একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়: লাখো তরুণের স্বপ্নজয়ের শক্তি

নবাব আব্দুর রহিম
4.4
(7)
Bookmark

No account yet? Register

ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসভিত্তিক সিরিয়ালগুলোতে প্রায়শই একটি কথা শুনি, ‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় তরবারির ছায়ায়, গাজীদের প্রচেষ্টায়। কিন্তু এটি জ্ঞানের আলো নিয়ে আলেমদের কাঁধে ভর করে বেঁচে থাকে।’ এর সরল অনুবাদ হতে পারে আমাদের চিরচেনা সেই প্রবাদ- ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।’ আমেরিকা প্রবাসী গবেষক রউফুল আলম তাঁর ‘একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়’ গ্রন্থে লিখেছেন,

একটা দেশকে দাঁড় করাতে হলে আগে মানুষদের আলোকিত করতে হয়। আর মানুষকে আলোকিত করার প্রধানতম শর্ত হলো সুশিক্ষা।

তাহলে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আরেকবার ভেবে দেখা উচিত। সেই মেরুদণ্ড ঠিক আছে তো? এক্ষেত্রে রউফুল আলমের গ্রন্থটি স্বচ্ছ দর্পণের মত বাংলাদেশের শিক্ষার সংকট তুলে ধরবে আপনার কাছে। একইসঙ্গে উত্তরণের পথও বাতলে দেবে গ্রন্থটি; যা লাখো তরুণের স্বপ্নজয়ের শক্তি হবে। দেশের বাইরে শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকায় বাংলাদেশের শিক্ষার সংকট নিরূপণ করতে সক্ষম হয়েছেন এই প্রত্যয়ী গবেষক। তাঁরই ছাপ রয়েছে ‘একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়’ গ্রন্থের প্রতিটি পৃষ্ঠায়। বইটি মূলত দৈনিক ‘প্রথম আলো’সহ বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত লেখকের অনুপ্রবন্ধ সমূহের সংকলন।

গ্রন্থটিতে প্রবন্ধগুলো সুবিন্যস্ত না হলেও এর বিষয়বস্তুকে মোটাদাগে দুইটি ভাগে ভাগ করা যায় –

  • শিক্ষার সংকট ও সমস্যা
  • উত্তরণের পথ

দেশ জুড়ে শিক্ষার সংকট ও সমস্যা

মানুষের এগিয়ে যেতে যেমন লক্ষ্য, দৃঢ় সংকল্প ও সুষ্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন; তেমনই প্রয়োজন লক্ষ্যের পথে সংকটগুলো চিহ্নিত করা। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়ে থাকে তাহলে লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে এই মেরুদণ্ড কতটুকু সহযোগিতা করছে কিংবা বাঁকা হয়ে গিয়েছে কিনা সেটা যাচাই করা খুবই প্রয়োজন।

একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায় গ্রন্থের প্রচ্ছদ
‘একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়’ বইয়ের প্রচ্ছদ। চিত্রসূত্র – লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ

‘একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়’ গ্রন্থে মোট ৬৩টি অনুপ্রবন্ধ রয়েছে। সুখপাঠ্য এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধগুলোর অধিকাংশেই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাগুলো চিহ্নিত হয়েছে। গ্রন্থে আলোচিত সমস্যাগুলো থেকে সামান্য কিছু বিষয় এখানে উল্লেখ করা হলো।

  • লেখক ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাসটুকু শুনুন’ শীর্ষক প্রবন্ধে শিক্ষার্থীদের অবহেলা-উপেক্ষার মধ্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন। শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সংগ্রামের বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, “এত সংগ্রামের পরও তাঁরা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসেন৷ পড়ে যাচ্ছেন। বড় বড় স্বপ্ন দেখেন। আর যখনই ইউনিভার্সিটি থেকে বের হন, তখন তাঁদের হাতে শুধু একটি সনদ ধরিয়ে দেওয়া হয়। না কোনো গবেষণার অভিজ্ঞতা, না কোনো প্রফেশনাল জীবনের সঠিক পদ্ধতি! উপরন্তু জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া হয় কিছু সময়। আমরা এর নাম দিয়েছি ‘সেশনজট’।”
  • আমাদের এতটুকু সমস্যাই যেন পর্যাপ্ত নয়। একই প্রবন্ধে লেখক আফসোস করে বলছেন, “যখন দেখি, ইউজিসির একজন চেয়ারম্যান রাজনৈতিক দলের গুণগান গেয়ে লেখার সময় পান, অথচ দেশের হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেন না, লেখেন না, তখন খুব কষ্ট হয়।”
  • একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে হয়ে থাকে।… বছরের এক-তৃতীয়াংশ সময় বন্ধ থাকে। প্রচুর সরকারি ছুটি থাকে। সঙ্গে হরতাল, মারামারি-ধরাধরি, ধর্মঘট, অবরোধ, আন্দোলন, ভিসি হটানোর জন্য ক্লাস বর্জন। তার সঙ্গে নগরডুবি, যানজট। বেশির ভাগ ইউনিভার্সিটিতে নেই আধুনিক ল্যাব। আছেন গবেষণার অভিজ্ঞতাহীন শিক্ষক! আছে শিক্ষকের অপ্রতুলতা। তাহলে মেধাবী ও কর্মপাগল মানুষ তৈরি হবে কী করে? তদুপরি আছে শিক্ষার্থীদের আর্থিক টানাপোড়ন
  • দেশটা যেভাবে হেরে যায়’ শীর্ষক প্রবন্ধে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, ‘দয়া করে ওদের ঠকাবেন না’ শীর্ষক প্রবন্ধে শিক্ষকদের পাঠদানে অনীহা, শিক্ষকরাজনীতি ও মানহীন গবেষণা, ‘প্যারালাইজড মাইন্ড’ প্রবন্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের রূঢ় আচরণসহ শিক্ষার অন্তরায় আরও অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন লেখক।

পৃথিবীর সর্বত্রই ২৫ থেকে ২৬ বছর বয়সের তরুণেরা পিএইচডি সম্পন্ন করে। কিন্তু আমরা পিএইচডির চিন্তা করি চল্লিশের ঘরে গিয়ে। কারণ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরাই ছাত্রছাত্রীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে না। শুধু তাই নয়, খোদ শিক্ষকরাই গবেষণাহীন, চৌর্যবৃত্তির সঙ্গে জড়িত!

বইয়ের প্রচ্ছদ। উৎসঃ Facebook

এভাবেই গ্রন্থটির প্রতি পরতে পরতে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অজস্র সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন লেখক রউফুল আলম। জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি নিদারুণ অবহেলা ও উদাসীনতা উদঘাটন করছেন। দেশ যেভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে, দরদী হৃদয়ের আবেগ দিয়ে দিয়েছেন তার বার্তা। পাশাপাশি এর থেকে উত্তরণের দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন।

উত্তরণের পথ

সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পৃথক কোন প্রবন্ধ গ্রন্থটিতে নেই। তবে প্রতিটি সংকটের সঙ্গে সঙ্গেই তার থেকে উত্তরণের সন্ধান অথবা ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।  এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ বেশ অর্থবহ। গ্রন্থটির অনেক প্রবন্ধেই বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া চীন, আমেরিকা, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান ও সিঙ্গাপুর নিয়ে পৃথক পৃথক প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে গ্রন্থটিতে।

No photo description available.
বইয়ের ছবি। উৎসঃ Facebook

এর মধ্যে চীনের ‘সহস্র মেধাবী প্রকল্প’ উল্লেখ না করলেই নয়। আমরা যেটিকে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকি, চীনের কাছে সেটাই যেন ‘ব্রেইন গেইন’। তাই প্রতিবছর স্রেফ আমেরিকাতেই দশ হাজার শিক্ষার্থীকে গবেষণার জন্য পাঠানো হয়। অথচ বর্তমানে আমেরিকা এবং চীনের বৈরী সম্পর্কের কথা কে না জানে! সেখানে শিক্ষাগ্রহণের পর নিজ দেশে ফিরিয়ে এনে স্ব স্ব ক্ষেত্রে গবেষণার ব্যবস্থা করে দেয় চীন সরকার।

আর তাই ‘ব্রেইন ড্রেইন নাকি ব্রেইন গেইন’ প্রবন্ধে লেখক বলেন, “আমরা যেটাকে বলি ব্রেইন ড্রেইন, চীন সেটাকে বলে ব্রেইন গেইন! চীন সরকার চায় তাদের আরও বেশি ছেলেমেয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ুক।”

আরো পড়ুন: ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট: দেশভাগের এক পূর্ণাঙ্গ আখ্যান

বইটি পড়লে হয়তো আপনি হতাশ হতে পারেন। পাঠকদের অনেকেরই এমন অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে এই গ্রন্থ পাঠককে হতাশায় আচ্ছন্ন করার পরপরই একটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ করে তুলবে।

নাসায় কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রুবাব খান । সূত্র: NASA

এজন্য বইটির অনেক জায়গায় লেখক অন্তরালের নায়কদের বর্ণনা দিয়েছেন। লিখেছেন দুনিয়া কাঁপানো স্থপতি ফজলুর রহমান খান, গবেষক জাহিদ হাসান, নাসায় কাজ করা বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রুবাব খান, আব্দুস সাত্তার খানসহ কীর্তিমান বাঙালিদের বিশ্বজ্বয়ের গল্প লিখেছেন গ্রন্থটিতে।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির হাওয়ার্ডফ্লোরি ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. আখতার হোসাইন বলছেন,

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁর (রউফুল আলম) সুলিখিত এই বই বাংলাদেশের লাখো তরুণকে স্বপ্নজয়ের পথে শক্তি জোগাবে। দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নের জন্য নাড়া দেবে।

আরো পড়ুন: ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস: ইতিহাসের পাতায় পাতায় যুদ্ধের ধারাবিবরণী

লেখক সম্পর্কে

রউফুল আলম জন্মেছেন কুমিল্লায়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ চুকিয়ে সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে অর্গানিক কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেন্সিলভেনিয়ায় পোস্টডক্টরাল গবেষণার সাথে সাথে নিউজার্সির ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

চিত্র: রউফুল আলম; সূত্র: ResearchGate

একইসঙ্গে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে লেখালেখি করছেন তিনি। তাঁর সংগ্রাম নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতেও রয়েছেন সক্রিয়। ‘একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়’ লেখকের প্রথম গ্রন্থ।

বই সম্পর্কে

  • বইয়ের নাম: একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়
  • লেখকের নাম: রউফুল আলম
  • প্রকাশক: সমগ্র প্রকাশন
  • মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা
  • পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৯২

প্রচ্ছদ মূল চিত্রসূত্র: islamiboi.net

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়: লাখো তরুণের স্বপ্নজয়ের শক্তি

কমেন্ট করুন

অসামান্য

error: Content is protected !!