অ্যানা ফ্রাংক

অ্যানা ফ্রাংকের ডায়রি: দ্য সিক্রেট অ্যানেক্স

সাইফা সিদ্দিকা
4.8
(5)
Bookmark

No account yet? Register

মাত্র ১৩ বছর বয়সে এক জার্মান কিশোরীর পৃথিবীটা হঠাৎ বদলে যেতে শুরু করে। নাম তার অ্যানা ফ্রাংক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় অনিশ্চিত দিন গুলোর কথা ডায়রিতে লিখেছিল সে নিয়মিতভাবে। পরবর্তীতে যে ডায়রি পড়ে চমকে উঠেছে গোটা পৃথিবীর মানুষ।

অসামান্যতে লিখুন

পৃথিবীতে বিখ্যাত ডায়রিগুলোর কথা বললে অ্যানা ফ্রাংকের ডায়রির কথা সবার আগে চলে আসে। ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী অ্যানা ফ্রাংক যার লেখা ডায়রিতে ফুটে উঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিটলার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের কথা। কিন্তু অ্যানা ডায়রি লিখতে পেরেছিল ১৫ বছর ২ মাস বয়স পর্যন্ত। ডায়রীর পাতায় শেষ লেখার ৭ মাস পরেই এই পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয় তাকে। সে চলে যায় কিন্তু যাওয়ার আগে রেখে যায় তার দিনলিপি, যা অমর এবং অক্ষয়।

অ্যানা ফ্রাংক এবং তার ডায়রি
অ্যানা ফ্রাংক এবং তার ডায়রি । চিত্রসূত্র: NPR

অ্যানা ফ্রাংকের বাবার নাম অটো ফ্রাংক, মা এডিথ, বোন মারগট। জার্মানিতে তখন হিটলারের ত্রাসের রাজত্ব। সরাসরি তারা ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছে যার জন্য অনেক ইহুদী জীবন বাঁচানোর জন্য চলে গিয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। জন্মগতভাবে জার্মান হলেও ইহুদি হওয়ার কারনে জার্মানি ছেড়ে হল্যান্ডে চলে আসতে হয় অটো ফ্রাংকের পরিবারকে ১৯৩৩ সালে। অ্যানার তখন মাত্র ৪ বছর বয়স।

অ্যানা ফ্রাংকের পরিবার
অ্যানা ফ্রাংকের পরিবার । চিত্রসূত্র:  The New Yorker

ঠিক ৬ বছর পর শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হল্যান্ডও আর নিরাপদ আশ্রয় রইলো না ইহুদিদের জন্য, নাৎসি বাহিনী দখল করে ফেলে হল্যান্ড। অসংখ্য ইহুদিকে পাঠানো হলো বন্দি শিবিরে। এসময় ১৯৪২ সালের ১২ জুন জন্মদিনে উপহার হিসেবে ডায়রিটি পায় অ্যানা এবং ১৪ জুন থেকে সে তার ডায়রিতে লিখতে শুরু করে। অন্যদিকে ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে সরাসরি শমন এলো অটো ফ্রাংকের নামে। তাকে হাতছানি দিল বন্দী শিবির কিন্তু সে ডাকে সাড়া না দিয়ে পরিবার সহ চরম এক ঝুঁকি নিলেন তিনি।

অটো ফ্রাংক নিজেদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের পিছনের দিকে এক গোপন আস্তানায় আশ্রয় নিলেন সপরিবারে ।এসময় তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন তার কিছু ইংরেজ বন্ধু। অ্যানা ফ্রাংক তখন ১৩ বছর বয়সে মাত্র কৈশোরে পদার্পন করেছে । যে সময়টায় তার স্কুলে বন্ধু বান্ধবের সাথে সময় কাটনোর কথা ছিল, সেই অ্যানা ফ্রাংককে বরণ করে নিতে হলো ঘুপচি অন্ধকারের আশ্রয়। এসময় তার একমাত্র কাছের বন্ধু হয় তার ডায়রিটি। ভালবেসে সে তার ডায়রির নাম দিয়েছিল কিটি। কিটিকে লেখা প্রতিটি পাতার শেষে বিদায় সম্ভাষণ ছিল- তোমার অ্যানা। এর থেকেই বুঝে নেয়া যায় কিটির সাথে অ্যানার সম্পর্ক কত গভীর ছিল। অনেক কষ্ট,অনেক ত্যাগ এর কথা একের পর এক দিনলিপি তে লিখে চলল কিশোরী অ্যানা ফ্রাংক। 

আনা ফ্রাংকের ডায়রি
আনা ফ্রাংকের ডায়রি । চিত্রসূত্র: History.com

এভাবে ২৫ মাস পার করে দিল তারা গোপন আস্তানায়। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত এভাবে আতংক আর বিভীষিকার মধ্যে পার করে দিতে পারতো তারা কিন্তু তার আগেই ১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট, সেখানে হানা দিয়েছিল নাৎসি বাহিনী। আট জন মানুষকে নিয়ে গিয়েছিল বন্দীশিবিরে। জার্মানির আউসভিৎস বন্দীশিবিরে মারা যান অ্যানার মা। মারগট আর অ্যানাকে পাঠানো হয় বেরজেন বেলসেন বন্দীশিবিরে, সেখানেই ১৯৪৫ সালে মারা যায় মারগট এবং ১৫ বছর বয়সী সেই কিশোরী, অ্যানা ফ্রাংক। 

অ্যানার সমাধি
অ্যানার সমাধি । চিত্রসূত্র: Pixabay

বন্দীশিবিরের মৃত্যুর অন্ধকূপ থেকে শুধু ফিরেছিল অটো ফ্রাংক। তখন তার হাতে অ্যানার এই লাল মলাটের ডায়রি তুলে দেয় তাদেরই দুই শুভাকাঙ্ক্ষী এলি ও মিপ। এরপর প্রকাশিত হল সেই দিনলিপি- অ্যানা ফ্রাংকের ডায়রি নামে। সমস্ত পৃথিবী যেন চমকে গেল। অ্যানার ডায়রি পড়ে চোখের পানি ফেলেনি এমন মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। পরবর্তীতে অ্যানার ডায়রি প্রকাশিত হয়েছে প্রায় সব ভাষায়, মঞ্চস্থ হয়েছে নাটক, তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র। 

আমস্টারডামে অ্যানা ফ্রাংকের মোমের মূর্তি
আমস্টারডামে অ্যানা ফ্রাংকের মোমের মূর্তি । চিত্রসূত্র: Pixabay

অন্য সকল আত্নকাহিনীর থেকে অ্যানার ডায়রীর পার্থক্যটি হল অ্যানা কখনোই জানতো না তার লেখা ডায়রিটি একদিন প্রকাশিত হবে এবং তাক লাগিয়ে দিবে পুরো পৃথিবীকে। অ্যানার লেখা পড়তে পড়তে এক আশ্চর্য অনুভূতি তৈরি হয় পাঠকের মনে, কখনো খুঁজে পাওয়া এক সাধারন কিশোরীকে আবার কখনো এক আশ্চর্য গভীর অ্যানা ফ্রাংক পাঠককে বিস্মিত করে সামনে এসে দাঁড়ায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সী কিশোরী অবলিলায় লিখে গিয়েছে  দর্শন,প্রেম,রাজনীতি,বন্ধুত্ব,ইতিহাস এমনকি জীবনবোধ নিয়েও ।

কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও আমি ভেঙে পড়িনি, আমার আদর্শকে জলাঞ্জলি দিইনি। জানি, বর্তমান অবস্থায় সেগুলোর বাস্তবায়ন অসম্ভব, তবুও সযত্নে তাদের বুকের ভেতর লালন করছি। কারণ আমি এখনো বিশ্বাস করি মানুষের ভেতরটা নির্মল সুন্দর। এই বিশ্বাসই আমার স্বপ্নের ভিত্তি, আমি তো আমার স্বপ্নগুলোকে এমন কিছুর উপর দাঁড় করাতে পারি না, যা কেবল মৃত্যু – ধ্বংস দিয়ে গড়া।

আনা ফ্রাংকের ডায়রির একটি অংশ

অ্যানার চিন্তাধারা অন্য ৮-১০ টা কিশোরীর মতো ছিল না। শুরু থেকেই লেখিকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতো অ্যানা ফ্রাংক। তার স্বপ্ন ছিল এমন কিছু করার যেন সে মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকতে পারে পাঠকের হৃদয়ের জুড়ে। অ্যানার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। বেঁচে আছে তার সেই অমর দিনলিপি। বেঁচে থাকুক অ্যানা ফ্রাংক, তাকে বাঁচিয়ে রাখুক তার ডায়রি।

তথ্যসূত্রঃ

ফিচার ছবিসুত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

আরও পড়ুন: জাগরী – রাজনৈতিক উপন্যাসে স্নেহ ও আদর্শের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
2 Thoughts on অ্যানা ফ্রাংকের ডায়রি: দ্য সিক্রেট অ্যানেক্স
    ____ _______
    21 Aug 2020
    8:54pm

    খুবই সুন্দর বর্ননা, লেখিকার ফ্যান হয়ে গেলাম।

    0
    0
      Saifa Siddika
      24 Aug 2020
      12:41pm

      ধন্যবাদ!

      0
      0

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!