প্রচ্ছদচিত্র

দি হিউম্যানি কর্পোরিস ফেব্রিকা: আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যা যে বইয়ের কাছে ঋণী

5
(6)
Bookmark

No account yet? Register

লাইফ ইজ আ সার্কেল। জীবনের বৃত্তে আমরা অনেক সময়ই ঘুরে ফিরে সেই পুরনাে জায়গায় চলে আসি, যেখান থেকে নতুন কিছুর সৃষ্টি হয়েছিল। সব শুরুর যেমন শেষ আছে, তেমনি সব শেষেরই একটা স্মৃতিময় শুরু থাকে। কখনো সেটা প্রকাশিত আবার কখনো সেটা মনের অজান্তেই অপ্রকাশিত থেকে যায়। আমাদের শরীরে সব মিলিয়ে মোট ২০৬ টি অস্থি রয়েছে। আর এই সকল অস্থি নিয়ে আলোচনা করে অঙ্গসংস্থানবিদ্যা। এটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু এটা জানি কী কোথায় থেকে অঙ্গসংস্থানবিদ্যা জন্ম নিল?

অসামান্যতে লিখুন

শুরুর দিকে অঙ্গসংস্থানবিদ্যা সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত ধারণা মানুষের মাঝে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন গ্রিসে তখন মানুষের মৃতদেহ কাঁটা-ছেড়া করা নিষেধ ছিল। তখনকার ডাক্তাররা সাধারণত শূকরছানা অথবা কুকুরের দেহ ব্যবচ্ছেদ করে হাড়-গােড় ও বিভিন্ন অঙ্গের গঠন ও সন্নিবেশ দেখতেন। কারণ তাদের ধারণা ছিল, মানুষের দেহের গঠনও একই ধরনের। এই শূকর ও কুকুরের অঙ্গবিন্যাস তথ্যের উপর ভিত্তি করে গ্যালেন নামের এক প্রতিপত্তিশালী গ্রিক ডাক্তার মানুষের অঙ্গসংস্থানবিদ্যা নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন আর এরপর সবাই তার কথাকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করা শুরু করে। সেই সময় থেকে বহুকাল ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের গ্যালেনের বই পড়ানাে হতাে। শিক্ষার্থীরা কোন রকম যাচাই বাছাই না করেই গ্যালেনের দেয়া মতবাদ আত্মস্থ করে যেত।

ডা.অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস নতুন করে উপস্থাপন করেছিলেন অঙ্গসংস্থানবিদ্যা।
                  ডা.অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস। চিত্রসূত্র: Wikimedia Commons 

গ্যালেনের সংস্কার থেকে মুক্তচিন্তার উদ্ভব

১৫৩৩ সাল। চিকিৎসাবিদ্যা শেখার জন্য প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন খুব নাম ডাক। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়তে আসতো। সে সময় বেলজিয়াম থেকে এক তরুণ যুবক এলেন ডাক্তারি পড়ার জন্য। তাঁর নাম অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস। ক্লাসে চুপচাপ বসে বসে তিনি লেকচার শুনেন আর স্যারদের সাথে শূকর অথবা কুকুরের দেহ ব্যবচ্ছেদ করে দেখেন। কিন্তু এতে তার মন ভরে না। ভাবেন, দূর! গ্যালেনের কথা নিশ্চয়ই ভুল। একটা মানুষের দেহের গঠন ও সংস্থান কি শূকরের মতাে হতে পারে কখনাে? আচার, আচরণ ও অবয়ব কিছুতেই এ দুটির মিল নেই।

হ্যাঁ, যদি একটা মানুষের দেহের কঙ্কাল পাওয়া যেত অথবা শবব্যবচ্ছেদ করে দেখা যেত, তাহলে সে সম্বন্ধে একটা ধারণা পাওয়া যেত। 

গ্যালেনের মতবাদ ও পর্যবেক্ষণের উপর তাঁর অনাস্থা ও সন্দেহ দিনকে দিন বাড়তে লাগলো। সব সময় চিন্তা করেন: একটা মানবদেহের কঙ্কাল যদি জোগাড় করা যেত, তাহলে হয়তো প্রমাণ করা যেত, তাঁর ধারণা মােটেও মিথ্যে নয়।

অঙ্গসংস্থানবিদ্যা কাজ করে মানুষের অস্থি নিয়ে।
মানব কঙ্কালের অংশবিশেষ। চিত্রসূত্র: Pixabay

কঙ্কালের সন্ধান লাভ এবং সংগ্রহ

১৫৩৬ সালের কথা। ইতোমধ্যেই কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। একদিন সন্ধায় তিনি তার প্রিয় বন্ধুর সাথে বেড়াতে বেড়িয়েছেন। আলাপ করতে করতে এক মনে হেঁটেই চলেছেন তাঁরা। হঠাৎ খেয়াল হল, শহরের বাইরে এসে পড়েছেন। কিছু দূরে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ি এলাকা, সেখানে অপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া হতাে। কোনাে বিশেষ কারণ না ঘটলে কেউ সেখানে যেত না। বন্ধুটি বললেন, চল, এবার ফেরা যাক। তিনি সেকথা শুনতেই পেলেন না। তাঁর মনে তখন অন্য চিন্তা। ভাবছেন: হ্যাঁ, এখানেই হয়তাে আমি কিছু মানুষের হাড়গােড় পেতে পারি। সাহস নিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলেন এবং হঠাৎ  চাপা স্বরে চিৎকার করে বললেন, ঐ দেখ। প্রায় বিশ হাত দূরে দৃষ্টিপথ রােধ করে একটি ফাঁসিকাঠের সাথে বাঁধা মস্ত একটা মানুষের কঙ্কাল ঝুলছে।বন্ধুটি ফিসফিস করে বললেন,

মনে হচ্ছে, এটা কোন জালেম ডাকাতের কঙ্কাল

অপ্রত্যাশিত আনন্দে তিনি সেখানে দৌড়ে গেলেন। উত্তেজনায় তাঁর সমস্ত শরীর কাঁপছে। অস্পষ্ট স্বরে তার বন্ধুটি বললেন,

আমার ভীষণ ভয় করছে। চল আমরা চলে যাই, অন্য একদিন দিনে আসবো।

কিন্তু তিনি সে কথায় কোন ভ্রূক্ষেপই করলেন না। তাঁর একটাই চিন্তা। কঙ্কালটিকে কত তাড়াতাড়ি নিজের সংগ্রহে নিতে পারেন।

চাঁদের অল্প আলােয় কঙ্কালটিকে ভৌতিক মনে হচ্ছিল। তিনি ভয় এবং উত্তেজনা সাথে নিয়ে কাঠের খুঁটি বেয়ে তরতর করে একেবারে খুঁটির মাথায় পৌছে গেলেন। একটু চাপ দিতেই পােকায়-খাওয়া কাঠ মড়মড় করে ভেঙে এল। ফলে তিনি কঙ্কালসহ নিচে পড়ে গেলেন। কঙ্কালের হাড়গোড়গুলো মাটিতে পড়ে ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে গেল। সামান্য একটু চোটও পেয়েছিলেন বটে কিন্তু তিনি দমে গেলেন না।

তিনি এবং তার বন্ধুটি মিলে কঙ্কালের হাড়গুলো সঙ্গে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। যত্ন করে নিজের ঘরে এনে রাখলেন কঙ্কালটিকে। এরপর সারারাত জেগে হাড়গুলাে তার দিয়ে জোড়া দিয়ে সম্পূর্ণ একটি কঙ্কালের রূপ দিলেন। আর সেদিন থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হল।

আরও পড়ুন: হৃদপিণ্ড: বিস্ময় ও সমস্যা, পর্ব ১ – সাধারণ আলোচনা

কঙ্কাল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা

তারপর শুরু হল কাজ আর কাজ। কঙ্কালটি এক নজর দেখেই তিনি বুঝে ফেলেছিলেন, মানবদেহ সম্বন্ধে এতদিনের ধারণায় অনেক গলদ রয়েছে। মানুষের শরীরের অস্থির সংখ্যা, গঠন ও বিন্যাসে অন্য প্রাণী বিশেষ করে কুকুর আর শূকরের সাথে অনেকটাই অমিল।

ভাসেলিয়ার পরীক্ষা নিরীক্ষা করা প্রথম কঙ্কাল
ভাসেলিয়ার পরীক্ষা নিরীক্ষা করা প্রথম কঙ্কাল। চিত্রসূত্র: Wikimedia 

তাঁর নতুন পর্যবেক্ষণের ফলাফল সম্বন্ধে তিনি বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতে লাগলেন নানা জায়গায়। মানুষের দেহে অস্থির সংস্থানের উপর আঁকা কয়েকটি নিখুঁত চিত্রও তিনি সবাইকে দেখালেন। কিন্তু হিতে বিপরীত হল। এর ফলে অনেকেই তার শত্রু হয়ে দাঁড়াল। বিশেষ করে গ্যালেনের মতাবলম্বী লােকেরা তার উপর ভীষণ ক্ষ্যাপা হয়ে উঠলেন। চরম বিদ্রুপ আর লাঞ্ছনার শিকার হতে লাগলেন তিনি।

প্যারিস ত্যাগ এবং ইতালিতে গমন 

ঠাট্রা বিদ্রুপ এমন পর্যায়ে পৌছাল যে শেষে প্যারিসে বাস করা তাঁর দায় হয়ে পড়ল। মনের দুঃখে তাই তিনি প্যারিস ত্যাগ করে ইতালিতে চলে গেলেন।

ইতালিতে তখন পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ডাক সর্বত্র। তিনি পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে পড়াশােনা ও গবেষণার সংকল্প নিলেন।

পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয় তখন ইউরােপের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলের মতাে এত রক্ষণশীল ছিল না। বিশেষ করে সেখানে প্রাচীন লেখকদের প্রামাণ্য বইয়ের বােঝা চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাকে চেপে রাখেনি, নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর প্রচুর সুযােগ-সুবিধা তখন সেখানে ছিল। পাদুয়াতে স্বাধীন গবেষণার সুযােগ পেয়ে তিনি বর্তে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর গবেষণার যশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ১৫৩৭ সালের ডিসেম্বরে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়েরঅঙ্গসংস্থানবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হলেন।

এই বইটি অঙ্গসংস্থানবিদ্যা এর আমূল পরিবর্তন করেছিল।
ডি ফ্যাব্রিক করপােরিস হিউম্যানি বইয়ের প্রচ্ছদ। চিত্রসূত্র: Amazon

বই প্রকাশ

অনেকদিন ধরেই তাঁর মনে ইচ্ছে ছিল যে তিনি একটা বই লিখবেন। পাদুয়ায় শিক্ষকতা ও গবেষণা করতে করতে তাঁর এ ধারণা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল। অনেক বাঁধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে তিনি ১৫৪৩ সালে ডি ফ্যাব্রিক করপােরিস হিউম্যানি (মানবদেহের অঙ্গসংস্থান) নামে একটি বই প্রকাশ করলেন। আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যা সম্পর্কে এটিই প্রথম বই। মানুষের অস্থি, পেশী, হৃদপিণ্ডের গঠন ও কার্যপ্রণালী এবং প্রাণীর দেহ-ব্যবচ্ছেদ সম্বন্ধে খুব সুন্দর সুন্দর আলােচনা ও চিত্র অঙ্গসংস্থানবিদ্যা সম্পর্কিত এই বইয়ে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। পেশির আলােচনা এবং এর নিখুঁত ছবি সন্নিবেশ করার ব্যাপারে তিনি অনেক আধুনিক শারীরবিদদেরও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। মানুষের পেশীর সংস্থানের সেই নির্ভুল চিত্রগুলাে আজও অভিনব।

বই প্রকাশের পর পুনরায় গ্যালেন মতবাদে বিশ্বাসীরা তাঁর উপর ঠাট্টা বিদ্রুপ করতে লাগলো। ফলে দ্বিতীয়বার অবহেলার মুখোমুখি হয়ে তার মন ভেঙ্গে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা থেকে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নিলেন। এরপর অনেকদিন যাবৎ তিনি আলোচনার বাইরে ছিলেন।

অধ্যাপক গেব্রিল ফেললাপিয়াসের প্রকাশিত ম্যাগাজিন। চিত্রসূত্র: Amazon  

সাফল্য যখন হাতের মুঠোয় 

এর দীর্ঘ বিশ বছর পর পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার অধ্যাপক গেব্রিল ফেললাপিয়াস তাঁর বইটির অনেক সুখ্যাতি করে একটি রচনা এক মেডিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশ করলেন। সবার চোখ নতুন করে বইটির উপর পড়ল। বেশির ভাগ তরুণ ডাক্তাররা গ্যালেনের সংস্কারমুক্ত ছিলেন। ভেসালিয়াসের অঙ্গসংস্থানবিদ্যা সম্পর্কিত বইটি বই পড়ে তারা সবাই এর দারুণ প্রশংসা করতে লাগলেন। চিকিৎসক মহলে হৈ চৈ পড়ে গেল। বেশির ভাগ ডাক্তার এই নতুন সম্ভাবনাকে ধন্য ধন্য করতে লাগলেন। গ্যালেনের গোঁড়া অনুসারীরা এবারও প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠলেন, কিন্তু বেশি সুবিধা করতে পারলেন না। পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ এবার বুঝতে পারলেন, এই বিরাট প্রতিভাবান লােকটিকে অবহেলা করে তারা বিরাট বড় ভুল করেছিলেন!

একটা চুরি করা কংকালকে কেন্দ্র করে আধুনিক শরীরবিদ্যার প্রথম গােড়াপত্তন এভাবেই হয়েছিল। ভেসালিয়াসের অমর গ্রন্থ ডি ফ্যাব্রিকা অঙ্গসংস্থানবিদ্যা শাস্ত্রে এক যুগ পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। গ্যালেনের পর তখন থেকে তিনিই হলেন ভবিষ্যৎ গবেষকদের আদর্শ। চিকিৎসাবিদ্যায় গ্যালেনের বহুদিনের রাজত্বের সমাপ্তি ঘটলো। তাই তাঁকে আধুনিক এনাটমি শাস্ত্রের জনক বললে মােটেই বেশি বলা হবে না। তাঁর এই মহান অবদানের জন্য তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন চিরদিন।

হ্যাঁ, পৃথিবীর সব অমিয়, অবিস্মরণীয় পরিবর্তন শত বাঁধা-বিপত্তিকে মোকাবেলা করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরিবর্তনের নায়কদেরকে পড়তে হয়েছে নাম না জানা অনেক ঝড়, শঙ্খা ও আশঙ্খার কবলে। কিন্তু তাঁরা দমে যাননি। বুক ভরা সাহস আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে বার বার পড়ে গিয়েও সাহসী পদক্ষেপে বীরের মতো উঠে দাঁড়িয়েছেন, বদলে দিয়েছেন নিজেকে। পাশাপাশি নিজের চারপাশকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন এবং ভাবাতে বাধ্য করেছেন,

পরিবর্তন কিংবা সাফল্য এমনি এমনি আসে না। সাফল্য সহজলভ্য কোন বিষয় নয়, তাকে স্বমহিমায় জয় করে নিতে হয়।

সহায়ক গ্রন্থপুঞ্জি:

  • চৌধুরী, শুভাগত।চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের গল্প। ISBN:9789848857052। হেরা প্রিন্টার্স।

তথ্যসূত্র:

প্রচ্ছদ চিত্রসূত্র: Pixabay

আপনার অনুভূতি জানান

Follow us on social media!

আর্টিকেলটি শেয়ার করতে:
No Thoughts on দি হিউম্যানি কর্পোরিস ফেব্রিকা: আধুনিক অঙ্গসংস্থানবিদ্যা যে বইয়ের কাছে ঋণী

কমেন্ট করুন


সম্পর্কিত নিবন্ধসমূহ:

error: Content is protected !!