কুহেলিকা

কুহেলিকা: এক প্রেমিক, এক বিপ্লবী ও এক সন্তানের গল্প

4.7
(3)
Bookmark

No account yet? Register

কুহেলিকা। কাজী নজরুল ইসলাম এর পাঠকনন্দিত সমকালীন এক উপন্যাস। বাঙালী পাঠক মাত্রই উপন্যাস প্রিয় হলেও বিদ্রোহী কবির কবিতা যতটা পাঠকমহলে সমাদৃত, তার উপন্যাস ততটা নয়। কুহেলিকার ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটেছে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সময়কাল মাত্র ৭ দিনের মতো হলেও কবি তার বর্ণনা গুণ দ্বারা অনেক বিস্তৃত করেছেন।

যুবক কাজি নজরুল ইসলাম
যুবক কাজী নজরুল ইসলাম; চিত্রসূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন

উপন্যাসের শুরুটা হয় কোন এক মেসে। ২০-২২ জন তরুণের কোনো  এক বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে। আলোচনার বিষয় ‘নারী’। কবি হারুন এর কাছ থেকেই শুরু হয় নারী বিষয়ক এ আলোচনা। নারীকে তিনি ভূষিত করেন কুহেলিকা হিসেবে। একই নারী কে আমজাদ উপাধী দেন প্রহেলিকা হিসেবে। এভাবেই এগিয়ে যায় নারী। কখনো নায়িকা, কখনো দেবী। নারীর উপাধীভূষণ কার্যে বাধা হয়ে আসে গুড়ের সন্দেশ, লুচি ও চা। এ তিনের দিকেই ধাবিত হয়ে যায় উপাধিদাতা যুবকদের মন। তাই তো লেখক বলেছেন,

যুবকদের কাছে নারী অপেক্ষা গুড়ের সন্দেশ ও চা ঢের প্রিয়।’

আমাদের গল্পের নায়ক জাহাঙ্গীর। জমিদারপুত্র এবং জমিদারপুত্র নয়। একজন বিপ্লবীও সে। জাহাঙ্গীর তার বিল্পবী মন্ত্রের দীক্ষা নেয় তার শিক্ষক প্রমত্ত দার কাছ থেকে। নিজের কোন এক বিপ্লবী কাজে গ্রামে যাওয়ার কথা জাহাঙ্গীরের। তাই সে রওনা হয় হারুনের সাথে তাদের গ্রামে। অন্ধ পিতা ও উন্মাদিনী মাতার এক সন্তান হারুন। সিদ্ধান্ত হয় হারুনদের বাড়িতেই থাকবে সে। সেখানে তার দেখা হয় হারুনের দুই বোন ভূণী, তহমিনা ও তার একভাই মোবারকের সাথে। ঠিকঠাকই চলছিল সবকিছু কিন্তু বিপত্তি বাঁধায় হারুনের মা, যা পরবর্তীতে বড় পরিবর্তন ঘটায় জাহাঙ্গীরের জীবনে।

হারুনের এক বড়ভাই ছিল মিনা নামে। তের বৎসর বয়সে মারা যায় সে। ঠিক এই ভাইয়ের কারণে উন্মাদ হয়ে যায় হারুনের মা। জাহাঙ্গীর কে দেখা মাত্র যেন মিনাকেই পেয়ে বসেন হারুনের মা। বলতে থাকেন, ‘খোকা এসেছিস! খোকা এসেছিস!’

ঠিক তার পরদিন  দুপুরবেলা জাহাঙ্গীর তার আনা উপহারগুলো দেয় হারুনের পরিবারের মানুষজনকে। ভূণীর জন্য আনা শাড়ীটা পড়ে ভূণী যখন জাহাঙ্গীর কে সালাম করতে যায়, তখন হঠাৎ করেই হারুনের মা বিছানা থেকে নেমে কণ্যার হাত ধরে জাহাঙ্গীরের হাতে দিয়ে কাঁদতে  কাঁদতে বলেন,

‘বাবা! ওপরে আল্লা, নীচে তুমি!  আমার তহুমিনাকে তোমার হাতেই সঁপে দিলাম। দেখো বাবা ও যেন কষ্ট না পায়! ওই আমার মিনা!  আমার নয়নের মণি!’

ভূণীর প্রতি জাহাঙ্গীর এর মনে দুর্বল জায়গা লেখক সৃষ্টি করেন নি সে কথা আমরা বলতে পারি না। কিন্তু তাতে কি হবে প্রেম ধর্মের চেয়ে তো স্বদেশ ধর্ম অনেক বড়। জাহাঙ্গীর যে বিপ্লবী। আর বিপ্লবীদের তো বাঁধনে জড়াতে নেই। চলে আসে জাহাঙ্গীর। কলিকাতায় চলে আসে।

কুহেলিকা
কুহেলিকা; ছবিসূত্র: ফেসবুক/কুহেলিকা

কলিকাতায়  তার জন্য অপেক্ষা করছিল আরো এক চমক। মেসে গিয়ে জানতে পারে ইতিমধ্যেই মায়ের দুটো টেলিগ্রাম এসে পড়েছে। মায়ের সাথে দেখা করে সে।  হারুনদের বাড়ী থেকে আসার সময় ভূণীর সাথে চিঠি চালাচালি হয় তার। আর সেই ভূণীর পাঠানো চিঠি দেখে ফেলে জাহাঙ্গীর এর মা। রুদ্রসম চিত্তের অধিকারী ভূণীর একান্তই দাবী যে জাহাঙ্গীর ভূণীকে ত্যাগ করে চলে আসলে সেই জাহাঙ্গীরের অভিভাবিকা জননী এসে যেদিন ডাকবেন সেদিনই সে যাবে হারুনদের বাসায়।

সন্ন্যাসী প্রায় ছেলের কাছে এ চিঠি দেখে বেশ খুশিই হয় মা। এর পরের ঘটনা খানিকটা প্রত্যাশিতই। জাহাঙ্গীর এর পাশাপাশি রাজি হয়ে যায় ভূণীও। কথা হয় ২৪ পরগণার রায়েদের যে জমিদারি বিক্রি হচ্ছে সেখানে ম্যানেজার হিসেবে হারুনও যাবে তাদের সাথে।

কিন্তু কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল জাহাঙ্গীরের গ্রেফতার ও ফাঁসি হওয়াটা।

প্রবীণ বয়সে বাংলাদেশের জাতীয় কবি
প্রবীণ বয়সে বাংলাদেশের জাতীয় কবি; চিত্রসূত্র: বিডিনিউজ২৪/মতামত

জাহাঙ্গীর: আমাদের এ গল্পের নায়ক জাহাঙ্গীর। শুরুতেই বলেছি এ উপন্যাস এক প্রেমিক, এক বিপ্লবী ও এক সন্তানের।

সন্তানের কথায় আসি। জাহাঙ্গীরের পিতা ছিলেন কুমিল্লার এক বিখ্যাত জমিদার। তাই বেশ ভালোই বাধাবিপত্তিহীন ভাবে কাটছিল তার জীবন। কিন্তু বাঁধ সাধে তার বাবার মৃত্যু। শান্ত সমুদ্রে হঠাৎ ঝড় উঠলে সমুদ্রে যে ভয়াবহ তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, জাহাঙ্গীরের মনেও একই পরিমাণ তরঙ্গ প্রবাহিত হতে লাগল। সে জানতে পারল সে তার পিতার পুত্র নয়, তার পিতা খান বাহাদুরের পুত্র নয় সে। সে জারজ। তাহার মাতা বাঈজী। তার পিতার রক্ষিতা। এই সত্য অনেক পীড়া দেয় তাকে। তবে এই নিষ্ঠুর সত্যই  কাজ করে জাহাঙ্গীরের বিপ্লবী জীবনের ভিত্তি হিসেবে।

যদি জাহাঙ্গীর এর প্রেমিক সত্তার কথা চিন্তা করি তাহলে তহমিনার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের প্রেম হয়তো লেখক প্রথম দেখাতেই করে দিয়েছিলেন। অন্তত লেখকের এই কথাতে এমনই মনে হয়, ‘ নারী, তাহাকে সে যেমন অশ্রদ্ধা করে তেমনি ভালোও বাসে, উহারা সুন্দর যাদুকরী। জাহাঙ্গীর এর রক্ত টগবগ করিয়া ফুটিয়া উঠে, দেহের মাংসপেশী সমূহ প্রস্তর কঠিন হইয়া  উঠে। একবার মনে করে,  ঐ সুন্দর চোখের জীবগুলো কে নির্মম হস্তে সে হত্যা করতে পারে। উহাদের চোখ সুন্দর, উহাদের মন ছলনায় কুটিল।’

নিজেকে নিজের মধ্যেই হয়তো দমিয়ে রাখত জাহাঙ্গীর। কিন্তু বাঁধ সাধে ভূণীর মা। ওই যে ভূণীকে জাহাঙ্গীর এর হাতে সঁপে দেয়। তার এই কাজই বিপ্লবী জাহাঙ্গীরের প্রেমের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। তাই তো এই ঘটনার পর জাহাঙ্গীর  যখন হারুনদের বাড়ি ছাড়ে সেই সময় ও গাড়োয়ানের হাতে করে নিজ প্রেয়সীর জন্য চিঠি পাঠায় সে। যদি প্রেমিক নাই হতো, যদি ভালোবাসা নাই থাকত তাহলে কেন পাঠাতো এ চিঠি।

বিপ্লবী জাহাঙ্গীর: এবার আসি তার আসল চরিত্রে। এ চরিত্র দেয় না সন্তানের দায়িত্ব পালনের অধিকার, প্রেমিকের দায়িত্ব পালনের অধিকার। কিন্তু কীভাবে জমিদার পুত্র জাহাঙ্গীর বেছে নিল এ বিপ্লবীর পথ উত্তর পেতে হলে যেতে হবে জাহাঙ্গীর এর শৈশবে। 

বলা বাহুল্য তৎকালীন সময়ে মুসলমান কেউ বিপ্লবী হতে পারে এমন কিছু কল্পনা করাটাই ছিল অতিমাত্রিক। এটি একই সঙ্গে বেশ বড় সুবিধাও হয়ে আসে জাহাঙ্গীরের জীবনে। বেশ কয়েকবার মুসলমান হওয়ায় পুলিশের সন্দেহ করে না তাকে। খুব ছোটবেলায় জাহাঙ্গীর এই দীক্ষা নেয় তার শিক্ষক প্রমত্তদার কাছে। নিজেদের ছাত্রদেরকে এভাবেই গড়ে তুলেছিলেন প্রমত্তদা। প্রমত্তদার সঙ্গে শেষপর্যন্তই যোগাযোগ ছিল তার। হারুনদের বাড়িতেও জাহাঙ্গীর এই কাজেই গিয়েছিল।

হারুন: হারুন আমাদের এ গল্পের অন্যতম চরিত্র। জাহাঙ্গীরের বন্ধু হিসেবে তার পথ চলা শুরু হলেও তহমিনার ভাই হিসেবেই তার ভূমিকা বেশি প্রসিদ্ধ। যদি হারুনের তহমিনার প্রেমের কারণ ও আমরা তাকে বলতে পারি, কারণ তার কারণেই তো তহমিনার দেখা পেয়েছিল জাহাঙ্গীর।

তহমিনা: আমাদের উপন্যাসের নায়িকা। এ উপন্যাসে  আমরা তার একাধিক রুপ দেখতে পাই। কখনো সে বজ্রকঠিন আবার কখনো কুসুমকোমল। 

হারুন কে দেওয়া চিঠির কথাই যদি চিন্তা করি, সেখানে কি সে তার বজ্রকঠিন চিত্তের পরিচয় দেয় নি? ঐশ্বর্যমন্ডিত হারুন যখন তাকে  ত্যাগ করে আবার তার জন্য চিঠি লিখেছিল, তখন কি সে তার প্রত্যুত্তরে বলে নি,

 বাহিরের ঐশ্বর্যের দম্ভ আমার নাই,আমরা দরিদ্র ; কিন্তু অন্তরের ঐশ্বর্যের গৌরব আমার অন্তত আপনার অপেক্ষা কম নাই’

সে কি হারুন কে উদ্দেশ্য করে লিখে নাই

‘যে অধিকার আমার মা আপনাকে দিয়াছেন – সে অধিকারের দাবী লইয়া যেদিন শুধু আপনি নয় আপনার অভিভাবিকা জননী আসিয়া ডাকিবেন সেইদিন হয়তো যাইতে পারি। ’

আমরা তার এ সকল কথাগুলোয় তার বজ্রকঠিন চিত্তের পরিচয় পাই না? অবশ্যই পাই! এত বজ্রময় চিত্তের অধিকারী তহমিনার গল্প। এবার না হয় দেখে নেয়া যাক একই তহমিনার কুসুমকোমল চরিত্র কে। যে তহমিনা জাহাঙ্গীরের সাথে যাওয়ার ব্যাপারেও তার বাবা কে বলেছিল, ‘তুমি ভুলে যাচ্ছ বাবা, আমার বাপ দাদার আজ অর্থ না থাকলেও বংশ গৌরবে তারা তাদের চেয়েও অনেক বড়। বাড়ী বয়ে তারা তাদের ঐশ্বর্যের দর্প দেখাতে আসবেন এ তোমরা সইলেও আমি সইতে পারব না।’ সেই তহমিনাই জাহাঙ্গীর এর মাতার স্পর্শে আসিয়া কেমন যেন গলিয়া গেল। তাহার পুত্রবধূ হওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করল সে। মূহুর্তের মধ্যেই কি আমূল পরিবর্তন! সত্যিই এ চরিত্র বোঝা বড় দুস্কর।

প্রমত্ত: প্রমত্তদা আমাদের এ উপন্যাসের বিপ্লবী চরিত্রদের মধ্যে অন্যতম। আমাদের নায়কের গুরু। যার কাছ থেকে বিপ্লবী মন্ত্রের শিক্ষা নিয়েছিল জাহাঙ্গীর। যেখানে সবাই মুসলমান বিপ্লবীকে দলে নিতে নারাজ, তখন প্রমত্ত দার একক প্রচেষ্টাতেই বিপ্লবী জীবনের পূর্ণতা পায় জাহাঙ্গীরের। বেশ ছোটকাল থেকেই নিজের ছাত্রদের মন এভাবেই গড়ে তুলেছিলেন প্রমত্তদা যেন দেশমাতৃকার সেবায় যেকোনো মূহুর্তে উৎসর্গ করতে পারে নিজের জীবন। জীবনের কোন এক পর্যায়ে যখন জাহাঙ্গীর তার জন্মপরিচয় জানতে পারে  তখন নিজেকেই ঘৃণা করতে থাকে জাহাঙ্গীর। নিজেকে সে ভাবে অস্পৃশ্য অশুচি। প্রমত্তদার কাছে গিয়ে সে বলল,

আমি এ পবিত্র ব্রত নিতে পারি না প্রমত্তদা। না জেনে নিয়েছিলাম, তার জন্য যা শাস্তি দিবেন দিন। আমার রক্ত অপবিত্র, আমি জারজ পুত্র।

অন্ধকারে নিমজ্জিত অবস্থায় কারো বলিষ্ঠ হাত পেলে আঁধারে থাকা ব্যক্তির যা অনূভুতি হয় জাহাঙ্গীর কে ও ঠিক একই ভরসা দিল প্রমত্তদা। বিপদগামী জাহাঙ্গীর কে বাচিয়ে দিল প্রমত্তদা। তিনি বলেন,

‘যদি লজ্জা হতে হয় যদি প্রায়শ্চিত্তই করতে হয় ত তা করেছে, করবে বা করবে তারা, যারা এর জন্য দায়ী। কোন অসহায় মানুষই তো এর জন্য দায়ী নয়।’

ফিরদৌস বেগম: ফিরদৌস বেগম আমাদের নায়কের মাতা, বেগম সাহেবা। জমিদারজীর মৃত্যুর পর শুধু যে জাহাঙ্গীরই জারজ পুত্রের অপবাদ পেয়েছিল তা নয় বরং ফিরদৌস বেগমের বাঈজী চরিত্রও প্রকাশিত হয়েছিল। জাহাঙ্গীর এর পিতা ফররোখ সাহেবের মৃত্যুর পর তার পিসতুতো ভাইয়েরা তার সম্পত্তির ভাগ চেয়ে যখন মামলা করেছিল, তখন এই কলঙ্ক বেশিদূর গড়বার আগেই এটি চাপা দিয়ে দেন ফিরদৌস বেগম। এ উপন্যাসে তার সবচেয়ে সার্থক ব্যবহার কাজী নজরুল ইসলাম বোধহয় এখানেই করেছিলেন। 

জয়তিদি ও চম্পা: জয়তিদি। জাহাঙ্গীর এর শ্রদ্ধার চোখে দেখা প্রথম নারী। শুধু কী তাই যে নারী কে অশ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় করত সে, সেই জাহাঙ্গীরই জয়তিদি কে দেখিয়া বলেছিল, 

‘নারী যদি নাগিনী হয় তুমি নাগেশ্বরী ’ 

অন্যদের সঙ্গে জয়দিদির পার্থক্য বোঝার জন্য এই লাইনটাই যথেষ্ট।  

জয়তিদির ভূমিকা শুধু এখান পর্যন্তই নয়। বিপ্লবী পিণাক পানির মাসিমা তিনি। সেই পিণাক পানি  যে কিনা ফাঁসির মঞ্চে দাড়িয়েও বলেছিল,

 ‘আমি চাই ভারতের স্বাধীনতা দেখতে! ’ 

তিনি বিপ্লবীদের শক্তিস্বরুপা।

যদি চম্পার কথা বলতে যাই তাহলে তার ভূমিকা এ উপন্যাসে খুবই সামান্য। জয়তিদির কন্যা সে। আরো একজন বিপ্লবী। 

আরও পড়ুন: হ্যারি পটার: এক বিশ্বখ্যাত কাল্পনিক জাদুকর চরিত্রের আখ্যান

কিছু উক্তি: এবার আসি উপন্যাসের কিছু কথামালায়। কিছু উক্তিতে। এগুলোই তো উপন্যাসের প্রাণ।

জাহাঙ্গীর তখন সবেমাত্র হেটে এসে হারুনের গ্রামে এসে পৌঁছেছে। তার সারা গায়ে ধূলাবালি। হারুন যখন তাকে হাত-পা ধুয়ে বলে তখন সে বলল, 

‘না ভাই। এ ধূলো আর ধুচ্ছি নে পথে। বাংলার পথের ধূলো আমার বেদনাতুর পথিকের পায়ের ধূলো— ও শুধু বুক পর্যন্ত কেন মাথা পর্যন্ত উঠলেও আমি ধন্য হয়ে যেতাম! পবিত্র ধূলো কি তাড়াতাড়ি মুছতে আছে ভাই?’

সত্যিই এ বাংলার ভূমি পরম পবিত্র।  

উপন্যাসের নামই তো কুহেলিকা। শুনলে অনেকটা নারীবাচক শব্দই মনে হয় । আর এখানে নারী নিয়ে কথা থাকবে না তা কি হয়? 

হারুন কে দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন,  

নারী শুধু ইঙ্গিত, সে প্রকাশ নয়। নারী কে আমরা দেখি বেলাভূমে দাঁড়িয়ে মহাসিন্ধু দেখার মতো। তীরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের যতটুকু দেখা যায় আমরা নারীকে দেখি ততটুকুই। সমুদ্রের মাঝে আমরা যতটুকু নামতে পারি নারীর মাঝে ডুবি ততটুকুই। সে সর্বদা রহস্যের পর রহস্যের জাল দিয়ে নিজেকে গোপন করছে — এই তার স্বভাব। 

নারীকে নিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম আরো একটি কথা বলিয়াছেন তবে সেটা হারুনের মুখ দিয়ে নয় জাহাঙ্গীর কে দিয়েও। প্রথম যখন চম্পাকে দেখেছিল জাহাঙ্গীর তখন সে বলেছিল,

‘ইহারা মায়াবিনীর জাত। ইহারা সকল কল্যাণের পথে মায়াজাল পাতিয়া রাখিয়াছে। ইহারা গহন পথের কন্টক রাজ পথের দস্যু।’

এই উক্তিটি জাহাঙ্গীরকে দিয়ে করানো, বলা বাহুল্য নারীদের নিয়ে যে জাহাঙ্গীর এর ধারণা খুব ভালো কিছু ছিল না তাই আমরা এই উক্তিতেই  দেখতে পাই।

উপন্যাসের গঠনশৈলী ও লেখক :

উপন্যাসের গঠন শৈলীর কথা বলতে হলে বলতে হয় উপন্যাসের শুরুটা জাহাঙ্গীর এর জীবনের মধ্যভাগ এবং শেষভাগে। মধ্যভাগ কারণ যদি জাহাঙ্গীরগ্রেফতার না হতো তাহলে তার জীবন চলতেই থাকত এবং সাধারণ ভাবেই যুবক বয়স মানেই জীবনের মধ্যভাগ। শেষভাগ কারণ   উপন্যাস শুরু হওয়ার কিছুমাস পরেই গ্রেফতার হয় জাহাঙ্গীর এবং ফাঁসি হয় তার। 

উপন্যাসের মূল ঘটনা প্রবাহ কিন্তু বেশিদিন না এক সপ্তাহের মতো। যা  ঘটার এই এক সপ্তাহেই ঘটেছে। আর বাকী সব ফাক ফুকুর দিয়ে লেখক পুরে দিয়েছেন অসংখ্য পরিমাণ আলোচনা। 

কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে নিশ্চয়ই বলতে হবে না। ইনি আমাদের জাতীয় এবং বিদ্রোহী কবি।  কবির জন্ম ১৮৯৯। সাহিত্যসাধনার জন্য কবি সময় পেয়েছিলেন ৪০ বছর। ১৯৩৯ এ কোন এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে কবি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। 

কাজী নজরুল ইসলামের ইচ্ছা অনুযায়ী তার কবর দেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে
কাজী নজরুল ইসলামের ইচ্ছা অনুযায়ী তার কবর দেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে; ছবিসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, ছায়ানট, প্রলয়শিখা ইত্যাদি। আর উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ব্যাথার দান, রিক্তের বেদন, কুহেলিকা ইত্যাদি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অসুস্থ কবিকে  ঢাকায় আনা হয় এবং তাকে বাংলাদেশের নাগরিত্ব ও জাতীয় কবির সম্মাননা দেওয়া হয়। ২৯ এ আগস্ট ১৯৭৬ সালে কবি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। 

প্রচ্ছদ ছবি : Pinterest

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on কুহেলিকা: এক প্রেমিক, এক বিপ্লবী ও এক সন্তানের গল্প

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!