এক পৃথিবী, এক রাষ্ট্র: বাস্তব নাকি কেবলই ধূসর কল্পনা

4
(11)
Bookmark

No account yet? Register

পৃথিবী জুড়ে কোণায় কোণায় লেগে আছে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাত। এক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্ষেপ করা পারমাণবিক বোমার আঘাতে মুহূর্তেই পূর্ণ থেকে শুন্য হয়ে গেছে দুইটি জলজ্যান্ত শহর। বিগত শতাব্দীতে পৃথিবী দেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ। ‘৪৭ এর দেশভাগ থেকেই ভারত এবং পাকিস্তান জড়িয়ে আছে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে। হালের চীন বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বেশ চর্চিত একটি বিষয়।

গত শতকের শেষার্ধে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলেছিল স্নায়ুযুদ্ধ যা পৃথিবী গ্রহের মানুষ বহুকাল মনে রাখবে।
চিত্র: গত শতকের শেষার্ধে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলেছিল স্নায়ুযুদ্ধ; চিত্রসূত্র – Knowledge Wharton

কিন্তু কেমন হতো, যদি পৃথিবীতে রাষ্ট্র বলেই কিছু না থাকতো? পুরো পৃথিবীই যদি পর্যবসিত হতো একটিমাত্র রাষ্ট্রে। চলমান নিবন্ধে লেখক তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা এবং কল্পনাশক্তির উপরে ভিত্তি করে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবেন। 

আলোচনা শুরু করার আগে একটি শব্দের সাথে পরিচিত হয়ে আসা যাক। তা হলো ইউটোপিয়া। এই শব্দটি স্যার থমাস মোর ১৫১৬ সালে তাঁর ‘ইউটোপিয়া’ নামের গ্রন্থে প্রথম ব্যবহার করেন।

থমাস মোর বৈষম্যহীন পৃথিবী কল্পনা করেছিলেন।
চিত্র: বৈষম্যহীন সমাজের কল্পনাকারী থমাস মোর; চিত্রসূত্র – Historic UK

এই গ্রন্থে তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের বা সমাজব্যবস্থার কল্পনা করেন, যেখানে প্রতিটি সদস্য তাঁর যাবতীয় অধিকার লাভ করবেন এবং পরস্পরের মধ্যে কোনোরূপ বিবাদ থাকবে না। সমাজের এক সদস্যের সাথে অপর সদস্যের কোনোরূপ বৈষম্য করা হবে না। বাস্তবিক অর্থে এধরনের কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনোই সম্ভব না, সেক্ষেত্রে একে এক প্রকারের কল্পিত ব্যবস্থাই বলা উচিত। সেই একই বিবেচনায়, রাষ্ট্রবিহীন পৃথিবীও ইউটোপিয়ার আরেকটি রূপ। 

থমাস মোরের লেখা 'ইউটোপিয়া' গ্রন্থের প্রচ্ছদ
চিত্র: থমাস মোরের লেখা ‘ইউটোপিয়া’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ; চিত্রসূত্র – অ্যামাজন

একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে গেলে বেশ নির্দিষ্ট কিছু ব্যাপারে আলোকপাত করতে হয়। জনসংখ্যা, সরকার ব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, ভাষা এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি এদের মধ্যে অন্যতম। চলমান নিবন্ধে ক্রমান্বয়ে এই বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে। 

প্রথমে অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করা যাক। সীমান্তের কাঁটাতার বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে তখন পৃথিবীতে দক্ষ শ্রমিকের স্বল্পতা অনেকাংশে কমে যাবে। বর্তমানে কম জনসংখ্যার দেশসমূহে বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান তাঁদের নিজ নিজ দেশে দক্ষ শ্রমিকের অভাবে ভুগেন। কিন্তু রাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির কারণে স্থায়ীভাবে দক্ষ শ্রমিককে তাঁরা নিজেদের দেশে আনতে পারেননা। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিবাসন বলে আর কিছুই থাকবে না। ফলশ্রুতিতে খুব সহজেই স্থানান্তর সম্ভব হবে। দক্ষ শ্রমিকের যথাযথ জোগান উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করবে।

রাষ্ট্রবিহীন পৃথিবী দক্ষ শ্রমিকদের জন্য এক নিরাপদ আবাস হবে।
চিত্র: রাষ্ট্রবিহীন পৃথিবীতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা থাকবে সর্বোচ্চ; চিত্রসূত্র – The Michea B

পাশাপাশি পৃথিবীর যেসকল অঞ্চল নাজুক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শিকার, উন্নত অঞ্চলগুলো সহজেই তাদের জন্য পুনরোন্নয়ন কার্যক্রম বা বেইল আউট দিতে পারবে এবং এর জন্য পরবর্তীতে ঐ অঞ্চলকে আলাদা করে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে না। 

এতক্ষণ তো দেখা গেলো উন্নয়নের ছড়াছড়ি। চলুন মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখে আসি। পৃথিবীর একেক অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার একেক রকম। তাই হঠাৎ করে মুদ্রার ব্যাপক প্রাচুর্য পৃথিবীর কোনো এক অংশে মুদ্রাস্ফীতির জন্ম দিতে পারে। কেননা মুদ্রাস্ফীতি তখনই হয়, যখন পূর্বের তুলনায় অর্থ ব্যবস্থায় মুদ্রার পরিমাণ বেড়ে যায়, কিন্তু পূর্বের মূল্যের সাথে সংগতিপূর্ণ মূল্যের সেবা বর্তমান না থাকে। ঠিক এই কারণেই, কোনো দেশই তার নিজের ইচ্ছামত মুদ্রা ছাপাতে পারে না, কেননা মুদ্রা এবং সেবা পরস্পর সম্পর্কিত (এখানে সেবা বলতে সকল ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। আপনি কৃষকের উৎপাদিত চাল বাজার থেকে কিনছেন, এটিও এক প্রকার সেবা বিনিময়)

মুদ্রাস্ফীতির প্রাথমিক ধারণা
চিত্র: মুদ্রাস্ফীতির প্রাথমিক ধারণা; চিত্রসূত্র – Investopedia

মুদ্রাস্ফীতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা বোঝানোর জন্য জিম্বাবুয়ের উদাহরণ দেওয়া যায়। দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির চরমতম পরিস্থিতিতে পাউরুটি কেনার জন্য কার্টেল ভর্তি জিম্বাবুয়ে ডলার নিয়ে যেতে হতো। 

জিম্বাবুয়েতে মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহতম পরিস্থিতি
চিত্র: জিম্বাবুয়েতে মুদ্রাস্ফীতির ভয়াবহতম পরিস্থিতি; চিত্রসূত্র – Dawn

তাছাড়া অর্থব্যবস্থাও বিভিন্ন পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। কোথাও পুঁজিবাদী, কোথাও সমাজতান্ত্রিক আবার কোথাওবা মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলিত। প্রতিটি অর্থব্যবস্থা পরিচালনার নিজস্ব দোষ-গুণ আছে। তাছাড়া, কোনো দেশ যেই অর্থব্যবস্থা গ্রহণ করে, তা সেই দেশের ইতিহাস বা ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত। যেমন কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে পুঁজিবাদী বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করে সমাজতন্ত্র স্থাপন করে। ফিদেল কাস্ত্রোর পরে তার ভাই রাউল কাস্ত্রো দেশটিকে সমাজতন্ত্রের পথেই পরিচালনা করছেন। এরূপ পরিস্থিতিতে সেখানে সমাজতন্ত্র হটিয়ে অন্য কোনো অর্থব্যবস্থা স্থাপনের প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার সম্ভাবনাই সর্বাধিক। 

আরো পড়ুন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং নকল প্যারিস

গণতন্ত্র বলে প্রচলিত শাসনপদ্ধতি মুখ্যত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তাধারা এবং আদর্শকে প্রতিফলিত করে। তাই বাংলাদেশের মত এক জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র, পাকিস্তানের মত একাধিক জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র কিংবা ভারতের মত বহু জাতিতাত্ত্বিক রাষ্ট্র হোক; বৈষম্য সেখানে অবধারিত। আজ কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের দেশে থাকা অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে উৎপীড়ন করছে। কাল সেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই কিন্তু বিশ্ব পরিমণ্ডলে সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হবে। 

বহু ভাষার এই পৃথিবী
চিত্র: বহু ভাষার এই পৃথিবী; চিত্রসূত্র – Linguistic Society of America

তবে একটি বিষয় এখানে অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন। মৃতপ্রায় সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ভাষা তখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে পারবে। সাধারণ মানুষের যথাযথ সমর্থন পেলে এই ভাষা এবং সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন সম্ভব হবে।

অর্থব্যবস্থার মতই সরকার পদ্ধতিও পৃথিবী এবং এর সকল মানুষকে এক বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন করবে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানকারী বহু স্বৈরশাসকেরা কী তখন একজন মাত্র নেতার হাতে সারা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে রাজি হবে? তাছাড়া, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জনঘনত্বও একই রকম না। ফলে আপেক্ষিক গুরুত্বের বিচারে কোনো অঞ্চল বেশি মর্যাদা পাবে, কোনো অঞ্চল কম। এর প্রভাবে আঞ্চলিক বৈষম্য এক নতুন মাত্রা পাবে।

আবাসন ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হবে। বর্তমানে পৃথিবী ব্যাপী বিভিন্ন জনঘনত্বপূর্ণ দেশে আবাসন সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা, মুম্বাই, দিল্লি, হংকং, টোকিয়ো, নিউইয়র্ক প্রভৃতি মেগা শহরগুলোতে জনসমাগম স্বাভাবিক অবস্থা থেকে মাত্রাতিরিক্ত বেশি। তাই এসকল শহর থেকে অন্যান্য কম বসতিপূর্ণ শহরে মানুষ যাত্রা শুরু করবে। কিন্তু আগে থেকেই ঐ অঞ্চলে বসবাস করা জনগণ কী পারবে নতুন আসা অভিবাসীদের মেনে নিতে? শুরু হবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যে স্বপ্ন নিয়ে অভিবাসীরা নিজের শহর ছেড়ে এসেছিল, দাঙ্গার আগুনে সেই স্বপ্ন ভস্মীভূত হবে। 

 ১৯৪৭ এর দেশভাগ পৃথিবী গ্রহের এযাবতকালের সবচেয়ে বড় বলপূর্বক স্থানান্তর
চিত্র: ১৯৪৭ এর দেশভাগকালীন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আজও ভীতির উদ্রেক ঘটায়; চিত্রসূত্র – BBC

নতুন বিশ্বে মেধার স্বীকৃতি হবে সার্বজনীন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বহু সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী তখন সহজেই প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নের সুযোগ পাবে।  

কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রাকৃতিক এবং খনিজ সম্পদ সেই স্থানের মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। উদাহরণ হিসেবে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নবান্ন উৎসবের উল্লেখ করা যায়। যেসকল স্থানে তেল, গ্যাস বা কয়লাক্ষেত্র থাকে, তার আশেপাশের এলাকার মানুষের মাঝে সেই সংক্রান্ত পেশা বা বৃত্তি গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এখন যদি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের হাত থেকে তাদের তেল বা গ্যাস মজুদ হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে। তাছাড়া সেই অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষও কী সেই মজুদ নিজের হাত থেকে ছাড়তে রাজি হবে? 

খনিজ সমৃদ্ধ দেশসমূহ কী রাজি হবে নিজেদের সম্পদের কর্তৃত্ব ছাড়তে?
চিত্র: খনিজ সমৃদ্ধ দেশসমূহ কী রাজি হবে নিজেদের সম্পদের কর্তৃত্ব ছাড়তে? চিত্রসূত্র – Data. Gov

ভবিষ্যৎ পৃথিবী আমাদের জন্য কী রেখেছে, তা কেবল ভবিষ্যতেই জানা যাবে। কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিহীন পৃথিবী বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করতে পারলেও, সকল শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য তা সুখকর হবে বলে ধারণা করা যায় না। তাই আপাতত রাষ্ট্রবিহীন পৃথিবীকে রুপকথার গল্পের ইউটোপিয়া হিসেবে ধরে স্বপ্ন দেখাই ভালো। আর শীঘ্রই রাষ্ট্রবিহীন পৃথিবীর প্রস্ততি নেওয়ার আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রস্ততি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on এক পৃথিবী, এক রাষ্ট্র: বাস্তব নাকি কেবলই ধূসর কল্পনা

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!