আগন্তুক: সত্যজিৎ রায়ের অন্তিম স্বাক্ষর, দ্বিতীয় পর্ব

তাসফিন আহমেদ
5
(3)
Bookmark

No account yet? Register

শেষ জীবনে এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করে গিয়েছিলেন, সভ্যতার সংকট প্রবন্ধটি, তেমনি ভাবে সত্যজিৎ রায় জীবনের সায়াহ্নলগ্নে আগন্তুক সিনেমায় দেখিয়েছেন সভ্যতার চলমান সংজ্ঞার বিকলাঙ্গ অবস্থা, কুশ্রীরূপ। অধিকন্তু ছলচাতুরিপূর্ণ সভ্যতার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এক নতুন মতাদর্শের সাথে। সিনেমায় আলাদা আলাদা বৈঠকে সিনেমার সামগ্রিক চেতনার সত্তুর ভাগ উঠে এসেছে। এই সিনেমা নিয়ে আলোচনার প্রথম পর্বে আমরা কাহিনির প্রারম্ভ দেখতে পাই, বাকিটা দেখবো এ পর্বে।

সুধীন্দ্র বোসের বন্ধু রঞ্জন রক্ষিতের সাথে বৈঠকে মি. রক্ষিত আড্ডাকে বাঙালির নিজস্ব আবিষ্কার দাবী করলে আগন্তুক তার সাথে দ্বিমত পোষণ করে জানান, আড্ডার প্রকৃত উৎপত্তি ও আড্ডার প্রকৃত স্বরূপ। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন বাঙ্গালির ভাঁড়ামি আর পরনিন্দাপূর্ণ আড্ডার সাথে সক্রেটিস, প্লেটোদের দর্শন, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্যের আড্ডার পার্থক্য। যেখানে বাঙালি এখনও ইনটেলেকচুয়াল ক্ষেত্রে দৈন্যগ্রস্থ। মেধাহীন, বিষয়বৈচিত্রহীন আলাপেই সাধারণ বাঙালি মগ্ন হয়ে থাকে। আগন্তুক আফসোসে মোচন হয় না।

রঞ্জন রক্ষিতের ভূমিকায় রবি ঘোষের অভিনয় ছিল স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো। যে রবি ঘোষকে উদ্দেশ্য করে তার বাবা তার মাকে বলেছিলেন, অভিনয় কইরা সময় নষ্ট করে ক্যান? তোমার পোলারে কয়া দিও ওই চেহারায় অভিনয় হয় না। সে ছিলো দুর্গাদাস বাঁড়ুজ্যে, হিরোর মতন চেহারা।

সেই রবি ঘোষই পরবর্তী হয়ে উঠেছিলেন, উত্তম কুমার-সৌমিত্রদের যুগেও এক অনন্য চরিত্রাভিনেতা। উত্তম কুমার বলেছিলেন: রবির পাশে অভিনয় করতে সব সময় ভয় লাগে। আমরা হয়তো জাঁকিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছি, আর রবি মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেকে এমন একটা কিছু করবে যে ও গোটা দৃশ্যটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, লোকে হেসে গড়িয়ে পড়বে।

আবার সত্যজিতের ভাষায়, রবির চোখ দুটোই কথা বলে।

পুরো সিনেমায় অভিনয়ের চমকে দেখতে রবি ঘোষের অভিনয়ের অংশটুকুই বারবার দেখতে হয়।

রঞ্জন রক্ষিতের সাথে আগন্তুক এর পরিচয়পর্ব
      চিত্র: রঞ্জন রক্ষিতের সাথে আগন্তুকের পরিচয়পর্ব। চিত্রসূত্র: Oisianama

তবে আগন্তুকের চিন্তাচেতনার সার্বিকচেতনার উন্মেষ ঘটে পৃথ্বীশ সেনগুপ্তের সাথে চায়ের কাপে ঝড় তোলা তর্কালাপের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বৈঠকটাকে এই চলচিত্রের প্রাণ বলা যেতে পারে। যেখানে ওঠে এসেছে, ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা সম্পর্কে সত্যজিৎ রায়ের মৌলিক চিন্তাধারা, যেটি একজন দর্শককে বারবার এই সিনেমাটি দেখাতে বাধ্য করে।

বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিবাদী আগন্তুককে পৃথ্বীশ সেনগুপ্তর বন্য জীবন সম্পর্কে আক্রমণাত্মক প্রশ্নের উত্তরে আগন্তুক পৃথ্বীশকে তার বিশ্লেষাত্মক জবাবের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন, আধুনিক সভ্যতা মানুষের জীবনকে কতটা অবান্তর করে তুলছে, হিংস্র করে তুলছে। প্রযুক্তি আবিষ্কার মারণাস্ত্রগুলো মুহুর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। যেখানে বন্যসভ্যতার জংলীরা নরমাংস ভক্ষণ করলেও আধুনিক পৃথিবীর ক্ষমতাশীল নেতাদের চেয়ে মানবিক!

প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করে যাওয়া নাসাকে তিনি এক ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে  মন্তব্য করেছেন:

নাসা, আর তার পাশেই নেশা। হাইপোডেরমিক্স সিরিঞ্জ দিয়ে নিজের দেহে মাদকরস চালান দিয়ে সমনকে সমন জারি করছে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ। … এগুলোকে রোধ করবে কোন টেকনোলজি?

মানুষে এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নে মানুষ অজানাকে জানতে পারছে ঠিকই কিন্তু নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর মারণযজ্ঞের মুখে।

পৃথ্বীশ সেনগুপ্তের আবার যখন আগন্তুককে প্রশ্ন করেন: ক্যানিবালিজম-কে আপনি সভ্যতার কোন স্তরে ফেলবেন?

তীর্যকতা আর তাচ্ছিল্যের সাথে  আগন্তুক উত্তর দেন: ‘সভ্য কে জানেন? সভ্য হচ্ছে সেই মানুষ যে আঙুলের একটা চাপে একটা বোতাম টিপে একটা ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে একটা গোটা শহরকে সমস্ত অধিবাসীসমেত ধ্বংস করে দিতে পারে।

জাপানের দাপুটে পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া সত্যজিতের সিনেমা সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন,  

রায়ের সিনেমা না দেখা মানে যেন চাঁদ ও সূর্য ছাড়া পৃথিবীকে দেখা!

এমনিভাবে আধুনিক সিনেমার যুগেও ক্রিস্টোফার নোলান, মাজিদ মাজিদীর মতো পরিচালকদের আইকন হয়ে আছেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের মৌলিক শিল্পদৃষ্টিই তাকে পৃথিবীর এত এত পরিচালকদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। এমন ভাবার কোনো কারণ নেই, দেশীয় প্রেক্ষাপটেই সত্যজিৎ রায়ের চিন্তাচেতনার বিস্তৃতি ঘটেছিল। আগন্তুকের মতো সত্যজিৎ রায়ও একজন বৈশ্বিকনাগরিক, বৈশিক চেতনার অধিকারী। তিনি পৃথিবীর যেখানেই  জন্মগ্রহণ করতেন না কেন, তার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হত না।

এই কালজয়ী পরিচালক তাঁর ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন, জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতন, রহস্য-রোমাঞ্চ, মনসমীক্ষার বিশ্লেষণ, দারিদ্রতার ঠ্যাঙ্গানি, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নানারূপ, শহুরে জীবন, গ্রামীণ জীবন, হাস্যরস।

আগন্তুক চলচ্চিত্রেও সমান মুন্সিয়ানায়, জীবনবোধের এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছেন, প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন সভ্যতার গতানুগতিক সংজ্ঞাকে। চলচিত্র শিল্পের যে একটি শক্তিশালী সংজ্ঞা আছে, সেই শক্তিশালী সংজ্ঞাকেও সত্যজিৎ রায় তার অসাধারণ দর্শনবোধ, সৃজনশীলতার দৃঢ়তা নিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে আগন্তুক সিনেমার মাধ্যমে তৈরি করেছেন এক নতুন রূপরেখা। সাধারণ এক গল্পকে উপজীব্য করে বলে গিয়েছেন, চারপাশের সভ্যতা সংকট নিয়ে। সিনেমাকে নিয়ে আসলেন ব্যক্তিগত চেতনা ছড়ানোর মাধ্যম রূপে।

ছবিটির প্রতিটা সংলাপ, চেয়ার-টেবিল, আসবাব-পত্র, চরিত্রের অস্থিরতা বারবার গুমোট চিৎকার করে বলছে, ফিরিয়ে দাও এ অরণ্য, লও এ নগর।

মানুষের আদিম অস্তিত্ব মিশে আছে যে মাটির সাথে, সেই মাটির দিকেই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছে বারবার।

আগন্তুক এর একটি দৃশ্য
        চিত্র: সাওতাল পাড়ায় মনোমোহন মিত্র এবং তাকে খুঁজতে আসা সুধীন্দ্র বোসের পরিবার। চিত্রসূত্র:  Filmsufi

ছবির প্রায় শেষের দিকে আগন্তুক যখন শান্তিনিকেতনের কাছাকাছি সাঁওতাল পাড়ায় সাঁওতালি নৃত্যায়োজন করেছে, সেই আয়োজনের যে অংশটুকু মানুষের ভিতরের আদিমটানকে তুলে ধরে সেটুকু নিয়ে শঙখ ঘোষের একটি প্রবন্ধের অংশ বিশেষ তুলে ধরা যায়।

ছবির শেষ দিকে সাঁওতালি নাচটার কথা ভাবুন। মনোমোহনের পাশে দাঁড়িয়ে সুধীন্দ্র আর অনিলা দেখছে সেই নাচ, মুগ্ধ ট্যুরিস্টরা যেভাবে দেখে। কিন্তু দেখতে দেখতে, অনিলার শরীরে অল্প অল্প দোলা লাগে, বোঝা যায় তার ভিতরে আসছে নাচ। সুধীন্দ্র তাকে ইশারা করছে সাঁওতালদের সঙ্গে যোগ দেবার জন্য। উদ্ভাসিত অনিলা জিজ্ঞেস করছে ‘যাই?’ আর চলেও যাচ্ছে খুশি মনে, দলের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে তৈরি হচ্ছে চমৎকার তার নাচ, তাদের নাচ। সুধীন্দ্রকে ডেকে কানে কানে মনোমোহন বলছেন: এতক্ষণে বিশ্বাস হচ্ছে ও আমার ভাগ্‌নি।

আগন্তুক এর একটি দৃশ্য
চিত্র: সাওতালী নাচের দৃশ্যধারণ। চিত্রসূত্র: Oisianama

এই অংশে এসে আর্ট-লাইফকর্পোরেট-লাইফের পার্থক্যটাও চোখে ধরা পড়ে। 

সাঁওতালি নৃত্যের সময় সুধীন্দ্র এবং অনীলা একসাথেই দাঁড়নো, যথারীতি দু’জনই নাঁচ দেখছে কিন্তু  তফাৎটি দেখা যায় তখন, যখন ছন্দের সাথে দৃশ্যের মিলন যখন ঘটে। সুধীন্দ্রের কর্পোরেট জীবনের বিপরীতে অনীলা একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ, সুর, ছন্দ, তাল, লয় নিয়ে তার চর্চা । ফলে সাঁওতালিদের সুরের ওঠানামায় সে ছন্দটা ধরে ফেলে এবং মনের অজান্তেই আস্তে আস্তে তার শরীরে দুলনি আসতে শুরু করে।

সুরের জগতে বাস করা মানুষের  যে আলাদা একটা কান থাকে, এই পার্থক্যও সুনিপুণভাবে বর্ণিত হয়ে গেল। 

এর পরে অনীলার নাঁচে অংশগ্রহের দৃশ্যের মাধ্যমে তিনি আদিবাসী আর তথাকথিত সভ্যের সাংস্কৃতিক মিলন ঘটালেন। 

আগন্তুক এর একটি দৃশ্য
        চিত্র: নৃত্য অংশগ্রহনরত অনিলা। চিত্রসূত্র: Film Sufi

‘আগন্তুক’ সিনেমাটি যেকোন নির্দিষ্ট এককালের সিনেমা ভেবে থাকলে, ভুল হবে। মানব সভ্যতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্ব-মহিমায় টিকে থাকার শক্তি নিয়েই এই সিনেমার জন্ম। মানুষের সাধারণ জীবনযাপনে অনেক নেগেটিভিটি আছে, যেগুলোকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দিলে মানুষ দেখতে চায় না। সত্যজিৎ রায় জীবনের শেষ দিকে এসে, যেতে যেতে আমাদের চলমান সভ্যতার সংজ্ঞাকে পাল্টে দিয়ে গেলেন। চিন্তায় হস্তক্ষেপ করে ভাবতে শেখালেন, ভালোবাসা ও বিশ্বাসই যদি মানুষের প্রকৃত মূলবোধ হয়ে থাকে তাহলে কেন একজন অপরিচিতকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করতে এত সন্দেহ-সংশয়ের মুখোমুখি হতে হয়?

পৃথ্বীশ তর্কের শেষের দিকে রূঢ় ভাষায় সেই প্রশ্ন করলো,আপনি নো বডি না সামবডি, তা এদের বলে দিচ্ছেন না কেন?

যে প্রশ্নটা ঘুরেফিরে নানান ভঙ্গিমায় সুধীন্দ্র, পৃথ্বীশ করে গিয়েছে, কঠোরভাবে। সেখানে সাত্যকি এই প্রশ্নকে নিয়ে এসেছিলে এক কোমল, আদর্শরূপে, তুমি আমার দাদু হতেও পারো, নাও হতে পারো।

তাহলে অপরিচিতজনের প্রতি শিশুমনের ভাবনা ও বয়স্কদের ভাবনা কেন আলাদা? সেই ফ্রয়েডি মতবাদের কথা আবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে শিশুমনের সভ্যতা চিন্তা দ্বারা গঠিত সভ্যতাকে সবচেয়ে স্বচ্ছ সভ্যতা ধরা হয়।

তাহলে এই রুক্ষ ও কোমল প্রশ্নে পার্থক্য হয়ে গেল সভ্য ও অসভ্যের। মানবিক ও পাশবিকতার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, সভ্যতা নিয়ে চলমান ধারণাটিই ভিত্তিহীন।

সত্যজিতের জীবনবোধের আরেকটা মৌলিকতা প্রমাণ হয়, অনীলা-সুধিন্দ্র-এর আলাপের একটি ছোট্ট দৃশ্যে যেখানে,  মামার প্রতি সন্দেহের কারণ হিসেবে অনীলা ক্রাইম-ফিকশন পাঠকে দায়ী করে। 

সত্যিকার অর্থেই, আধুনিক এই জীবনে এইসব নেতিবাচক শিল্পগুলো আমাদের সরল, সাধারণ মানবিক জীবন থেকে ক্রমে ক্রমে দূরে ও আরো দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রাইম ফিকশনের একেকটা টুইস্ট আমাদের উদ্বুদ্ধ করছে নেতিবাচক চিন্তায় অংশগ্রহণ করতে। মানুষ দিন দিন সন্দেহবাতিক হয়ে যাচ্ছে। এই অসভ্য সন্দেহ, এই ভাঁওতাবাজি সভ্যতা আর ঠুনকো পরিচয়সর্বস্বতার বিপরীতে সত্যজিৎ দাঁড় করিয়ে দেন আগন্তুককে। 

তাইতো, আগন্তুক কেবল পাঠের মাধ্যমেই জ্ঞানার্জনে বিশ্বাসী না, তিনি জ্ঞান অর্জন করেন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, নিজ চোখে দেখে, অনুধাবন করে, তিনি বলেন: অভিজ্ঞতাই আমার জ্ঞানেন্দ্রীয় উন্মেষের প্রধান কারণ।

তিনি ছোট্ট সাত্যকিকে পরামর্শ দিয়ে যান, কুপমুণ্ডুক না হতে। কুয়োর ব্যাঙের মতো সারাজীবন আলো-বাতাসহীন অন্ধকার, ভ্রান্ত, জ্ঞানশূন্যতায় বসবাস করার কোনো অর্থ হয় না, যেখানে সারা পৃথিবী জুড়ে আলোর মিছিলে ছুটে চলছে। জ্ঞানার্জন করতে হলে, নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হলে, মশাল নিয়ে সেই আলোর মিছিলে যেতেই হবে।

সাত্যকি  তাদের বাড়িতে আগন্তুকের অবস্থানের স্থায়ীত্বকাল সম্পর্কে  প্রশ্ন করলে, আগন্তুক হেসে উত্তর দেন: জীবনটাই তো ছোটাছুটি। কয়দিন বিশ্রাম করে আবার ছুট।

আগন্তুক এর একটি দৃশ্য
   চিত্র: সাত্যকির সাথে আগন্তুক। চিত্রসূত্র: Oisianama

শিশু চরিত্রের প্রতি সত্যজিতের টান বারবারই স্নেহময় ছিল। সেই পথের পাঁচালি থেকে শুরু করে আগন্তুক পর্যন্ত তিনি মনের ভেতর — শিশুকে স্নেহ, ভালোবাসা, আদরের এক নিষ্পাপ মূর্তিরূপে দেখেছেন। শেষ দৃশ্যে তাই আগন্তুকের প্রতি সাত্যকির কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পালায় তার হাসি দেখে আগন্তুকের মুখ থেকে বলিয়েছেন: এই হাসির চেয়ে ভালো থ্যাঙ্কিউ আর হয় না।

অসাধারণ দৃশ্যপট, সংলাপের এই চিরসবুজ সিনেমায় আগন্তুকের ভজন পাঠের অংশগুলোয় আগন্তুক চরিত্রে অভিনয় করা উৎপল দত্তের কণ্ঠের বদলে সত্যজিৎ রায় তার নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করেছেন। এটাকে একটু বেখাপ্পা মনে হতে পারে। উৎপল দত্তের ঐ শক্তিশালী কণ্ঠের পাশে তো বটেই।

তবে এই সিনেমাটা তো সম্পূর্ণই সত্যজিতের ভাবনা ও মূর্তিকে নির্দেশ করে। তিনি নিজেই উৎপল দত্তকে বলেছিলেন:  ইউ আর প্লেয়িং মি, মনোমোহন চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি গরগর করে বলে গিয়েছেন এস্কিমোদের স্থাপত্যবিদ্যার কথা, গুহামানবদের আঁকা বাইসনের কথা, আদিবাসীদের নিয়ে ভিন্ন দর্শনের কথা অংকন ও নৃতত্ত্ববিদ্যা থেকে তার লব্ধ জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন।

সুতরাং বলা যায়, সত্যজিৎ রায় তার নিজের অস্তিত্বকে আরো জোরালোভাবে জানান দিতে চেয়েছিলেন, আর তিনি সেটা পেরেছিলেনও।

সংলাপ বুঝিয়ে দিচ্ছেন সত্যজিৎ রায়
সংলাপ বুঝিয়ে দিচ্ছেন সত্যজিৎ রায়চিত্র: সংলাপ বুঝিয়ে দিচ্ছেন সত্যজিৎ রায়। চিত্রসূত্র: Oisanama

সিনেমায় উৎপল দত্তের অভিনয় বরাবরের মতোই তাঁর দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। গণনাট্য আন্দোলনের সময়ের এই বিশিষ্ট অভিনেতা, আগন্তুক সিনেমায় একই সাথে তার নিজস্ব স্বতন্ত্রতা দেখিয়েছেন আবার প্লে-ফুল মুডে যেন সত্যজিৎকেই প্লে করে গেছেন। সেই সত্যজিতের মতো ভাবভঙ্গি, একটু ঝুকে কথা বলা, হাঁটা-চলা, বসায় গূঢ় ব্যক্তিত্ব; কোনভাবেই মনে হবে না তিনি অভিনয় করছেন। উপরন্তু নতুন সত্যজিৎ দর্শকরা এই সিনেমায় উৎপল দত্তকে সত্যজিৎ রায় ভেবে ভ্রমও করতে পারেন।

এক্ষেত্রে অনিলা বোসের ভূমিকায় মমতাশঙ্করের অভিনয়ে ভ্রুটি চোখে পড়ে। বিশেষ করে অভিব্যক্তি প্রকাশে স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন না। সিনেমার শুরু প্রথম দিকেই চিঠির পাঠের পর হতবিহ্বলতা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করা দীপঙ্কর দে ও ধৃতিমান চ্যাটার্জির অভিনয় গতানুগতিক ধারাতেই। তেমন আলোচনা করার মতো না।

তবে শিশু চরিত্রের থেকে অভিনয় বের করার আনার যে অসামান্য দক্ষতা সত্যজিৎ রায়ের ছিল, সেটা আগন্তুক সিনেমাতেও চোখে পড়ে। সাত্যকির ভূমিকায় অভিনয় করা বিক্রম বোসের অভিনয়, এই সিনেমায় উৎপল দত্তের অভিনয়ের তুল্য।

মানব সভ্যতার শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার প্রাণশক্তি নিয়ে জন্মানো এই সিনেমাটি ১৯৯১ সালে ইন্দো-ফ্রেঞ্চ যৌথ প্রযোজনায় ভারতে মুক্তি পায়। ১৯৯২ সালে ভারতের সেরা চলচিত্র ও সেরা পরিচালনায় জাতীয় পুরষ্কার লাভ করে।

তথ্যসূত্র:

  • আহমেদ ছফা রচনাবলী, ৭ম খন্ড। পৃষ্ঠা নং – ৪৮১। সম্পাদনা – নুরুল আনোয়ার, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি।
  • আনন্দবাজার পত্রিকা
  • New York Times

 প্রচ্ছদ: পৃথ্বীসের সাথে আলাপরত আগন্তুক। সূত্র: Satyajit Ray 

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
4 Thoughts on আগন্তুক: সত্যজিৎ রায়ের অন্তিম স্বাক্ষর, দ্বিতীয় পর্ব
    তানসীর আলম
    6 Nov 2020
    8:44pm

    বেশ উপভোগ করলাম এই আলোচনাটি। আগের পর্বের পর এ পর্বের অপেক্ষায় ছিলাম। অনেক দারুণ লিখেছেন লেখক। ভালোবাসা ও দু’আ থাকল।

    3
    0
      তাসফিন আহমেদ
      9 Nov 2020
      7:10pm

      সর্বদা প্রার্থনায় রাখবেন। ❤️

      0
      0
    মার্শাল আশিফ
    8 Nov 2020
    7:53pm

    অসাধারণ নিবন্ধ। লেখকের মুন্সিয়ানা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সিনেমাটি দেখার ইচ্ছা পোষণ করছি। ধন্যবাদ লেখক তাসফিন আহমেদকে।

    2
    0
      তাসফিন আহমেদ
      9 Nov 2020
      7:10pm

      লেখা পড়ে যদি কেউ সিনেমা দেখতে আগ্রহী হয় এবং লেখাটি তাকে সিনেমাটি অনুধাবন করতে সাহায্য করে, তবেই তো লেখা সার্থক! ❤️

      0
      0

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!