মিনার (টাওয়ার) গুলো বিশালাকৃতির এবং উপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। প্রত্যেকটি টাওয়ারই ছাদকে ছাড়িয়ে উপরে উঠে গেছে। এগুলো খোলা খিলান চেম্বার বিশিষ্ট ও ছোট আকৃতির গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত।

মসজিদের পূর্ব পাশের মিনার দুটি অপর পাশের মিনার দুটির তুলনায় অপেক্ষাকৃত উঁচু আকৃতির, একটির নাম রোশানকৌঠা বা আলোকঘর, অন্যটির নাম আঁধারকৌঠা। মিনার দুটির মধ্যে আছে ঘোরানো সিঁড়ি, যেগুলো রাখা হয়েছে উপরে উঠার জন্য। আযানের পূর্বে মুয়াজ্জিন এই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আযান দিতেন। বর্তমানে রোশানকোঠা মিনারের সিঁড়ি খোলা থাকলেও আঁধারকৌঠা মিনার বেয়ে উপরে ওঠার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ষাটগম্বুজ মসজিদ মধ্যযুগের বাংলা স্থাপত্যকলার এক নিদর্শন।
চিত্র: ষাটগম্বুজ মসজিদের মিনার; চিত্রসূত্র – CGTN

ষাটগম্বুজ মসজিদের গম্বুজ সংখ্যা ৬০টি না হওয়া সত্ত্বেও মসজিদটির এই নাম কেন? গবেষকদের মত অনুযায়ী এই নামের জন্য দায়ী শব্দের বিবর্তন। অর্থাৎ লোকমুখে উচ্চারণের ফলে শব্দের উচ্চারণগত পরিবর্তন।

এ নামের পিছনে একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হচ্ছে- মসজিদটির বহুসংখ্যক অর্থাৎ ৬০টি পিলার (স্তম্ভ) এই নামকরণে অবদান রেখেছে। পিলারকে ফারসি ভাষায় বলা হয় খাম্বাজ। হয়তো লোকমুখে উচ্চারণে খাম্বাজ থেকে গম্বুজ হয়ে গেছে। অর্থাৎ ৬০টি খাম্বাজের জন্য সবাই একে ৬০ খাম্বাজ মসজিদ বলে ডাকত। উচ্চারণ পার্থক্যে শব্দের বিবর্তন ঘটে- ষাটখাম্বাজ – ষাটগাম্বাজ – ষাটগাম্বুজ – ষাটগম্বুজ। অথবা ষাটখাম্বাজ – ষাটখাম্বুজ – ষাটগাম্বুজ – ষাটগম্বুজ, এভাবে অবশেষে ষাটগম্বুজ নামে পরিচিত হয়।

তবে আরেকটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হচ্ছে- মসজিদটির কোনো ছাদ না থাকা। আগেই বলা হয়েছে, মসজিদটির কোনো ছাদ নেই, ছাদ সদৃশ গম্বুজ। অর্থাৎ গম্বুজ আচ্ছাদিত ছাদ। এর অর্ধডিম্বাকার ও আয়তাকার গম্বুজগুলোই এর ছাদ হিসেবে বসানো হয়েছে। যার কারণে সবাই ছাদ গম্বুজ বলতো। সময়ের সাথে সাথে ও শব্দের উচ্চারণগত পরিবর্তন ছাদ গম্বুজ থেকে ষাটগম্বুজ মসজিদে পরিণত হয়।

মসজিদটির নাম, নির্মাণ সাল ইত্যাদি সম্বলিত কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। হয়তো খান জাহান আলি (রহ.) এর প্রয়োজন অনুভব করেননি, তাই। মসজিদ মূলত ইবাদতের (নামাজ পড়া, পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি) উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হলেও ষাটগম্বুজ মসজিদ ছিলো কিছুটা ব্যতিক্রম। তিনি মসজিদটিকে কেবলমাত্র প্রার্থনাঘর হিসেবে ব্যবহার করেননি।

মসজিদটি তৎকালীন খলিফাতাবাদ শহরের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার হতো। যেখানে তিনি তার অনুসারী ও প্রজাদের ইলম (জ্ঞান), ন্যায়-অন্যায়বোধ শিক্ষা দিতেন। তাছাড়া রাজ্যের নানা প্রশাসনিক কার্যক্রমও এই মসজিদ থেকে চালাতেন তিনি। ব্যবহার করতেন বিচারালয় হিসেবেও। এইদিক বিবেচনায় মসজিদটি কেবল ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাই নয়, ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা কেন্দ্র এবং ঐতিহ্যবাহী আদালতও বটে।

খলিফাতাবাদ শহরের আরেকটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হচ্ছে নয় গম্বুজ মসজিদ। খান জাহান আলি (রহ.) এর সমাধির দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ঠাকুরদিঘীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত নয় গম্বুজ মসজিদ। নাম শুনেই বোঝা যায় এর উপরে রয়েছে নয়টি গম্বুজবিশিষ্ট ছাদ।

ষাটগম্বুজ মসজিদের পার্শ্ববর্তী নয়গম্বুজ মসজিদ।
চিত্র: নয়গম্বুজ মসজিদ; চিত্রসূত্র – ArchaeologyGovBD

ইটের তৈরি পুরো মসজিদের গায়ে পোড়ামাটির কারুকাজ খচিত। এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে বর্গাকার আকৃতিতে, এর একেক পাশের দৈর্ঘ্য ১৫.২৪ মিটার করে। মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় ২.৩৪ মিটার চওড়া।

মসজিদের ছাদ নয়টি ছোট আকৃতির অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ দিয়ে ঢাকা। গম্বজুগুলোর ভার বহন করছে মসজিদের ভেতরে চারটি পাথরের পিলার, যেগুলোর উপরে ছাদ স্থাপিত হয়েছে। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে কারুকার্যখচিত তিনটি মিহরাব। স্বাভাবিকভাবেই এ মসজিদেরও প্রধান মিহরাবটি অন্যান্য মিহরাবের তুলনায় বড়। পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি করে প্রবেশ পথ আছে। ষাট গম্বুজ মসজিদের মতো এ মসজিদেও এখনও নিয়মিত নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়।

ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে আবাদি খেতের মধ্যে চুনাখোলা মসজিদ অবস্থিত। বর্গাকৃতি মসজিদের বাইরের দিক থেকে প্রত্যেক পাশের থেকে দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট এবং ভেতরের দিক থেকে ২৫ ফুট। দেয়ালগুলো প্রায় ৮ ফুট করে চওড়া। ছাদের কেন্দ্রস্থলের রয়েছে বড় একটি গম্বুজ।

ষাটগম্বুজ মসজিদের পার্শ্ববর্তী চুনাখোলা মসজিদ।
চিত্র: চুনাখোলা মসজিদ; চিত্রসূত্র – CGTN

মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে একটি করে প্রবেশপথ এবং পূর্বপাশের দেয়ালে ৩টি প্রবেশপথ আছে। আর প্রবেশপথগুলো বরাবর পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মিহরাব। মাঝের মিহরাবটি অপেক্ষাকৃত বড় আকৃতির। প্রতিটি মিহরাব সজ্জিত করা হয়েছে নানারকম ফুল ও লতাপাতার টেরাকোটায়।

খলিফাতাবাদ ও ষাটগম্বুজ মসজিদ: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য- এর শেষ পর্বটি পড়ার জন্য চোখ রাখুন অসামান্যতে।

তথ্যসূত্র –

ফিচার ছবিসূত্র: ArchaeologyBD

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on খলিফাতাবাদ ও ষাটগম্বুজ মসজিদ: ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য (পর্ব-২)

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!