অ্যাভাটার ২: বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেতে চলেছে ২০২২ সালে

4.4
(25)
Bookmark

No account yet? Register

সময় ২১৫৪ খ্রিস্টাব্দ; শক্তি বলতে পৃথিবীতে আর কিছু নেই, মানুষ সব খরচ করে ফেলেছে। শক্তির সব উৎস খালি হয়ে গেছে। ততদিনে নতুন উৎসের সন্ধানে দুনিয়ার পরিধির বাইরেও ঢুঁ মারতে শুরু করেছে মানুষ। নিজেদের সৌরজগতের বাইরে, এমনকি গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সিও পাড়ি দিচ্ছে, হন্যে হয়ে খুঁজছে নয়া জ্বালানি। দূর এক গ্যালাক্সির প্যানডোরা গ্রহে আনঅবটেনিয়াম পাওয়া গেল। কিন্তু তা অর্জন করা মুশকিল হয়ে গেলো ওই গ্রহের অধিবাসী না’ভিদের কারণে, অধিবাসীদের কাছে গ্রহের প্রাণ-প্রকৃতি সবই আপন। জ্বালানির জন্য খোঁড়াখুঁড়িতে রাজি না তারা। মানুষ ভাবে যে, না’ভিরা অসভ্য, আদিম। তাই সভ্য হিসেবে এই শক্তি দখলের অধিকার তারা রাখে। কাজেই ‘সভ্য’ মানুষ দখলদারিত্ব কায়েমের অভিযান শুরু করে। জেমস ক্যামেরনের চলচ্চিত্র অ্যাভাটার শুরু হয় এভাবে।

অসামান্যতে লিখুন
জেমস ক্যামেরন
চিত্র: জেমস ক্যামেরন, চিত্রসূত্র – Wikimedia Commons

অ্যাভাটার চলচিত্রে “অ্যাভাটার” শব্দটি নেওয়া হয়েছে হিন্দুধর্মের অবতার শব্দ থেকে। হিন্দুধর্ম বিশ্বাস অনুসারে, ঈশ্বরের দৈবিক শক্তি আংশিক বা পূর্ণরূপে যখন পৃথিবীতে আগমন করেন, তখন তাঁকে অবতার হিসেবে অভিহিত করা হয়। জেমস ক্যামেরনের অ্যাভাটারের সাজসজ্জা অনেকটাই ভারতীয় পুরাণে বর্ণিত সৃষ্টিকর্তার সম্পূর্ণ অবতার শ্রীকৃষ্ণের মতো। ছবিটিতে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে তার সাথে মিল রয়েছে ‘লর্ড অব দি রিংস’ এবং ‘কিং কং’ চলচিত্রের। তবে ক্যামেরনের আরো কিছু প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছেন ভার্চুয়াল জগতের সাহায্য নিয়ে। অ্যাভাটার চলচিত্রে অভিনেতা ও অভিনেত্রী মূল যে অভিনয়টা করেছেন সেটি কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে রূপান্তর করা হয়েছে থ্রি-ডি ছবিতে। আর অ্যাভাটারই হলো হলিউডের প্রথম পূর্ণাঙ্গ থ্রি-ডি সিনেমা।

অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য
চিত্র: অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য; চিত্রসূত্র: IMDb

বিশ্বজুড়ে জেমস ক্যামেরনের টারমিনেটর ২ চলচিত্রটি ঝড় তোলার পরপরই পরিচালক ভেবেছিলেন অ্যাভাটার নির্মাণের কথা। ১৯৯৪ সালে এর জন্য ৮০ পৃষ্ঠার একটি চিত্রনাট্য লিখেন ক্যামেরন। কিন্তু ছবিটি বানানোর মতো প্রযুক্তির অভাবে বাক্সবন্দি করেন পরিকল্পনা। নির্মাণ করেন টাইটানিক। রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসাসফল এই চলচ্চিত্র জিতে নেয় ৯টি অস্কার। ২০০৫ সালে ক্যামেরনের প্রতীক্ষার অবসান হয়। থ্রি-ডি প্রযুক্তির ভার্চুয়াল ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রানুষঙ্গ চলে আসে হাতের নাগালে। ২০০৯ এর মাঝামাঝিতে ক্যামেরনের স্বপ্নের ছবি অ্যাভাটার নির্মাণ শেষ হয়। জেমস ক্যামেরন ডিজনি এনিমেটড ফ্লিম Pocahontas (১৯৯৫) দেখার পর সর্বপ্রথম অ্যাভাটার মুভির ধারণা পান। যদিও ধারণা করা হয় Dr. Seuss এর The Lorax বইটির সাথে মুভির কেন্দ্রীয় ঘটনার কিছুটা মিল আছে। বইটির প্লট অনেকটা এরকম, ‘একটি জঙ্গল যেখানে রহস্য জনক সুন্দর সুন্দর গাছপালা এবং অদ্ভুত জীবজন্তু ছিলো, কিন্তু জঙ্গলটিকে মানুষ ধ্বংস করে দেয়।’

জেমস ক্যামেরন, অ্যাভাটার মুভিটি ১৯৯৯ সালেই মুক্তি দেওয়ার চিন্তাভাবনা করেছিলেন কিন্তু তখন এতটা অত্যাধুনিক সিজিআই ইফেক্ট দেওয়ার মতো প্রযুক্তি এবং এত হিউজ পরিমাণ বাজেট কোনো প্রযোজনা সংস্থা বহন করতে চাচ্ছিলো না যার কারণে তিনি এটি স্থগিত করে দেন। পরবর্তিতে The Lord of the Rings: The Two Towers (2002) দেখার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রযুক্তি এখন অ্যাভাটার এর সিজিআই ইফেক্ট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। যদিও 20th Century Fox বড় বাজেটের কারণে প্রথমে চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করার জন্য রাজি হতে চায়নি। জেমস ক্যামেরন অ্যাভাটার নিয়ে প্রচুর আত্নবিশ্বাসী ছিলেন, তখন তিনি ফক্স স্টুডিওকে বলেন যদি মুভিটি ফ্লপ হয়, তাহলে তিনি তার পরিচালন পারিশ্রমিক নিবেন না।

অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য
চিত্র: অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য; চিত্রসূত্র: IMDb

দ্যা গ্রেট ওয়াল ও প্রিন্স অব পারসিয়া খ্যাত ম্যাট ডেমন এবং জ্যাক গিলেনহেলকে প্রথমে পছন্দ করা হয় জ্যাক সুলি রোলটির জন্য। কিন্তু জেমস ক্যামরেন চাচ্ছিলেন একদম অজনপ্রিয় একজন অভিনেতাকে। সেই সুবাদে “স্যাম অরথিংটন” কে চরিত্রটি করার জন্য আহ্বান করা হয়। তখন তিনি জীবন নিয়ে এতটাই বিধ্বস্ত ছিলেন যে, নিজ গাড়িতে বসবাস করতেন। এলিয়েনদের ব্যবহৃত “Na’vi” ভাষাটি এক হাজার শব্দ সমৃদ্ধ একটি রিয়েল ভাষা, যেটি ভাষাবিদ “পওল ফরমার” আবিষ্কার করেছিলেন অ্যাভাটারের জন্য। এছাড়াও চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত বেশিরভাগ জীব-জন্তুর শব্দ, “জুরাসিক পার্ক” এ ব্যবহৃত জীব-জন্তুর শব্দগুলোকে রিসাইকেল করে ব্যবহার করা হয়। মিউজিক কম্পোজার টানা দেড় বছর ভোর ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করেছিলেন শুধু এই মুভির মিউজিকের পিছনে।

আরো পড়ুন: ব্রিটিশ কমেডি: সময় ছাপিয়ে এখনো দুর্দান্ত যে ৫টি সিটকম

অ্যাভাটার ছিলো প্রথম থ্রি-ডি মুভি। শুধু মাত্র কিছু কিছু সিজিআই দৃশ্যের জন্য সেট তৈরি করতেই প্রায় ৪৭ ঘন্টার মতো সময় লাগতো। এজন্যই এটি বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্র। এটি বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বাধিক আয় করা চলচ্চিত্র, কারণ অ্যাভেঞ্জার্স এন্ড গেম এখনও প্রথম স্থান অধিকার করে আছে। অ্যাভাটার মুভি মোট ৩টি অস্কার সহ ৮৭টি পুরস্কার এবং ১২৯টি মনোনয়ন পেয়েছে যা হলো সর্বকালের সেরা। মুভি রিলিজের পরপরই জেমস ক্যামেরন ঘোষণা দিয়েছিলেন এর সিক্যুয়াল সম্পর্কে।

অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য
চিত্র: অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য ; চিত্রসূত্র: IMDb

সর্বকালের সেরা ছবি অ্যাভাটার এর বক্স অফিস রেকর্ড ভেঙে দিয়ে রুশো ব্রাদারস পরিচালিত অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ড গেমই এখন বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক অর্থ উপার্জনকারী ছবি।

চিত্র: অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ড গেম চলচ্চিত্রের পোস্টার, চিত্রসূত্র – Economic Times

মার্ভেল কমিকসের এ ছবির সাফল্যে অ্যাভাটারের পরিচালক জেমস ক্যামেরনও আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এবার এ নির্মাতা জানিয়েছেন, অ্যাভাটার ২ ছবির মাধ্যমে বক্স অফিসে তার পুরনো রেকর্ড আবার ফিরিয়ে আনবেন তিনি।

সম্প্রতি অ্যাভাটার ছবির ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইন্ডিয়া টুডেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ড গেম সম্পর্কে জেমস ক্যামেরন বলেন,

এ ছবি আমার মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে কারণ ছবিটির মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, দর্শক এখনো থিয়েটারে গিয়ে ছবি দেখছে। আসলে অ্যাভাটার ২ তৈরির পরিকল্পনা করতে গিয়ে এ বিষয়টি নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত ছিলাম। কারণ এখন চলচ্চিত্রের বাজারে পরিবর্তন ঘটেছে। দর্শকরা আগের মতো হলে গিয়ে ছবি দেখবে কিনা শঙ্কা কাজ করছিল। এ ছবির মাধ্যমে দর্শক আবার হলমুখী হয়েছে। বিষয়টি আমাদের উদযাপন করা উচিত।

অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য
চিত্র: অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য ; চিত্রসূত্র: IMDb

এ সাক্ষাৎকারে ক্যামেরন আনন্দ প্রকাশ করলেও একটি বার্তা দিতে ভুল করেননি। আর সেটি হলো বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক অর্থ উপার্জনকারী ছবি হিসেবে বক্স অফিসে অ্যাভাটার যে রেকর্ড গড়েছিল, তা নাকি তিনি পুনরুদ্ধার করবেন অ্যাভাটার ২ এর মাধ্যমে। এরই মধ্যে এ নিয়ে তিনি তার যাবতীয় পরিকল্পনাও সাজিয়েছেন। আশা প্রকাশ করে বলেছেন, তার পরিচালিত অ্যাভাটার ২ ছবির মাধ্যমে বক্স অফিসের আগের রেকর্ড আবার ফিরে আসবে। ক্যামেরন বলেন,

আমি নিশ্চিত যে অ্যাভাটার ২ বক্স অফিসে অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ড গেম ছবিটিকে অতিক্রম করে যাবে।

জেমস ক্যামেরনের বিখ্যাত মুভি অ্যাভাটার সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালের বড়দিন উৎসবের সময়। তবে শেষ পর্যন্ত  তা হয়নি। অ্যাভাটার ব্যাপক সাফল্য পাওয়ার পর ঘোষণা দেওয়া হয়, ছবির সিক্যুয়েল আসছে। কিন্তু অসংখ্য ঘোষণার পরও ছবির শুটিং শুরু হয়নি। তবে  অবশেষে সুসংবাদ দিলেন ছবির নির্মাতা জেমস ক্যামেরন। জানিয়েছিলেন ৩০ নভেম্বর ২০১৯ সালের সিনেমাটির শুটিং পর্ব শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে ২০২২ সালে সিনেমাটির মুক্তির ঘোষণাও দিয়েছেন নির্মাতা।

অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য
চিত্র: অ্যাভাটার চলচ্চিত্রের দৃশ্য; চিত্রসূত্র: IMDb

অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্টে সিনেমাটির শুটিং সেটের একটি ছবি প্রকাশ করে বিষয়টি জানানো হয়। ছবিতে ক্যাপশন দেওয়া হয়,

২০১৯ সালে আমাদের সরাসরি শুটিংয়ের পর্বে শেষ দিন। আমরা সময়টা আনন্দ নিয়ে উদযাপন করছি।

জেমস ক্যামেরনের চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও পরিচালনায় নির্মিত অ্যাভাটার ২ এ অভিনয় করছেন স্যাম আর্থিংটন, জো সালডানা, সিগুর্নি উইভার, স্টিভেন ল্যাংসহ অনেকে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে চলচ্চিত্রটি বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাবে।

২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের এই চলচ্চিত্র আয় করে ২.৭৮৮ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর পৃথিবীর সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমার উপাধি নিয়ে বক্স অফিসে রাজত্ব করেছে অ্যাভাটার। তবে অ্যাভাটার ২ আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে এমনটা চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

ফিচার চিত্রসূত্র: IMDb

তথ্যসূত্র:

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on অ্যাভাটার ২: বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেতে চলেছে ২০২২ সালে

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!