তিগ্রাই সঙ্কট: ইথিওপিয়ায় নতুন গৃহযুদ্ধের সূচনা? পর্ব ২

5
(1)
Bookmark

No account yet? Register

গেল নভেম্বরে ইথিওপিয়ায় ইথিওপীয় সরকার এবং তিগ্রাই অঞ্চলের আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত আরম্ভ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ইথিওপীয় সরকারি বাহিনী সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, এবং ইথিওপীয় সৈন্যরা তিগ্রাই অঞ্চলের রাজধানী মেকেল্লে দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের এখনো অবসান ঘটে নি এবং এই সংঘাতের কারণে একটি গৃহযুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এবং কীভাবে এই সংঘাত শুরু হলো?

প্রথম পর্বে আমরা ইথিওপিয়ার পরিচয়, এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, আবি আহমেদের উত্থান, এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই সংকটের কারণগুলো সম্পর্কে জেনেছি। আজকের পর্বে থাকবে যুদ্ধের বর্ণনা ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। 

ইথিওপিয়া–তিগ্রাই গৃহযুদ্ধ

২০২০ সালের ৪ নভেম্বর এই সঙ্কট চরম রূপ ধারণ করে। এইদিন টিপিএলএফ–এর সৈন্যরা তিগ্রাইয়ের রাজধানী মেকেল্লের নিকটে অবস্থিত ইথিওপিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের (ইথিওপীয় সশস্ত্রবাহিনীর আনুষ্ঠানিক নাম) ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালায়। প্রত্যুত্তরে ইথিওপীয় কেন্দ্রীয় সরকার তিগ্রাই অঞ্চলে ৬ মাসের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করে, অঞ্চলটিতে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে দেয়, অঞ্চলটির জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়, এবং অঞ্চলটি দখলের জন্য সৈন্য প্রেরণ করে। ইথিওপীয় সেনা ও বিমানবাহিনী এবং ফেডারেল পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি আমহারা অঞ্চল থেকে আগত স্পেশাল ফোর্স ও পুলিশ বাহিনী এবং আফার অঞ্চল থেকে আগত স্পেশাল ফোর্স ও পুলিশ বাহিনী এই অভিযানে অংশগ্রহণ করে।

সর্বস্তরের জনগণের যুদ্ধে অংশগ্রহণ
চিত্র: ইথিওপীয় কেন্দ্রীয় সৈন্যদের পাশাপাশি আমহারা মিলিশিয়ারাও টিপিএলএফের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে; চিত্রসূত্র: Eduardo Soteras/Agence France-Presse/Getty Images via The Wall Street Journal

৯ নভেম্বর টিপিএলএফের অধীনস্থ সামরিক মিলিশিয়া তিগ্রাইয়ের মাই কাদরা অঞ্চলে প্রায় ৭০০ বেসামরিক আমহারা ও অন্যান্য জাতিভুক্ত মানুষকে খুন করে। ১৪ নভেম্বর ইথিওপিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে ৩৪ জন বেসামরিক ইথিওপীয় নিহত হয়। যুদ্ধ চলাকালে টিপিএলএফ ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারার ওপর বেশ কয়েকবার রকেট হামলা চালিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে টিপিএলএফ যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। নভেম্বরের শেষদিকে ইথিওপীয় সৈন্যরা তিগ্রাইয়ের রাজধানী মেকেল্লে দখল করে নিয়েছে, এবং ইথিওপীয় সরকার এই সংঘর্ষে ‘পরিপূর্ণ বিজয়’ লাভের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু টিপিএলএফ এটি অস্বীকার করেছে এবং ইথিওপীয় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার সামরিক ও বেসামরিক ইথিওপীয় এই যুদ্ধের ফলে প্রাণ হারিয়েছে।

আন্তর্জাতিক/আঞ্চলিক পরিস্থিতি

যুদ্ধটি ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরে সংঘটিত হচ্ছে, কিন্তু ইতোমধ্যেই এর প্রভাব পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রথমত, যুদ্ধের ফলে তিগ্রাই অঞ্চল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০,০০০ মানুষ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র সুদানে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এবং এটি দ্রুত একটি বড় মাত্রার মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সুদানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয় এবং রাষ্ট্রটি নানাবিধ অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত। এমতাবস্থায় ইথিওপীয় শরণার্থীদের উপস্থিতি সুদানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটাতে পারে।

ইথিওপীয়–সুদানি সীমান্তের নিকটে তিগ্রাই থেকে আগত শরণার্থীদের ঢল
চিত্র: ইথিওপীয়–সুদানি সীমান্তের নিকটে তিগ্রাই থেকে আগত শরণার্থীদের ঢল; চিত্রসূত্র: El Tayeb Siddig/Reuters via The Wall Street Journal

দ্বিতীয়ত, টিপিএলএফ সভাপতি দেব্রেৎসিওন গেব্রেমাইকেল অভিযোগ করেছেন যে, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ইরিত্রিয়া তিগ্রাই আক্রমণের ক্ষেত্রে ইথিওপীয় কেন্দ্রীয় সরকারকে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছে। এই অভিযোগের সত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু ইতোমধ্যে টিপিএলএফ ইরিত্রিয়ার ওপর বেশ কয়েকবার রকেট হামলা চালিয়েছে। এর ফলে যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তৃতীয়ত, ইথিওপীয় কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে যে, গেব্রেমাইকেল ইথিওপিয়া থেকে পালিয়ে দক্ষিণ সুদানে আশ্রয় নিয়েছেন, এবং টিপিএলএফকে সহায়তা প্রদানের দায়ে তারা দক্ষিণ সুদানকে অভিযুক্ত করেছে। এর ফলে ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। ইথিওপিয়া দক্ষিণ সুদান থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং দক্ষিণ সুদানের কূটনীতিকদের ইথিওপিয়া ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে।

মানচিত্র এ  ইথিওপিয়ার অবস্থান যেখানে গৃহযুদ্ধ চলছে ।
আফ্রিকা মহাদেশে ইথিওপিয়ার অবস্থান। চিত্রসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স  

আরও পড়ুন: তিগ্রাই সঙ্কট: ইথিওপিয়ায় নতুন গৃহযুদ্ধের সূচনা? পর্ব ১

চতুর্থত, কার্যত তিন টুকরোয় বিভক্ত সোমালিয়া সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য বহুলাংশে ইথিওপিয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং সোমালিয়ায় ইথিওপীয় সৈন্য মোতায়েন করা আছে। কিন্তু তিগ্রাইয়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইথিওপীয় সরকার সোমালিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে শুরু করেছে এবং তাদেরকে তিগ্রাইয়ে প্রেরণ করছে। অন্যদিকে, সোমালিয়া থেকে প্রত্যাহারকৃত ইথিওপীয় কেন্দ্রীয় সৈন্যদের স্থলে ইথিওপিয়ার সোমালি অঞ্চল থেকে সোমালি বিশেষ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সোমালিয়ায় প্রেরণ করা হচ্ছে। এর ফলে সোমালিয়ায় যে নিরাপত্তাজনিত শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে, সোমালি মিলিট্যান্ট গ্রুপ ‘আল–শাবাব’ তার সুযোগ নিতে পারে এবং সোমালিয়ায় অভ্যন্তরে আক্রমণ বৃদ্ধি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গৃহযুদ্ধ এ ইথিওপীয় শরণার্থী সুদানের পূর্বাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে
চিত্র: এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০,০০০ ইথিওপীয় শরণার্থী সুদানের পূর্বাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে; চিত্রসূত্র: Agence France-Presse/Getty Images via The Wall Street Journal

সর্বোপরি, নীলনদের ওপর ইথিওপিয়া কর্তৃক বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণের কারণে মিসর ও সুদানের সঙ্গে ইথিওপিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। তিগ্রাইয়ের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে মিসর ও সুদান এই সঙ্কটকে নিজেদের কাজে লাগাতে পারে এবং তিগ্রাইয়ানদের সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ইথিওপীয় সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে, এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ভারতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আইয়ুব ইথিওপিয়াকে একটি ‘সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র’ (imperial state) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বাস্তবিকই ইথিওপিয়া কোনো জাতিরাষ্ট্র নয়, বরং নানা জাতির সমন্বয়ে গঠিত একটি সাম্রাজ্য। তিগ্রাইয়ের সঙ্গে ইথিওপীয় কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বন্দ্ব হচ্ছে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বহুজাতিক ফেডারেশন ব্যবস্থার মধ্যেকার চিরাচরিত সংঘাতেরই একটি নমুনা। ইথিওপিয়ার ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী এখন নিজের রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি অনিশ্চিত যুদ্ধে লিপ্ত। এই যুদ্ধের ফলে ইথিওপিয়া পুনরায় একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে আফ্রিকায় নতুন একটি নৈরাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হবে – সেটিই দেখার বিষয়। 

প্রচ্ছদসূত্র: বিবিসি 

তথ্যসূত্র:

1. Alex De Waal. Tigray crisis viewpoint: Why Ethiopia is spiralling out of control. BBC, November 15, 2020. https://www.bbc.com/news/world-africa-54932333

2. Nicholas Bariyo and Gabriele Steinhauser. Ethiopia: What We Know About the War in the Tigray Region. The Wall Street Journal, December 2, 2020. https://www.wsj.com/articles/ethiopia-what-we-know-about-the-war-in-the-tigray-region-11605530560

3. Simon Marks. Ethiopia’s internal conflict explained. POLITICO, November 18, 2020.https://www.politico.eu/article/ethiopia-internal-conflict-explained/

4. Siobhan O’Grady. What is behind the conflict in Ethiopia? The Washington Post, November 23, 2020. https://www.politico.eu/article/ethiopia-internal-conflict-explained/

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
2 Thoughts on তিগ্রাই সঙ্কট: ইথিওপিয়ায় নতুন গৃহযুদ্ধের সূচনা? পর্ব ২
    James N Pilon
    18 Dec 2020
    7:14pm

    অসাধারণ উপস্থাপনা।

    0
    1
    vor
    18 Dec 2020
    7:15pm

    ফালতু লিখা

    0
    1

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!