প্রচ্ছদচিত্র

কৃষ্ণসাগরে মিসরীয় নৌবাহিনী: রুশ, মিসরীয় এবং তুর্কি ভূরাজনীতির এক ঝলক

4.4
(8)
Bookmark

No account yet? Register

২০২০ সালের অক্টোবরে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে যে, কৃষ্ণসাগরে শীঘ্রই রুশ ও মিসরীয় নৌবাহিনীর যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে রুশ নৌবাহিনীর কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের প্রেস অফিস জানায়, ‘ব্রিজ অফ ফ্রেন্ডশিপ–২০২০’ নামক এই মহড়াটি আরম্ভ হওয়ার পর থেকে বছরের বাকি সময় পর্যন্ত চলবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এটি কৃষ্ণসাগরে মিসরীয় নৌবাহিনীর প্রথম সামরিক মহড়া। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ভুক্ত এবং সৌদি–ইমারাতি–ইসরায়েলি অক্ষের ঘনিষ্ঠ মিত্র মিসর কেন হঠাৎ রুশ সীমান্তবর্তী কৃষ্ণসাগরে রুশদের সঙ্গে মহড়ায় অংশ নেবে? রুশরাই বা কেন মিসরীয়দের নিজস্ব জলসীমায় আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসবে?

অসামান্যতে লিখুন

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদেরকে একটু কয়েক দশক আগে ফিরে যেতে হবে। ১৯৫০ ও ১৯৬০–এর দশকে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আরব ও মুসলিম বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে মিসরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র মিসর সোভিয়েত ভূমধ্যসাগরীয় নৌবহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। মিসরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রচুর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল মিসরীয় সশস্ত্রবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রের মূল উৎস। তদুপরি, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের আরব–ইসরায়েলি যুদ্ধ এবং ১৯৬৭–১৯৭০ সালের আরব–ইসরায়েলি সংঘর্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন মিসরকে সক্রিয় সহায়তা প্রদান করেছিল।

কিন্তু ১৯৭০ সালে মিসরীয় রাষ্ট্রপতি জামাল আব্দেল নাসেরের মৃত্যুর পর সোভিয়েত–মিসরীয় সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং ১৯৭২ সালে মিসরীয় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত মিসর থেকে সোভিয়েত উপদেষ্টাদের বহিষ্কার ও সোভিয়েত ঘাঁটিগুলো উচ্ছেদ করেন। ১৯৭৩ সালের আরব–ইসরায়েলি যুদ্ধের পর মিসর পুরোপুরিভাবে মার্কিন বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়। অবশ্য ১৯৮১ সালে সাদাত খুন হওয়ার পর মিসরের নতুন রাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন। পরবর্তীতে তিনি রাশিয়ার সঙ্গেও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন যদিও মিসর স্পষ্টভাবে মার্কিন বলয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১৯৬৪ সালে মিসরে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং মিসরীয় রাষ্ট্রপতি জামাল আব্দেল নাসের
১৯৬৪ সালে মিসরে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং মিসরীয় রাষ্ট্রপতি জামাল আব্দেল নাসের। চিত্রসূত্র: Valery Shustov/revoltvisual via Soviet Visuals

২০১১ সালে ‘আরব বসন্তে’র সময় মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হন। ‘ইখওয়ান–উল–মুসলিমিন’–এর (মুসলিম ব্রাদারহুড) সমর্থনপুষ্ট মোহাম্মদ মুরসি মিসরের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৩ সালে মিসরীয় সেনাপ্রধান আব্দেল ফাত্তাহ আল–সিসি একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন, এবং মিসরের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। তাঁর শাসনামলে মিসরের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। কারণ মিসর আবার রাশিয়ার সঙ্গে সোভিয়েত আমলের অনুরূপ ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ইচ্ছা ব্যক্ত করে।

বিগত প্রায় সাত বছরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নানাবিধ পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মস্কো ও কায়রো একটি ঘনিষ্ঠ সহযোগিতামূলক সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। মিসর রাশিয়া থেকে অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ের পরিমাণ বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্যাঙ্ক, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও অন্যান্য ভারী অস্ত্রশস্ত্র। ২০১৫ সাল থেকে রাশিয়া ও মিসর ভূমধ্যসাগরে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। ২০১৮ সালে মিসর রাশিয়ার কাছ থেকে ২৪টি অত্যাধুনিক ‘সুখোই সু–৩৫’ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের জন্য ২০০ কোটি (বা ২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। ২০২০ সালে রাশিয়া মিসরকে এই যুদ্ধবিমান সরবরাহ শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রুশ যুদ্ধবিমান না কেনার জন্য মিসরকে সতর্ক করেছিল এবং মিসরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকিও দিয়েছিল।  কিন্তু মিসর তাতে কর্ণপাত করে নি।

বস্তুত বেশ কয়েকটি কারণে মিসর ও সিরিয়া পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছে।

প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের জন্য সক্রিয় হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে সিরিয়ায় মিলিট্যান্টদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে। এর পাশাপাশি মস্কো লিবিয়ায় খলিফা হাফতারের ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ (এলএনএ) এবং সুদানের ‘ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’কে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ মার্সেনারিদের মোতায়েন করেছে। মস্কোর বিভিন্ন উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি উদ্দেশ্য হলো মিলিট্যান্টদের দমন করা। মিসরের সিনাই উপদ্বীপেও মিলিট্যান্টরা একটি বিদ্রোহ শুরু করেছে। কিন্তু মিসরীয় সরকার এই বিদ্রোহ দমনের ক্ষেত্রে এখনো সফল হতে পারে নি। এমতাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে মিলিট্যান্টদের প্রভাব বিস্তার রোধ করার জন্য মস্কো ও কায়রো পরস্পরকে সহযোগী হিসেবে আবিষ্কার করেছে।

মিসর রাশিয়ার কাছ থেকে ২৪টি অত্যাধুনিক 'সু–৩৫' যুদ্ধবিমান ক্রয় করেছে
মিসর রাশিয়ার কাছ থেকে ২৪টি অত্যাধুনিক ‘সু–৩৫’ যুদ্ধবিমান ক্রয় করেছে। চিত্রসূত্র: Yuri Kadobonov/AFP via Getty Images

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া ও মিসর অভিন্ন পক্ষ অবলম্বন করেছে। সিরিয়ায় রুশ অভিযানের প্রতি মিসর সমর্থন ব্যক্ত করেছে। লিবিয়ায় রাশিয়া ও মিসর উভয়েই এলএনএ–কে সমর্থন দিচ্ছে। সুদানেও উভয় রাষ্ট্র ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের সমর্থক। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই কায়রো ও মস্কো পরস্পরের নিকটবর্তী হয়েছে।

তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের কিছু কিছু একনায়কদের দৃষ্টিতে তাদের মর্যাদা হারিয়েছে। আরব বসন্তের সময় ওয়াশিংটন তাদের দীর্ঘকালীন মিত্র মোবারককে সহায়তা করে নি। অন্যদিকে মস্কো সিরীয় সরকারকে রক্ষা করতে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। ওয়াশিংটন ইসরায়েলের নিকট অত্যাধুনিক ‘এফ–৩৫’ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করতে রাজি হলেও মিসরকে সেটি সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এটিকে মিসরীয় সামরিক কর্মকর্তারা ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মার্কিন–নিয়ন্ত্রিত আইএমএফ সম্প্রতি মিসরের ওপর নানাবিধ অর্থনৈতিক বাধানিষেধ আরোপ করেছে। তদুপরি, সাম্প্রতিক কোভিড–১৯ মহামারীর প্রেক্ষাপটে রাশিয়া মিসরকে ভ্যাক্সিন সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মস্কো নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর কাছে ওয়াশিংটনের চেয়ে বেশি ‘নির্ভরযোগ্য’ মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

সর্বোপরি, তুর্কি–মিসরীয় দ্বন্দ্বও রুশ–মিসরীয় সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তুরস্ক মিসরের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মুরসির ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। মুরসির পতন ছিল তুরস্কের জন্য একটি বড় পরাজয় (এবং সৌদি–ইমারাতি–ইসরায়েলি অক্ষের বিজয়)। ফলে মুরসির পতনের পর আঙ্কারা ও কায়রোর সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত হয়ে ওঠে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের জ্বালানি সম্পদের অধিকার নিয়েও তুরস্কের সঙ্গে মিসরের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে তুরস্ক ও লিবিয়ার ‘গভর্নমেন্ট অফ ন্যাশনাল অ্যাকর্ড’–এর (জিএনএ) সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিস্তৃত অঞ্চলে তুর্কি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে মিসর (এবং গ্রিস, সাইপ্রাস, ফ্রান্স ও ইসরায়েল) তুরস্কের ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন: অক্টোবর বিপ্লব: সমাজতান্ত্রিক মহাবিপ্লব না ‘জার্মান ষড়যন্ত্র’? (পর্ব ১)

মিসরীয় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসি এবং তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান
মিসরীয় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসি এবং তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। চিত্রসূত্র: Anadolu Agency

তদুপরি, তুরস্ক ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জিএনএ–এর পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে। এর ফলে যুদ্ধের চাকা এলএনএ–র বিপক্ষে ঘুরে গেছে। মিসর সরাসরি হুমকি দিয়েছিল যে, তুর্কি–নিয়ন্ত্রিত যোদ্ধারা যদি এলএনএ–নিয়ন্ত্রিত সিরত ও আল–জুফরায় প্রবেশ করে, তাহলে মিসর সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগস্টে যুদ্ধবিরতি হয়েছে। পাশাপাশি উভয় পক্ষ মিসরের মধ্যস্থতায় আলোচনায় লিপ্ত হয়েছে। যদিও চূড়ান্ত কোনো ফলাফলের এখনো অনেক দেরি। এছাড়াও নীলনদের ওপর বাঁধ নির্মাণের ইথিওপীয় প্রকল্পকে তুরস্ক সমর্থন দিচ্ছে। এটিকে মিসর (ও সুদান) নিজেদের জন্য ‘গুরুতর হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করে।

তুরস্ক ও মিসরের প্রচারমাধ্যমও একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়া অংশত রাষ্ট্র দুইটির জনমতের ওপরও পড়েছে। কাতারভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, মিসরীয়রা সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে তুরস্ককে।

অন্যদিকে, রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার এক মিশ্র সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। রাশিয়া দক্ষিণ–পূর্ব ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহের জন্য তুরস্কের মধ্য দিয়ে ‘তুর্কস্ট্রিম’ পাইপলাইন নির্মাণ করছে। সেই সাথে রাশিয়া তুরস্কের কাছে অত্যাধুনিক ‘এস–৪০০’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বিক্রি করছে। কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতাই ক্রমশ মুখ্য হয়ে উঠছে। সিরিয়ায় রাশিয়া সিরীয় সরকারের পক্ষে এবং তুরস্ক সিরীয় মিলিট্যান্টদের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে। লিবিয়ায় রুশ মার্সেনারিরা এলএনএ–র পক্ষে এবং তুরস্ক জিএনএ–র পক্ষে যুদ্ধ করছে। সর্বশেষ নাগরনো–কারাবাখে তুরস্ক রুশ মিত্র আর্মেনিয়া ও রুশ অংশীদার আজারবাইজানের মধ্যে সংঘর্ষ উস্কে দিয়েছে। এর ফলে মস্কো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছে।

২০১৯ সালে ভূমধ্যসাগরে রুশ–মিসরীয় 'ব্রিজ অফ ফ্রেন্ডশিপ–২০১৯' যৌথ মহড়ার সময় একদল রুশ ও মিসরীয় নাবিক
২০১৯ সালে ভূমধ্যসাগরে রুশ–মিসরীয় ‘ব্রিজ অফ ফ্রেন্ডশিপ–২০১৯’ যৌথ মহড়ার সময় একদল রুশ ও মিসরীয় নাবিক। চিত্রসূত্র: Al-Arabiya

রুশ–তুর্কি ও মিসরীয়–তুর্কি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে মস্কো কায়রোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতি। রাশিয়া ও তুরস্ক উভয়ের সঙ্গেই কৃষ্ণসাগরের সীমানা রয়েছে। কিন্তু কৃষ্ণসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরের প্রবেশপথ (বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালীদ্বয়, ‘তুর্কি প্রণালীসমূহ’ নামে পরিচিত) তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে। তুরস্ক রুশবিরোধী মার্কিন–নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য। এজন্য কৃষ্ণসাগরে ন্যাটো–রাশিয়া দ্বন্দ্বও বরাবরই উপস্থিত।

এজন্য রাশিয়া কৃষ্ণসাগরে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর। রুশরা তাদের কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরকে ক্রমশ শক্তিশালী করে তুলছে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয়ার পর কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে রুশ প্রভাব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে ঐ অঞ্চলের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের ওপর রুশ নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে রুশ ভূকৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে এবং রুশ রাডার ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলোর পাল্লা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কৃষ্ণসাগরে রুশ প্রভাব বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ন্যাটোও এতদঞ্চলে তার উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে। ২০২০ সালের জুলাইয়ে ন্যাটো সদস্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, স্পেন ও নরওয়ে এবং মার্কিন মিত্র ইউক্রেন ও জর্জিয়া কৃষ্ণসাগরে তাদের সর্বশেষ সামরিক মহড়া শেষ করেছে। এটি রুশরা ভালোভাবে নেয় নি। অন্যদিকে, আজারবাইজানে তুর্কি প্রভাব বিস্তার এবং মধ্য এশিয়ায় তুর্কি প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা কৃষ্ণসাগর–কাস্পিয়ান সাগর অক্ষ বরাবর রুশ প্রভাব বিস্তারকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

কৃষ্ণসাগরে রুশ–মিসরীয় মহড়ার প্রত্যুত্তরে তুরস্ক রুশ–নির্মিত 'এস–৪০০ ত্রিউম্ফ' ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা করেছে
কৃষ্ণসাগরে রুশ–মিসরীয় মহড়ার প্রত্যুত্তরে তুরস্ক রুশ–নির্মিত ‘এস–৪০০ ত্রিউম্ফ’ ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। চিত্রসূত্র: AFP via Al-Jazeera

এমতাবস্থায় তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী মিসরকে কৃষ্ণসাগরে নৌ মহড়া চালানোর সুযোগ করে দিয়ে এবং এই বিষয়টির প্রচারণা চালিয়ে মস্কো তুরস্ককে একটি সতর্কবার্তা দিতে চাইছে। তুরস্ক কৃষ্ণসাগরকে ‘নিজস্ব কৌশলগত গভীরতা’র অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই অঞ্চলে মিসরীয় সামরিক উপস্থিতি তুর্কিদের জন্য মোটেই কাম্য নয়। রুশ–মিসরীয় মহড়ার প্রত্যুত্তরে তুর্কিরা কৃষ্ণসাগরের উপকূলে পালটা সামরিক মহড়া চালিয়েছে। এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও রুশ–নির্মিত ‘এস–৪০০’ ক্ষেপনাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। ব্যাপারটি অদ্ভুত যে, রুশ–মিসরীয় মহড়ার প্রত্যুত্তরে তুর্কিরা রুশদের তৈরি ক্ষেপনাস্ত্রই পরীক্ষা করেছে।

অন্যদিকে, মিসরও এই মহড়া থেকে লাভবান হবে। এটি কৃষ্ণসাগরে মিসরীয় নৌবাহিনীর প্রথম মহড়া, এবং মিসরের আকাশসীমা থেকে প্রায় ৩,০০০ কি.মি. দূরে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। এর ফলে মিসরীয় নৌ ও বিমানবাহিনী নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। এর পাশাপাশি তুরস্কের কাছেও একটি নীরব সতর্কবার্তা পৌঁছাবে যে, “তুরস্ক যদি মিসরের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে হস্তক্ষেপ করতে থাকে, তাহলে মিসরও তুরস্কের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে হস্তক্ষেপ করবে।”

অবশ্য মিসরীয় পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করে নি। এটিও তুরস্কের জন্য মিসরের এক ধরনের বার্তা বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। লিবিয়ায় বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা স্থাপনের জন্য মিসরীয়রা চেষ্টা চালাচ্ছে।  এজন্য এই মুহূর্তে মিসর তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি কোনো সংঘাতে যেতে ইচ্ছুক নয়। এই পরিস্থিতিতে মিসর একদিকে কৃষ্ণসাগরে মহড়ায় অংশ নিচ্ছে, অন্যদিকে সেটির প্রচারণা চালানো থেকে বিরত থাকছে।

২০১৩ সালে আব্দেল ফাত্তাহ আল–সিসির উত্থানের পর থেকে মিসর ও রাশিয়ার সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হয়েছে
২০১৩ সালে আব্দেল ফাত্তাহ আল–সিসির উত্থানের পর থেকে মিসর ও রাশিয়ার সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হয়েছে। চিত্রসূত্র: AP via Egyptian Streets

কিন্তু মিসরীয় সামরিক বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে তুর্কিবিরোধী বক্তব্য প্রদান করছেন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক তারেক ফাহমির মতে, তুর্কি ‘ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ প্রতিহত করার জন্য মিসর এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। মিসরীয় সামরিক বিশ্লেষক নাবিল মুহাররামের মতে, এই মহড়ায় অংশ নিয়ে মিসর এতদঞ্চলে একটি ‘ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ‘ইজিপ্সিয়ান সেন্টার ফর ফরেন অ্যাফেয়ার্সে’র বিশ্লেষক আইমান সালামার মতে, এই মহড়া তুরস্কের বিপরীতে ‘রুশ–মিসরীয় কৌশলগত অংশীদারিত্ব’কে আরো গভীর করবে। মিসরীয় মেজর জেনারেল ও ‘নাসের হাই মিলিটারি অ্যাকাডেমি’র বিশ্লেষক জামাল মাজলুমের মতে, এই মহড়ায় মিসরীয় নৌবাহিনী রুশ নৌবাহিনীর চেয়ে বেশি লাভবান হবে।

সামগ্রিকভাবে, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতি এখন আরো জট পাকিয়ে গেছে। রুশরা সিরিয়ায় তুর্কি সৈন্যদের ওপর এয়ারস্ট্রাইক চালায়, আবার রুশ সৈন্যরা তুর্কি সৈন্যদের সঙ্গে যৌথ টহলেও অংশ নেয়। তুরস্ক ও মিসর উভয়েই রুশ অস্ত্র ক্রয় করে তাদের মূল মিত্ররাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হয়, অথচ রাষ্ট্র দুইটির মধ্যেকার সম্পর্ক খুবই খারাপ। তুর্কিরা সৌদি–ইমারাতি–ইসরায়েলি অক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার দায়ে মিসরকে অভিযুক্ত করে, অথচ নিজেরা ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ায় এবং রুশ মিত্র আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে আজারবাইজানকে সমর্থন করে। এই পরিস্থিতিতে কৃষ্ণসাগরে রুশ–মিসরীয় যৌথ মহড়া এবং রুশ–মিসরীয় সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির জটকে খুলবে তো না–ই, উল্টো আরো বেশি করে জট পাকিয়ে দিবে।

তথ্যসূত্র:

প্রচ্ছদসূত্র: Middle-East Online

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on কৃষ্ণসাগরে মিসরীয় নৌবাহিনী: রুশ, মিসরীয় এবং তুর্কি ভূরাজনীতির এক ঝলক

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!